মাত্র দু’সপ্তাহ আগে নরেন্দ্র মোদী সরকার আইডিবিআই ব্যাঙ্কের ৬০.৭২ শতাংশ মালিকানা কানাডার ফেয়ারফ্যাক্স সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাবে সিলমোহর দিয়েছিল। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ভারতের আর্থিক ক্ষেত্রের ইতিহাসে সব থেকে বড় অঙ্কের প্রত্যক্ষ বিদেশি লগ্নি বা এফডিআই আসবে। যার পরিমাণ ৫২,৮৭৮ কোটি টাকা। কিন্তু তার আগেই মোদী সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠে গেল।
কংগ্রেস তথা বিরোধী শিবির সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি তদন্ত রিপোর্টকে হাতিয়ার করে অভিযোগ তুলেছে, মোদী সরকারের নিজের নির্ধারিত ন্যূনতম দরের থেকেও কম দামে আইডিবিআই ব্যাঙ্কের সিংহভাগ অংশীদারি বেচে দেওয়া হচ্ছে। আইডিবিআই ব্যাঙ্কের সিংহভাগ মালিকানা নিলামে তোলার সময়ে মোদী সরকার প্রতি শেয়ারের ৯৪.৪২ টাকা ন্যূনতম দর ঠিক করেছিল। ভারতীয়-কানাডীয় শিল্পপতি প্রেম বৎসের মালিকানাধীন ফেয়ারফ্যাক্স-সহ মাত্র দু’টি সংস্থা দর হাঁকে। ফেয়ারফ্যাক্স প্রতি শেয়ারের জন্য ৮১ টাকা দর হেঁকেছিল। মোদী সরকারের আমলারা তাদের প্রস্তাব খুলে দেখেন। তার পরে নতুন করে প্রতি শেয়ারের ৭৫ টাকা ন্যূনতম দর ঠিক করেন। তার পরে ফেয়ারফ্যাক্সকে পূর্ব নির্ধারিত দরের থেকে কমেই আইডিবিআইয়ের সিংহভাগ মালিকানা বেচে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
শুধু কম দরে আইডিবিআইয়ের মালিকানা বেচে দেওয়াই নয়। দেশের ব্যাঙ্কের নিয়ন্ত্রণ এ ভাবে বিদেশি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া উচিত কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। যা নিয়ে নতুন করে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন বনাম লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর বাগ্যুদ্ধ শুরু হয়েছে। টাটা গোষ্ঠীকে ধ্বংস করা হচ্ছে বলে রাহুল যে অভিযোগ তুলেছিলেন, তা নিয়ে চলতি সপ্তাহেই নির্মলার সঙ্গে তাঁর এক দফা বাগ্যুদ্ধ হয়েছে। এ বারে রাহুল বলেছেন, ‘‘কংগ্রেসের সময়ে আইডিবিআই তৈরি হয়েছিল দেশের শিল্পকে খাড়া করার জন্য। মোদীর সময়ে প্রথমে নিলামে দর কত মিলছে দেখা হয়েছে, তার পরে দাম ঠিক হয়েছে। কংগ্রেসের সময়ে ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা হত। মোদীর সময় ব্যাঙ্ক বেচা হয়।’’
আইডিবিআই-এর অফিসার ও কর্মীদের ইউনাইটেড ফোরাম ইতিমধ্যেই ব্যাঙ্কটির বেসরকারিকরণ বন্ধের দাবি তুলেছে। এ বিষয়ে সংসদে পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছে ফোরাম। রাহুল আইডিবিআইয়ের অফিসার-কর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিয়েছে বলেছেন, সরকার সংসদে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, আইডিবিআইয়ের বেসরকারিকরণ হবে না। সেই প্রতিশ্রুতি থেকে পিছু হঠছে মোদী সরকার।
দু’সপ্তাহ আগে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পরে নির্মলা বলেছিলেন, আইডিবিআই-এর বিলগ্নিকরণ হচ্ছে না। পুনর্গঠন হচ্ছে। কারণ সরকারের অংশীদারি কমলেও বজায় থাকবে। এ নিয়ে রাহুল প্রশ্ন তোলায় নির্মলা শুক্রবার তাঁকে নিশানা করে নেহরু-ইন্দিরা জমানায় ব্যাঙ্ক ক্ষেত্রে কী কী হয়েছিল, তার উদাহরণ টেনেছেন। তাঁর অভিযোগ, কংগ্রেস জমানায় আইডিবিআই-কে ভিডিওকন, এবিজি শিপইয়ার্ড, কিংফিশারের মতো কংগ্রেস ঘনিষ্ঠ শিল্পগোষ্ঠীদের ঋণ দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। তার ফলে ভগ্নস্বাস্থ্য আইডিবিআই-কে মোদী সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। মোদী সরকার ব্যাঙ্কে ২৫ হাজার কোটি টাকার পুঁজি ঢেলেছে। সমস্ত নিয়ম মেনেই তার পুনর্গঠন হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে কংগ্রেস সাংসদ পবন খেরা প্রশ্ন তুলেছেন, ২০১৯-এ এলআইসি আইডিবিআই ব্যাঙ্ককে উদ্ধার করার জন্য ২১,৬২৪ কোটি টাকা লগ্নি করেছিল। এখন কী ভাবে লোকসানে আইডিবিআই-কে বেচে দেওযা হয়? সিপিএমের রাজ্যসভার সাংসদ জন ব্রিট্টাস জুন মাসে অর্থমন্ত্রীকে চিঠি লিখে আইডিবিআইয়ের বেসরকারিকরণের বিরোধিতা করেছিলেন। ব্রিট্টাস বলেন, রেলের ছাঁট নিলামের সময় সরকার ন্যূনতম দর কমানোর যে পদ্ধতি ব্যবহার করে, সেই পদ্ধতি প্রয়োগ করে আইডিবিআইয়ের ন্যূনতম দর কমানো হয়েছে। অর্থ মন্ত্রক ন্যূনতম দর কমানোর অভিযোগ অস্বীকার করেনি। মন্ত্রকের যুক্তি, কেন্দ্রীয় সরকারের ১৫ শতাংশ ও এলআইসি-র ১৯ শতাংশ অংশীদারিত্ব থাকবে। ভবিষ্যতে আইডিবিআই চাঙ্গা হলে তার ফায়দাও মিলবে।
এ দিকে, ২০৪৭ সালের মধ্যে যাতে ভারতের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা বিশ্বে প্রতিযোগিতায় সক্ষম হয়ে ওঠে, সে জন্য ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার পরিকাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক, নিয়ন্ত্রণগত ও আইনগত সংস্কারের দিকগুলি খতিয়ে দেখে সুপারিশ করতে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে কেন্দ্র।