ইউপিআই লেনদেনে মোদী সরকার যে মাসুল বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এ বারে সঙ্ঘ পরিবারের মধ্য থেকেই তা নিয়ে আপত্তি উঠল।
সূত্রের খবর, সঙ্ঘ পরিবারের অর্থনৈতিক ‘থিঙ্ক ট্যাঙ্ক’ স্বদেশি জাগরণ মঞ্চ মোদী সরকারের কাছে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার আর্জি জানিয়েছে। মঞ্চের যুগ্ম আহ্বায়ক অশ্বিনী মহাজন একে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ভারতের সাফল্যকে খাটো করা হল। ইউপিআই লেনদেনের ফলে যে ব্যবসার খরচ কমেছিল, প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকছিল ভারতের পণ্য, তা সরকারের নীতি নির্ধারকেরা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন।
মোদী সরকারের অন্দরমহলের একাংশেও প্রশ্ন উঠেছে, গোটা বিজেপি ও কেন্দ্রীয় সরকার যখন ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জন্মদিন ও তাঁর মুখ্যমন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী পদ মিলিয়ে প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে ২৫ বছর পূর্তিকে কেন্দ্র করে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় মাঠে নামছে, তার ঠিক দু’দিন আগে কেন ইউপিআই লেনদেনে মাসুল বসানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হল?
এই মাসুল বসানোর রাস্তা খুলতে কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রক অগস্টে সংসদের বাদল অধিবেশনের সময়ে আইনে সংশোধন করেছিল। মঙ্গলবার দেশের আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন ঘোষণা করেছে, বড় দোকান, ব্যবসায়ী বা ই-কমার্স সংস্থাকে ২ হাজারের বেশি টাকা মেটালে ব্যবসায়ীর উপরে ০.৪০% হারে মাসুল বা মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) চাপবে। সেটা ব্যবসায়ীদের উপরে চাপলেও আখেরে তা ক্রেতাদের ঘাডেই এসে পড়বে বলে অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন। গোটা সরকার তথা বিজেপি নরেন্দ্র মোদীর সাফল্য তুলে ধরতে মাসব্যাপী ‘সেবা সঙ্কল্প অভিযান’ শুরু করছে। ঠিক তার দু’দিন আগে ইউপিআই ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন ঘিরে প্রচারকে ম্লান করে দিয়েছে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি তুলেছেন। তার সঙ্গে স্বদেশি জাগরণ মঞ্চও প্রতিবাদ জানিয়েছে।
ওই মঞ্চের পদাধিকারী অশ্বিনী মহাজন আনন্দবাজারকে বলেন, “ইউপিআই লেনদেনে কোনও মাসুল বসানো উচিত নয়। সরকার রাস্তা, পার্ক, পানীয় জল সরবরাহ থেকে পুলিশি ব্যবস্থার মতো নাগরিক পরিকাঠামো তৈরি করে। তার জন্য মাসুল চাপায় না। ইউপিআই লেনদেনের ব্যবস্থাটিকেও তেমনই ডিজিটাল পরিকাঠামো হিসেবে দেখা উচিত। এই খাতে সরকারের মাত্র ২ হাজার কোটি টাকার মতো খরচ হচ্ছিল। কোনও ব্যাঙ্ক এই মাসুল চায়নি। যদি ইউপিআই পরিকাঠামোর উন্নতিতে, সাইবার নিরাপত্তার উন্নতির জন্য অর্থের প্রয়োজন হয়, ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন সেই খরচ করতে পারে। এই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা গত বছরই ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে।”
রাহুল গান্ধী আজ প্রধানমন্ত্রীকে নিশানা করে বলেছেন, আমেরিকার চাপেই ইউপিআই-তে মাসুল বসানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। কংগ্রেসের যুক্তি, আমেরিকার ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইউপিআই, রুপে কার্ডের লেনদেনে মাসুল নেই বলে আপত্তি তুলেছিল। দাবি করা হয়, এর ফলে আমেরিকার লেনদেন সংস্থাগুলি পিছিয়ে পড়ছে। আমেরিকার সেই চাপের সামনেই মোদী সরকার মাথা নত করেছে। তাই জুনে অর্থ মন্ত্রক বিবৃতি দিয়েছিল, ইউপিআই-তে মাসুল বসানোর জল্পনা ভিত্তিহীন। তার পরে সরকারের নীতি বদলে গিয়েছে।
রাহুল বলেছেন, “এক বার ইন্দিরা গান্ধীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনি বাম না ডান, কোন দিকে ঝুঁকে? উনি বলেছিলেন, কোনও দিকেই নয়। নিজের মেরুদণ্ড সোজা রাখি। মোদীজি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে সাষ্টাঙ্গে শুয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। উনি আমেরিকার ফায়দার জন্য ইউপিআই-তে মাসুল বসিয়ে দেশের মানুষের উপরে কর চাপিয়েছেন।’’ তাঁর দাবি, “মোদীজি, মেরুদণ্ড সোজা করুন। ইউপিআই-তে কর প্রত্যাহার করুন।’’ কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রক দাবি করেছে, আমেরিকার চাপে এই সিদ্ধান্ত হয়নি। অশ্বিনী মহাজন আবার বলেন, “যখন আমেরিকা আপত্তি তুলেছে, তখন সরকারের কোনও ভাবেই মাসুল বসানো উচিত হয়নি। তা হলে মনে হবে, আমেরিকার চাপে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’’ তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, ক্রেতাদের উপরে মাসুল চাপবে না বলে সরকার দাবি করলেও, সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হবে। ফলে বহু মানুষ নগদ লেনদেনে ফিরতে চাইবেন। তাতে ছোট ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়বেন। কেনাবেচায় ধাক্কা লাগবে।
দেশের খুচরো বিক্রেতাদের সংগঠন রিটেলার্স অ্যাসোসিয়েশনও উৎসবের মরসুমের আগে সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের মতে, এর ফলে উৎসবের মরসুমে কেনাকাটায় ধাক্কা লাগবে। সুপ্রিম কোর্টে এর বিরুদ্ধে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন এক আইনজীবী।