জীবন বিমা নিগম (এলআইসি) ২০১৯ সালে আইডিবিআই ব্যাঙ্কে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা লগ্নি করেছিল। সে সময়ে আইডিবিআই ব্যাঙ্কের আর্থিক স্বাস্থ্য একেবারেই ভাল নয়। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক দ্রুত আর্থিক স্বাস্থ্য ফেরানোর সুপারিশ করেছে। লোকসানে আইডিবিআই ধুঁকছে। সেই পরিস্থিতিতে আইডিবিআই ব্যাঙ্ককে চাঙ্গা করতে এলআইসি-র প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা আইডিবিআই-তে লগ্নি করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। যা আসলে এলআইসি-তে বিমা করানো সাধারণ মানুষের অর্থ।
এখন আইডিবিআই ব্যাঙ্ক মুনাফা করছে। তা হলে এখন আইডিবিআই ব্যাঙ্কে এলআইসি ও কেন্দ্রীয় সরকারের মালিকানা বেচে দিয়ে তা বিদেশি সংস্থা, কানাডার ফেয়ারফ্যাক্স-এর হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে কেন বলে প্রশ্ন তুলল কংগ্রেস-সহ বিরোধী শিবির।
কংগ্রেস শনিবার প্রশ্ন তুলেছে, এলআইসি-তে সাধারণ পলিসিগ্রাহকদের ২৬ হাজার কোটি টাকা আইডিবিআই-তে কি এই কারণেই ঢালা হয়েছিল, যাতে তাকে চাঙ্গা করে বিদেশি সংস্থার হাতে জলের দরে বেচে দেওয়া যেতে পারে?
দু’সপ্তাহ আগেই নরেন্দ্র মোদী সরকার আইডিবিআই ব্যাঙ্কের ৬০.৭২ শতাংশ মালিকানা কানাডার ফেয়ারফ্যাক্স সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাবে সিলমোহর দিয়েছে। এর ফলে প্রায় ৫২,৮৭৮ কোটি টাকার প্রত্যক্ষ বিদেশি লগ্নি (এফডিআই) আসবে। রাহুল গান্ধী আইডিবিআই ব্যাঙ্কের বেসরকারিকরণের বিরোধিতা করেছেন। অভিযোগ উঠেছে, মোদী সরকার আইডিবিআই ব্যাঙ্কের প্রতি শেয়ারের যে ন্যূনতম দর ঠিক করেছিল, তার থেকেও কম দামে আইডিবিআই বেচে দেওয়া হচ্ছে। কানাডার ফেয়ারফ্যাক্স নিলামে সরকারি নির্ধারিত ন্যূনতম দরের থেকে কম দর হেঁকেছিল। মোদী সরকার নিজেরই নির্ধারণ করা ন্যূনতম দর কমিয়ে দিয়ে তাতেই রাজিহয়ে গিয়েছে।
মোদী সরকারের এই সিদ্ধান্তের পিছনে দুই সরকারি কর্তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এক, নীতি আয়োগের প্রাক্তন সিইও অমিতাভ কান্ত। যিনি গত বছর আইডিবিআইয়ের বেসরকারিকরণের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। তারপরে তিনি কানাডার ফেয়ারফ্যাক্স সংস্থার সিনিয়র উপদেষ্টা পদে যোগ দেন। দুই, এলআইসি-র পরিচালন পর্ষদের অন্যতম ডিরেক্টর গুরমূর্তি মহালিঙ্গম। তিনি আবার গত বছরের শেষে ফেয়ারফ্যাক্সের সংস্থা টমাস কুকের পরিচালন পর্ষদেও যোগ দিয়েছিলেন। এলআইসি যখন আইডিবিআই ব্যাঙ্কে নিজের মালিকানা বেচার চেষ্টা করছে, ফেয়ারফ্যাক্স তা কেনার চেষ্টা করছে, তখন তিনি দু’দিকেই উপস্থিত ছিলেন। আইডিবিআই অফিসারদের সংগঠনও এই নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কংগ্রেসের প্রধান মুখপাত্র জয়রাম রমেশের প্রশ্ন, কী ভাবে এই নিয়োগ হল? তাঁর অভিযোগ, মোদী সরকার নিজেরদের নির্ধারিত দরের থেকেও ৮,৮০০ কোটি টাকা কম দামে আইডিবিআইয়ের সিংহভাগ মালিকানা বেচে দিচ্ছে।
এলআইসি ২০১৯ সালে আইডিবিআই ব্যাঙ্কে ২৬ হাজার কোটি টাকা লগ্নি করায় তার অংশীদারি বেড়ে ৪৯ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছিল। কোনও বিমা সংস্থা একটি শেয়ার বাজারে নথিবদ্ধ সংস্থায় এতখানি অংশীদারি কিনতে পারে না। তাই বিমা নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিশেষ অনুমতি নিতে হয়েছিল। কংগ্রেস মুখপাত্র সুপ্রিয়া শ্রীনতে জানান, যখন এলআইসি টাকা ঢেলেছিল, তখন আইডিবিআই-এর লোকসান ৪১ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে গিয়েছিল। গত দুই অর্থ বছরে আইডিবিআই ১৭ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এখন এলআইসি ও কেন্দ্রীয় সরকারের ৩০ শতাংশ করে অংশীদারি মিলিয়ে আইডিবিআইয়ের ৬০ শতাংশের বেশি মালিকানা বিদেশি সংস্থাকে বেচে দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘‘কেন্দ্রীয় সরকারের সচিবদের নোটে দেখা যাচ্ছে, বিদেশের বাজারে কাঁচা তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে বিদেশি মুদ্রার টান পড়ায় প্রত্যক্ষ বিদেশি লগ্নি আনার দরকার পড়েছে। না হলে ডলারের তুলনায় টাকার দর পড়ছে। এই কারণে মোদী সরকার এলআইসি-তে সঞ্চয় করা বিমার মালিকদের অর্থ নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে?”