গত সোমবার বেরিয়েছে চলতি অর্থবর্ষের প্রথম তিন মাস অর্থাৎ এপ্রিল-জুনের জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপি) পরিসংখ্যান। বৃদ্ধির হার রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের ৭% অনুমানকে ছাপিয়ে ৭.৮ শতাংশে পৌঁছে যাওয়ায় সরকার উচ্ছ্বসিত। যুদ্ধের বাজারে এত বড় সাফল্যের প্রচারে নেমেছেন প্রধানমন্ত্রী থেকে অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী-সহ অনেকেই। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হল, এই খবরে বিন্দুমাত্র তেতে ওঠেনি শেয়ার বাজার। বরং গোঁত্তা খেয়ে নেমেছে সূচক। সোম থেকে বৃহস্পতি, চার দিনে সেনসেক্স খুইয়েছে ১১১১ পয়েন্ট। লগ্নিকারীদের মতে, এর কারণ হতে পারে বৃদ্ধির হার নিয়ে নানা মহলের প্রশ্ন এবং ধন্দ।
পরিসংখ্যান বলছে, এই বৃদ্ধিতে মদত জুগিয়েছে আর্থিক, তথ্যপ্রযুক্তি, নির্মাণ ইত্যাদি পরিষেবা (১২.১%), কল-কারখানায় উৎপাদন (৯.২%), বাণিজ্য, হোটেল, যানবাহন ( ৮.৫%)। কিন্তু খনন শিল্পে উৎপাদন কমেছে ২.৪%। কৃষিকাজে বৃদ্ধির হার ৩.৬%। মনে করা হচ্ছে, আর্থিক বৃদ্ধির হার এতটা মাথা তোলায় আরবিআই এ বার উন্নয়নের তুলনায় দাম নিয়ন্ত্রণে বেশি জোর দেবে। অর্থাৎ সুদের হার বাড়তে পারে।
বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে মাসের প্রথমে আসা কিছু পরিসংখ্যান চড়া আর্থিক বৃদ্ধির হারকে সমর্থন করলেও, কয়েকটি বিপরীতমুখী। যেমন, অগস্টে দেশে যাত্রিবাহী গাড়ির বিক্রি বেড়েছে প্রায় ৩৫%, জিএসটি আদায় বেড়েছে ১৪.৮%, ইউপিআই পদ্ধতিতে ডিজিটাল লেনদেনের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ২৪৫০ কোটি, যার মোট পরিমাণ ২৯.৮ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু আর্থিক বৃদ্ধির অন্যতম অংশ যে কল-কারখানার উৎপাদন, তার পিএমআই সূচক নেমেছে ৫২.৮ পয়েন্টে। যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সব থেকে কম।
ধন্দ আরও বেড়েছে জিডিপি বৃদ্ধির হার নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কে। কয়েকজন প্রাক্তন পদস্থ আমলা এবং বিরোধী দল পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। প্রাক্তন অর্থসচিব সুভাষ গর্গের মতে, আর্থিক বৃদ্ধির প্রকৃত হার ২.৬%, ৭.৮% নয়। মূল্যবৃদ্ধি হিসাব করলে বস্তুত জিডিপি বাড়েইনি। পরিসংখ্যান মন্ত্রকের সচিব সৌরভ গর্গ অবশ্য সব সমালোচনা উড়িয়েছেন।
রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজনের প্রশ্ন, ‘‘আমরা এত উঁচু হারে বাড়লে ভাল কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছি না কেন? কেন দেশে লগ্নি বাড়ছে না, বড় মাপের প্রত্যক্ষ বিদেশি লগ্নি আসছে না?’’ প্রাক্তন মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টা কৌশিক বসুর বক্তব্য, ‘‘২০০৭-এ দেশে লগ্নির হার ছিল ৩৮%, ২০২৬-এ তা নেমেছে ৩৪ শতাংশের নীচে।’’ সরকারের মতে, এ বছর জিডিপি মাপার পদ্ধতি পাল্টেছে। আগের সঙ্গে তুলনা অর্থহীন।
বিরোধীদের প্রশ্ন, ভারত যখন বিশ্বের পঞ্চম অর্থনীতি এবং এই হারে এগোচ্ছে, তখন দেশের ৮০ কোটি মানুষকে কেন এখনও বিনামূল্যে রেশন দিতে হয়? কেন বহু মানুষ বস্তিতে, স্টেশনে, ফুটপাতে থাকেন? কেন কয়েক হাজার চাষিকে ঋণ শোধ করতে না পারায় আত্মহত্যা করতে হলেও, কিছু শিল্পপতির বিপুল ঋণ মকুব হয়ে যায়? কেনই বা কাজের জন্যে আন্দোলনে নামতে হয় তরুণ প্রজন্মকে? অনেকেরই দাবি, বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশ এগোচ্ছে ঠিকই। কিন্তু আর্থিক বৃদ্ধির পাশাপাশি দ্রুত হারে মাথা তুলছে বৈষম্যও। বৃদ্ধির ফসলের সিংহভাগ ঘরে তুলছেন উপর তলার মানুষেরা। নীচে আসছে ছিটেফোঁটা। তাই দরিদ্র এবং অতি দরিদ্রদের জীবনযাত্রায় তার প্রভাব পড়ছে না।
(মতামত ব্যক্তিগত)