১ লাখ কর্মী ছাঁটাই করার সিদ্ধান্ত জানানোর পর এ বার ভারতীয় কর্মীদের জন্য দুঃসংবাদ শোনাল ফোক্সভাগেন। জার্মান গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ব্যয় সঙ্কোচনের অংশ হিসেবে ভারতে কর্মীসংখ্যা ১২ শতাংশ কমাবে তারা! বিষয়টির সঙ্গে ওয়াকিবহাল এক ব্যক্তিকে উদ্ধৃত করে সংবাদসংস্থা ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, ফোক্সভাগেন তাদের ভারতের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের তিন বছর মেয়াদি পুনর্গঠন পরিকল্পনা ত্বরান্বিত করছে। এর ফলে তাদের মোট কর্মীবাহিনীর প্রায় ১২ শতাংশ ছাঁটাই হতে পারে। ভারতে গাড়ি সংস্থাটির পরবর্তী বিনিয়োগ পর্ব শুরুর আগে খরচ কমানোর লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে সূত্রের খবর, ভারতের কর্মীসংখ্যা ছাঁটাইয়ের সঙ্গে সংস্থাটি এই দশকের শেষে বিশ্ব জুড়ে যে ১ লক্ষ কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার কোনও সম্পর্ক নেই।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর (২০২৫ সাল) এই পুনর্গঠন কর্মসূচি শুরু করে স্কোডা অটো ফোক্সভাগেন ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড। তবে এখন তারা এর সময়সূচি এগিয়ে এনেছে। মনে করা হচ্ছে, ২০২৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে দ্রুত গতিতে এই কর্মীছাঁটাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এই ছাঁটাই কর্মসূচির আওতায় অফিস এবং কারখানার কয়েকশো কর্মীর চাকরি হারানোর আশঙ্কা প্রবল।
আরও পড়ুন:
নতুন প্রজন্মের গাড়ি (যার মধ্যে একটি নতুন বৈদ্যুতিক মডেলও অন্তর্ভুক্ত) বাজারে আনার আগেই এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভারতে করা বিনিয়োগের কয়েক কোটি ডলার সাশ্রয় করতে চাইছে ফোক্সভাগেন। কিন্তু, এ দেশে ব্যবসার পরিধি বা স্কেল বাড়াতে গিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ায় জার্মান সংস্থাটি এখন কম খরচের কাঠামো নিয়ে পরবর্তী বিনিয়োগ পর্যায়ে প্রবেশ করতে চাইছে।
স্কোডা অটো ফোক্সভাগেন ইন্ডিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সিইও পীযূষ অরোরা জানিয়েছেন, কর্মীসংখ্যা সংক্রান্ত কোনও ‘অনুমাননির্ভর’ মন্তব্য করবে না সংস্থা। তিনি জানান, ভারতের বিভিন্ন ব্যবসায়িক ইউনিটে কার্যক্রমকে আরও দক্ষ ও সাশ্রয়ী করে তোলার লক্ষ্যে কোম্পানির প্রচেষ্টা জোরদার হচ্ছে। তিনি আরও জানান, সংস্থাটি ভারতে তাদের স্থানীয় ইঞ্জিনিয়ার দলের পরিধি বাড়াতে এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে চায়। কারণ ফোক্সভাগেন গোষ্ঠীর কাছে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং রফতানি কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত।
আরও পড়ুন:
ফোক্সভাগেনের তরফে বৃহস্পতিবারই জানানো হয়েছে, অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে কর্মীসংখ্যাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে চলতি দশকের শেষের মধ্যে ১ লাখ কর্মী ছাঁটাই করবে তারা। সে বিষয়ে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (ম্যানেজমেন্ট) এবং শ্রমিক ইউনিয়নগুলির মধ্যে সমঝোতাও হয়েছে। বিশ্ব জুড়ে গাড়িশিল্পে এটিই হতে যাচ্ছে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় পুনর্গঠন প্রক্রিয়া। সংস্থাটি জানিয়েছে, আগেই ৫০ হাজার কর্মীকে ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তা নিয়ে কথাবার্তাও হয়েছিল সংস্থার বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে। পাশাপাশি, আরও প্রায় ৫০ হাজার কর্মীছাঁটাইয়ের একটি পরিকল্পনায় তারা অনুমোদন দিয়েছে বলে খবর। ১০টি ব্র্যান্ডের সমন্বয়ে গঠিত জার্মান গাড়ি নির্মাতা গোষ্ঠীটির অধীনে মূল ফোক্সভাগেন ব্র্যান্ড ছাড়াও অডি ও পোর্শের মতো ব্র্যান্ড রয়েছে। সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, ‘‘অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এবং সামঞ্জস্য রেখে কর্মীসংখ্যা সুশৃঙ্খল ভাবে সমন্বয় অপরিহার্য।’’
আমেরিকার শুল্ক আরোপ, বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদায় ওঠানামা এবং সর্বোপরি চিনের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারের তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে ইউরোপের বৃহত্তম এই গাড়িনির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে আর্থিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংস্থার মোট ১ লাখ কর্মীছাঁটাইয়ের পদক্ষেপটি বিশ্বের অটোমোবাইল শিল্পে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় পুনর্গঠন প্রক্রিয়া হতে যাচ্ছে, যা প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বব্যাপী মোট কর্মীসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশের সমান। সংস্থার সিইও অলিভার ব্লুম বলেন, ‘‘সুপারভাইজ়রি বোর্ড উপস্থাপিত নির্বাহী পর্ষদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন করেছে। এটি ফোক্সভাগেন গোষ্ঠীর ভবিষ্যতের জন্য একটি জোরালো বার্তা।’’ যদিও এই পরিকল্পনায় চূড়ান্ত সায় দেওয়ার আগে শ্রমিক ইউনিয়ন এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে প্রকাশ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা গিয়েছিল বলে খবর।
এক লক্ষ কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এ বার ভারতীয় কর্মীসংখ্যা কমানোর পথে ফোক্সভাগেন হাঁটতে চলেছে বলে খবর প্রকাশ্যে আসায় বাড়ছে জল্পনা। ভারতের পুনর্গঠন প্রক্রিয়াটি মূলত স্থানীয় ব্যবসার চাহিদার ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে এবং এটি ২০২৭ সাল পর্যন্ত চলতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। ফোক্সভাগেন ভারতে তাদের মালিকানা কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের বিষয়টিও বিবেচনা করছে বলে খবর। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলি আগেই জানিয়েছিল, জার্মান গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি এমন একটি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে, যার ফলে শিল্পপতি সজ্জন জিন্দলের জেএসডব্লিউ গোষ্ঠী এই ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণকারী মালিকানা পেতে পারে।