বিশ্ব অর্থনীতির সিঁড়িতে ভারত এখন প্রথম পাঁচে থাকলেও দেশের নিচু তলার মানুষ খুব ভাল আছেন বলা যাবে না। এখানে গড় মাথাপিছু আয় উন্নত দেশগুলির তুলনায় অনেক কম। পিরামিডের নীচের ধাপের মানুষের ক্ষেত্রে তা আরও সামান্য। সঙ্গে আছে নানাবিধ অনিশ্চয়তা। হঠাৎ চাকরি খোয়ানোর ভয়, মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে দুশ্চিন্তা, পরিবারের প্রধান উপার্জনকারীর স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা, অকাল মৃত্যু বা দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা। এত চিন্তা প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায় অসংখ্য মধ্য এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষকে। দুর্ভাবনাগুলিকে কিছুটা বাগে রাখা সম্ভব নিয়মিত সঞ্চয় এবং উপযুক্ত বিমা করা থাকলে।
আগে কম বয়সে কেউ চাকরিতে ঢোকামাত্র বড়রা প্রথমেই তাকে জীবন বিমা করার পরামর্শ দিতেন। অর্থাৎ কর্মজীবনের শুরুতেই ঝুঁকির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলতেন। তবে মৃত্যু ছাড়াও এখন বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক ঝুঁকি রয়েছে। এর অন্যতম অতিমাত্রায় চিকিৎসা খরচ, দুর্ঘটনা, চুরি-ডাকাতি বা বেড়াতে গিয়ে বিপদ। বিমার মাধ্যমে সব ঝুঁকিই সামলানো সম্ভব।
পরিবারের একমাত্র অথবা প্রধান উপার্জনকারীর নামে উপযুক্ত পরিমাণ জীবন বিমা থাকা বাঞ্ছনীয়। বড় মাপের ঋণ, বিশেষত গৃহঋণ থাকলে তার সম-পরিমাণ বিমা থাকতে হবে। খুব বড় মেয়াদে ছোট অঙ্কের বিমা তেমন লাভজনক হয় না। বহু দিন ধরে টানার পরে মেয়াদ শেষে পাওয়া টাকায় বড় প্রয়োজন মেটে না। লম্বা মেয়াদে টাকার দাম কমে যায় বলে প্রাপ্তি আরও ছোট হয়। অন্য দিকে, বেশি বড় অঙ্কের বিমা নিলে তার প্রিমিয়াম সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষত আয়ের নিশ্চয়তা না থাকলে অথবা চাকরি যাওয়ার ভয় থাকলে। যে কারণে কম প্রিমিয়ামে বড় অঙ্কের বিমা চাইলে ‘টার্ম পলিসির’ কথা ভাবা হয়। তবে এতে প্রিমিয়ামের টাকা ফেরত পাওয়া যায় না।
চিকিৎসার খরচ প্রতি বছর যে হারে বাড়ছে, তাতে স্বাস্থ্য বিমা না থাকা বিরাট ঝুঁকির। মাঝারি মাপের অসুখও একটি পরিবারকে পথে বসিয়ে দিতে পারে। সরকারের দেওয়া স্বাস্থ্য বিমা পেলে কিছুটা স্বস্তির। তবে সেটা সকলে পান না। কাজেই অন্যদের নিজের খরচে বিমা করাতে হবে। যদিও প্রিমিয়ামের খরচ বেশ ভারী। নতুন কর কাঠামোয় তাতে করছাড়ও নেই। তবু প্রয়োজনে অনাবশ্যক খরচ ছেঁটে স্বাস্থ্য বিমা করানো দরকার।
কারখানার শ্রমিক, পথেঘাটে ঘুরে যাঁদের কাজ করতে হয়, যাঁরা ট্যাক্সি-অটো চালান কিংবা নির্মাণের কাজে যুক্ত, তাঁদের দুর্ঘটনা বিমা জরুরি। কারণ, এই ধরনের সব কাজই ঝুঁকিপূর্ণ। এই বিমার প্রিমিয়াম বেশি নয়। দু’লক্ষ টাকার ‘প্রধান মন্ত্রী সুরক্ষা বিমা যোজনা’ কিনতে বছরে খরচ পড়ে মাত্র ২০ টাকা। অজ্ঞতার কারণে অনেকে তা করান না।
বিমার প্রয়োজন হয় বেড়াতে গেলেও, বিশেষত বিদেশে। যে সব ঝুঁকি সামলাতে ভ্ৰমণ বিমা করা হয়, তার মধ্যে থাকে চিকিৎসা, বিদেশে মৃত্যু, ব্যাগ এবং পাসপোর্ট হারানো, উড়ানে দেরি অথবা বাতিল ইত্যাদি। ভ্রমণের মেয়াদ অনুযায়ী কয়েক দিনের জন্য তা কেনা যায়। প্রিমিয়াম নাগালের মধ্যেই।
চার চাকা অথবা দু’চাকার গাড়ি থাকলে বিমা করানো বাধ্যতামূলক। বিশেষত তৃতীয় পক্ষের ঝুঁকির বিরুদ্ধে। না করলে জরিমানা দিতে হতে পারে। নিজের জন্য এই বিমা জরুরি, গাড়ির জন্যও। সম্পত্তি বিমা করানো যায় বন্যা, ভূমিকম্প, আগুন, ডাকাতি ইত্যাদি ঝুঁকির বিরুদ্ধে।
মোদ্দা কথা হল, এখনকার ঝুঁকিবহুল দুনিয়ায় সুরক্ষিত ভাবে বাঁচার অন্যতম অস্ত্র বিমার রক্ষাকবচ।
(মতামত ব্যক্তিগত)