পূর্বতন তৃণমূল সরকারের জমানায় পশ্চিমবঙ্গে লগ্নি না আসার অন্যতম কারণ হিসেবে স্পষ্ট এবং স্বচ্ছ জমি নীতি না থাকার অভিযোগ উঠত। একলপ্তে বড় জমি না পাওয়ার সমস্যার কথা বার বার তুলে ধরত শিল্প মহল। মঙ্গলবার সেই ছবি বদলানোর ইঙ্গিত দিল রাজ্যের নতুন শাসকদল। বার্তা, শীঘ্রই নতুন জমি নীতির হাত ধরে শিল্পোন্নয়নের পথে হাঁটবে বাংলা। এ দিন বণিকসভার মঞ্চ থেকে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য জানান, এখানে লগ্নি টানাই লক্ষ্য তাঁদের। সেই কারণে জমি নীতি চালু করা হবে। যেখানে সরকার শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের কোনও ঊর্ধ্বসীমা রাখবে না। একই সঙ্গে শিল্পায়ন প্রসঙ্গে এ দিন নাম না করে সৌরভ গঙ্গ্যোপাধ্যায়কেও একহাত নেন তিনি।
বণিকসভা বেঙ্গল ন্যাশনাল চেম্বারের সভায় এ দিন শমীক বলেন, ‘‘রাজ্যে সঠিক জমি নীতি না থাকলে শিল্পায়ন সম্ভব নয়। আগের সরকারের আমলে তা ছিল না। ফলে লগ্নিও আসেনি। আমরা শীঘ্রই স্পষ্ট জমি নীতি নিয়ে আসব।’’ সেই সঙ্গে তাঁর মন্তব্য, ‘‘শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের ঊর্ধ্বসীমা থাকলে, তা বিনিয়োগের পথে বাধা তৈরি করে। নতুন সরকার বিষয়টি নিয়ে ভাবনাচিন্তা করছে। ওই সীমা সরিয়ে দেওয়া হবে।’’ তিনি জানান, যে জমি নীতি এনেপঞ্জাব-হরিয়ানা-মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্য শিল্পে পুঁজি টানতে সফল হয়েছে, এখানেও সেই রকম নীতিই আনতে চলেছে রাজ্য সরকার।
পূর্বতন সরকারের একেবারে বিপরীত অবস্থান নিয়ে শমীক বলেন, ‘‘আমাদের রাজ্যে মোট জমির ৮২ শতাংশই ছোট-প্রান্তিক কৃষকদের হাতে। সেখানে জমি অধিগ্রহণে সরকারের হস্তক্ষেপ না থাকলে শিল্প গঠন অসম্ভব।’’ সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের নীতি ছিল জমি অধিগ্রহণে রাজ্য সরকার কোনও হস্তক্ষেপ করবে না। সবটাই শিল্প সংস্থাকে করতে হবে। যে কারণে কেউ এ রাজ্যে লগ্নি করতে আগ্রহী হননি। বহু সংস্থা অভিযোগ করে, তাদের কাজ শিল্প গড়া। পুঁজি খাটানো। ব্যবসা চালানো। জমি আদায়ের ঝক্কিতারা নেবে কেন?
এ দিন শমীকের স্পষ্ট বার্তা, ‘‘আমাদের লক্ষ্য বাংলাকে ফের শিল্পায়নের রাস্তার ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। আর তার জন্য বড় শিল্প আনতেই হবে। এটা ছাড়া আর কোনও ভবিষ্যৎ নেই।’’ পাশাপাশি, গত কয়েক দিনের মতো বণিকসভার সদস্যদের উদ্দেশে বিজেপি রাজ্য সভাপতির ডাক, ‘‘আপনারা নতুন সরকারের আমলে নির্ভয়ে রাজ্যে লগ্নি করুন। কাউকে কোনও টাকা দিতে হবে না। আমরা গোটা বাংলায় ভয়মুক্ত পরিবেশ তৈরি করব।’’
শমীক এ দিন নাম না করে ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কেও একহাত নেন। শমীক বলেন, ‘‘এক ভদ্রলোককে চিনতাম। আমরা জানতাম তিনি স্টেপ আউট করে ওভার বাউন্ডারি মারতে বেশি দক্ষ ছিলেন। হঠাৎ দেখলাম, তিনি বাউন্ডারির বাইরে থেকে বল ছুঁড়ছেন পপিং ক্রিজের দিকে। স্পেন থেকে ঘোষণা হচ্ছে বাংলার শিল্পের। অথচ তার হদিস কোনও অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’’ তাঁর মন্তব্য, বাংলায় বিনিয়োগ করার কথা বাংলা থেকেই ঘোষণা করা ভাল। উল্লেখ্য, ২০২৩-এর সেপ্টেম্বরে স্পেনে রাজ্য সরকারের এক অনুষ্ঠানে সৌরভ ৩০০০-৩৫০০ কোটি টাকা লগ্নি করে পশ্চিমবঙ্গে একটি ইস্পাত কারখানা তৈরির কথা ঘোষণা করেন। যদিও সেই কারখানার বর্তমান পরিস্থিতি কী, তার উত্তর নেই প্রশাসনের কাছে।
রাজ্যের শিল্পায়ন বাস্তবায়িত করার জন্য শিল্প মহল এবং রাজ্য সরকার উভয়কেই হাত মিলিয়ে কাজ করার আহ্বায়ন জানিয়েছেন শমীক। বলেছেন, ‘‘রাজ্য থেকে ৬৫০০টি সংস্থা সদর দফতর সরিয়ে নিয়েছে। দেউলিয়া হয়ে গিয়ে ঝাঁপ বন্ধ করেছে ১৬০৫টি সংস্থা। অপশাসনের জন্য শুধুমাত্র যে পুঁজি চলে গিয়েছে তা নয়, সঙ্গে অন্যত্র পাড়ি দিয়েছে মেধাও। বাংলার ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করার জন্য অন্য রাজ্যকে বেছে নিচ্ছে। দক্ষ শ্রমিকদের ভিন্ রাজ্যে চলে যেতে হচ্ছে রুটিরুজির কারণে।’’
বণিকসভার মঞ্চ থেকে রাজ্য বিজেপির সভাপতির আরও দাবি, শিল্পায়নের জন্য প্রথমেই দরকার আইনের শাসন কায়েম করা। যেখানে তোলাবাজি বা সিন্ডিকেটের মতো শিল্পের পক্ষে অতি ক্ষতিকারক বিষয়গুলির অস্তিত্ব থাকবে না।