শিল্পে উৎসাহ নীতি (ইনসেন্টিভ পলিসি) প্রত্যাহার করেছিল তৃণমূল সরকার। নতুন শিল্পনীতি এবং উৎসাহ নীতি তৈরি করে সেই ‘ক্ষত’ মেরামতের চেষ্টা শুরু করেছে রাজ্যের বিজেপি সরকার। সেই খসড়া মোটামুটি প্রস্তুত এবং তা প্রকাশিত হবে ৫ নভেম্বর। কিন্তু তৃণমূল সরকার আইন করে শিল্পের উৎসাহ নীতি প্রত্যাহার করেছিল। ফলে তা (আইন) সক্রিয় থাকলে, নতুন শিল্পনীতি তথা উৎসাহ নীতি কার্যকর করার প্রক্রিয়ায় আইনি বাধা তৈরি হবে কি না, তা নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে শিল্প মহলে। তবে প্রশাসনের একটি সূত্র এবং বণিকমহলের একাংশ মনে করছে, বিনিয়োগ টানা এবং শিল্পবান্ধব ভাবমূর্তি ফেরানোর স্বার্থে আগের সেই আইনি বাধা দূর করার পদক্ষেপ নিশ্চয়ই করবে নবান্ন।
ভারত চেম্বারের সভাপতি নরেশ পাচিসিয়ার মতে, “নতুন শিল্পনীতি বা উৎসাহদাননীতি স্বাগত। তবে নিশ্চয়ই পুরনোদের বকেয়া ও আগের আইন বাতিল করা সংক্রান্ত আইনি দিকগুলিও দেখা হবে।” শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় জানান, আগের সরকার আইন করে উৎসাহ নীতি প্রত্যাহার করে থাকলে, সেই আইন তুলে নিতে হবে। যদিও এক কর্তার কথায়, “পূর্ণাঙ্গ একটি শিল্পনীতি আসছে। আগেরটির সঙ্গে এর কোনও সংঘাত নেই। আগের সরকারেরটি শুধু ইনসেন্টিভ নীতি।”
বিধানসভায় অধিবেশন ডেকে রীতিমতো বিল (রিভোকেশন অব ওয়েস্ট বেঙ্গল ইনসেন্টিভ স্কিমস অ্যান্ড অবলিগেশনস ইন দ্য নেচার অব গ্রান্টস অ্যান্ড ইনসেন্টিভস বিল, ২০২৫) পাশ করিয়েছিল বিগত তৃণমূল সরকার। তাতে বলা হয়েছিল, ১৯৯৩, ১৯৯৯, ২০০০, ২০০৪ সালের ওয়েস্ট বেঙ্গল ইনসেন্টিভ স্কিম, ২০০৫ সালের ওয়েস্ট বেঙ্গল ইনসেন্টিভ টু পাওয়ার ইনটেন্সিভ ইন্ডাস্ট্রিজ স্কিম, ২০০৮ সালের ইনসেন্টিভ স্কিম, ২০০৮ এবং ২০১৩ সালের ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট সাপোর্ট ফর ইন্ডাস্ট্রিজ স্কিম, ২০১৫ এবং ২০২১ সালের ইনসেন্টিভ স্কিম— সবই প্রত্যাহারের তালিকায় থাকছে। অর্থাৎ, বামফ্রন্ট এবং তৃণমূল সরকারের সময়ে চালু হওয়া শিল্প সহায়ক সব সুবিধা বাতিল করা হয়। এর সঙ্গে পর্যটনেও (যা তৃণমূল আমলেই শিল্পের গোত্রভুক্ত হয়েছিল) এমন সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। কিন্তু তত দিনে রাজ্য সরকারের কাছে ইনসেন্টিভ বাবদ বিপুল অর্থ বকেয়া হয়ে যায় বহু শিল্প সংস্থার। তাদের অনেকে আদালতের দ্বারস্থও হয়। কিন্তু এই বিল পাশ করিয়ে তখনকার সরকার জানায়, ইনসেন্টিভ খাতের বিপুল খরচ কল্যণ (অনুদান) প্রকল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা পরিকাঠামো উন্নয়নে আরও ভাল ভাবে বরাদ্দ করা যায়। তাই ভবিষ্যতে এ রাজ্যের শিল্প সংস্থাগুলি ইনসেন্টিভের কিছুই দাবি করতে পারবে না। এমনকি, এই নীতিতে অতীতের বকেয়াও শিল্পমহলের দাবির আওতায় আসবে না। ফলে সরকারের এই পদক্ষেপ এবং আইন শিল্প মহলের অন্দরে আলোড়ন ফেলে।
মার্চেন্টস চেম্বারের সভাপতি মণীশ ঝাঝারিয়া বলেন, “যদি দু’টি আইন পরস্পরবিরোধী হয়ে থাকে, তা হলে একটিকে বাতিল করতে হবে। নিশ্চয়ই বর্তমান সরকার সেটা দেখেই এগিয়েছে।” নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিল্পকর্তার বক্তব্য, “গত সরকারের সময়ে যাঁরা লগ্নি করেছেন, আবার এই জমানাতেও নতুন লগ্নি করছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে কী হবে, কোন তারিখ থেকে এই নীতি প্রণয়ন হবে তা জানা জরুরি। আগের নিয়মে যাঁদের বিবিধ সুবিধা পাওয়ার কথা, তাঁদের কী হবে!”
প্রশাসনের অন্দরের বক্তব্য, এ রাজ্যকে বিনিয়োগের উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরতে একাধিক পদক্ষেপের পরিকল্পনা হচ্ছে। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— জমি জোগাড়েও প্রথাগত পদ্ধতি সংশোধন করে নতুন ভাবে ভাবনাচিন্তা। তাতে দেশের অন্য রাজ্যগুলির পদ্ধতি খতিয়ে দেখে এ রাজ্যের সঙ্গে মানানসই পদক্ষেপগুলি তালিকাভুক্ত হচ্ছে। সেটিও শিল্পনীতির আওতায় থাকতে পারে। পাশাপাশি, বিনিয়োগের প্রশ্নে দেশে এগিয়ে থাকা রাজ্যগুলির সঙ্গে মানানসই করে শিল্প-উৎসাহ নীতি তৈরি করছে নবান্ন। আদানি গোষ্ঠী হোক বা রিলায়্যান্স, আমূল হোক বা বেদান্ত গোষ্ঠী—সকলের উদ্দেশে শিল্প সহায়ক বার্তা দিচ্ছে নবান্ন। ‘ইজ় অব ডুইং বিজনেস’ বা শিল্প সহায়ক প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলি (প্রধানত বিভিন্ন ধরনের অনুমতি) আরও সরল করা হচ্ছে। ফলে নতুন শিল্পনীতি রাজ্য সরকারের বিনিয়োগ-আগ্রহকে প্রতিষ্ঠিত করবে। তা কার্যকর করার সামনে কোনও বাধা থেকে থাকলে তা দূর করা হবে যথাসময়েই।