বাঙালি মানেই উঠল বাই তো কটক যাই! দিন দুয়েকের ছুটি পেলেই এখানে ওখানে ঝটিকা সফরের পরিকল্পনা সারা হয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে। সামনেই আলোর উৎসব। ভ্রমণপিপাসুদের জন্য ফের ঝোলা নিয়ে বেড়িয়ে পড়ার সুবর্ণ সুযোগ। ছোট্ট ছুটিতে কাছাকাছি কোথাও যেতে চান? এ বারের কালীপুজোর ছুটিতে তবে বেড়িয়ে আসুন বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরে।
বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরের পরিচিতি একাধারে মন্দির ও টেরাকোটার শহর হিসেবে। তার সবটুকু জড়িয়ে প্রাচীন ইতিহাস। কলকাতার থেকে ঘণ্টা তিনেকেই পৌঁছে যাবেন এই ঐতিহাসিক শহরে। ঘুরে দেখতে পারেন শাক্তপীঠ-বৈষ্ণব মন্দির সবই।
পর্যটকদের জন্য কী কী আছে বিষ্ণুপুরের ভাঁড়ারে?
ছিন্নমস্তা মন্দির: দীপাবলিতে বিষ্ণুপুরে গেলে ছিন্নমস্তা মন্দির দর্শন করতেই পারেন। বিষ্ণুপুরের দলমাদল পাড়ায় এই ছিন্নমস্তা মন্দির। দশমহাবিদ্যার অন্যতম দেবী ছিন্নমস্তা।
উনিশ শতকে গুঁই পরিবারের উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল এই মন্দির। সেখানকার শান্ত পরিবেশে দেবীর আশীর্বাদ নিতে পর্যটকেরা ভিড় জমান এই প্রাচীন মন্দিরে।
মা মৃন্ময়ী মন্দির: বিষ্ণুপুরের প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র মৃন্ময়ী মন্দির। মল্লরাজ জগৎ মল্ল ৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। দেবী দুর্গা এখানে মা মৃন্ময়ী রূপে পূজিতা। সাড়ম্বরে দুর্গাপুজো হয় এই প্রাচীন মন্দিরে। মহাষ্টমীর সন্ধিপুজোর সময়ে কামান দাগার ঐতিহ্যও সর্বজনবিদিত। মন্দিরের ইতিহাস, পুজোর রীতি এবং স্থানীয় সংস্কৃতি জানতে চাইলে অবশ্যই ঘুরে আসতে পারেন।
রাসমঞ্চ: রাসমঞ্চ বিষ্ণুপুরের অন্যতম বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও শহরের প্রধান পর্যটন আকর্ষণ। মল্লরাজ বীর হাম্বীরের আমলে আনুমানিক ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে তৈরি হয় বাংলার মন্দির স্থাপত্যের এই অনন্য সৃষ্টি। ল্যাটেরাইট পাথরে গড়া বিখ্যাত এই রাসমঞ্চ। অতীতে রাস উৎসবের সময়ে বিষ্ণুপুরের বিভিন্ন মন্দির থেকে রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহ এনে এখানে দর্শনের ব্যবস্থা করা হত।
জোড়বাংলা মন্দির: জোড়বাংলা মন্দিরও বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা শিল্পের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। মল্লরাজ রঘুনাথ সিংহ ১৬৫৫ খ্রিস্টাব্দে এই মন্দির তৈরি করেন। মন্দিরের দোচালা ঘরের আকৃতি পর্যটকদর আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। মন্দিরের দেওয়ালে পোড়ামাটির ফলকে রামায়ণ, মহাভারত, কৃষ্ণলীলা, দেবদেবী, পশুপাখি, সৈন্যদল এবং তৎকালীন সমাজজীবনের নানা দৃশ্য দেখতে পাবেন। প্রতিটি ফলকের সূক্ষ্ম কারুকাজ দেখতে ভিড় করেন মানুষ। চিত্রগ্রাহকদের কাছেও এই জোড়বাংলা মন্দিরের জনপ্রিয়তা বিপুল।
শ্যামরায় মন্দির: শ্যামরায় মন্দির বিষ্ণুপুরের অন্যতম টেরাকোটা মন্দির। মল্লরাজ রঘুনাথ সিংহ ১৬৪৩ খ্রিস্টাব্দে এটি তৈরি করেন। পঞ্চরত্ন স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি এই মন্দিরের ছাদে পাঁচটি চূড়া রয়েছে। মন্দিরের দেওয়ালে কৃষ্ণলীলা, রাধাকৃষ্ণের প্রেমকাহিনি, রামায়ণ-মহাভারতের বিভিন্ন ঘটনা, দেবদেবী এবং তৎকালীন সমাজজীবনের নানা ছবি দেখতে পাবেন।
গড় দরজা ও বড় পাথর দরজা: গড় দরজা ও বড় পাথর দরজা বিষ্ণুপুরের মল্লরাজাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন। প্রাচীনকালে রাজপ্রাসাদ ও দুর্গাঞ্চলে প্রবেশের পথ হিসেবে এই দরজাগুলি ব্যবহার হত। এই দুই স্থান ঘুরে দেখলে মন্দিরকেন্দ্রিক স্থাপত্যের পাশাপাশি মল্লরাজাদের সামরিক ও নগর পরিকল্পনারও ধারণা পাওয়া যায়।
দলমাদল কামান: দলমাদল কামান বিষ্ণুপুরের সামরিক ইতিহাসের একটি পরিচিত নিদর্শন। বিষ্ণুপুরে আসা পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু এই দলমাদল। এই বিশাল ঐতিহাসিক কামানটিকে ঘিরে বিভিন্ন লোকগাথাও প্রচলিত। বিষ্ণুপুরের ছিন্নমস্তা মন্দিরের কাছাকাছিই এই দলমাদল কামান।
জয়পুর জঙ্গল: কলকাতা থেকে বিষ্ণুপুর যাওয়ার পথেই পড়ে জয়পুর জঙ্গল। শাল-পিয়ালের বনে ঘেরা শান্ত এলাকা। একরাশ সবুজের মধ্যে কিছুটা সময় কাটাতে চাইলে জয়পুর জঙ্গলে ঘুরে আসতেই পারেন। ছবিপ্রেমীদের জন্যও জয়পুর জঙ্গল অত্যন্ত আকর্ষণীয়। প্রকৃতির কোলে রাত কাটানোর ইচ্ছে থাকলে বেশ কিছু রিসর্টও আছে এখানে।
কী করে যাবেন
কলকাতা থেকে বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরে ট্রেন, বাস কিংবা প্রাইভেট গাড়িতে সহজেই পৌঁছনো যায়। ট্রেনে হাওড়া, সাঁতরাগাছি বা শালিমার স্টেশন থেকে বিষ্ণুপুরের ট্রেন ধরতে পারেন। সময় লাগে প্রায় ৩–৪ ঘণ্টা। বাসে ধর্মতলা বা এসপ্ল্যানেড বিষ্ণুপুরের বাস পাবেন, সময় লাগতে পারে ৪–৫ ঘণ্টা বা তারও বেশি। প্রাইভেট গাড়িতে আরামবাগ অথবা দুর্গাপুর–বাঁকুড়া রুটে বিষ্ণুপুর যাওয়া যায়।
২ দিনের ভ্রমণে মাথাপিছু খরচ
বিষ্ণুপুরে ২ দিনের ট্রিপে জনপ্রতি গড় খরচ আনুমানিক ২,৫০০–৪,০০০ টাকা হতে পারে।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।