কিছু দিন আগেই জাপানের ছবি ভাইরাল হল, মানুষ বইদোকানের সামনে রাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে। রাত পোহালেই দরজা খুলবে, আর হারুকি মুরাকামির নতুন বই বিক্রি শুরু হবে— দ্য টেল অব কাহো। এক জন লেখক আর তাঁর নতুন বইয়ের জন্য শেষ এমন আকুলিবিকুলি-স্মৃতি নিশ্চিত ভাবেই জে কে রোলিং-এর হ্যারি পটার-গ্রন্থমালা ঘিরে, সেও তো হয়ে গেল অনেক বছর! নোবেল পুরস্কার ঘোষণার সময় হয়ে এল এ বছরের, প্রতি বারের মতো মুরাকামিকে নিয়ে জল্পনা-কল্পনাও শুরু হল বলে, উপরন্তু তাঁর নতুন বইখানা এখনও ইংরেজি অনুবাদে ছেপে না বেরোনোর বেদনাও বুকে বইছে বাকি বিশ্ব— এই আবহে মুরাকামি উপহার দিলেন অন্য এক বই। গল্প-উপন্যাস নয়, ব্যক্তিগত স্মৃতিনিবন্ধ— তাঁর বাবাকে নিয়ে।
মুরাকামি পড়ার মজাটা হচ্ছে, বইটা শুরু হয়ে যায় প্রচ্ছদ থেকেই। এই বইয়ের নাম অ্যাবানডনিং আ ক্যাট, সম্মুখ-মলাটে লাল জমিতে কালো বেড়ালের আয়েশি ভঙ্গি, চোখ দুটো জ্বলজ্বলে, তার উদ্যত কিংবা বিস্রস্ত লেজের পাশে খেলে বেড়াচ্ছে গ্রন্থের উপনাম, আ পার্সোনাল স্টোরি। বাবার স্মৃতি নিয়ে লেখা বই, বোঝা গেল কী করে? অরুন্ধতী রায়ের সাড়া ফেলে-দেওয়া সাম্প্রতিক স্মৃতিকথার নামে বিটলদের গানের রেশ ধরে মা শব্দটি এবং মাতৃনামটিও বুনে দেওয়া আছে, মুরাকামিতে তার বালাই নেই। তিনি ফিরেছেন তাঁর লেখায় বহুচর্চিত বেড়ালের অনুষঙ্গে, আর বইয়ের শুরুতেই লিখেছেন শৈশবের এক অতি সাধারণ স্মৃতি— বাবার সঙ্গে বাইকে (সাইকেলে?) বেরিয়ে, বাড়ি থেকে দূরে গিয়ে একটা পোষা বেড়াল ছেড়ে আসার কথা। এ আমাদেরও চেনা স্মৃতি, চেনা দংশন। বাপ-ছেলে কাজ সেরে ঘরে ঢুকতেই, দেখা গেল, সেই বেড়াল দিব্যি ঘরে! কোন পথ দিয়ে কখন সে ফিরল, এমনকি দু’টি মানুষের গতিকে টেক্কা দিয়ে তাদেরও আগে— কে তার ব্যাখ্যা দেবে!
ব্যাখ্যাটা পাঠকের সামনে ফুটে ওঠে বই পড়তে পড়তেই। বেড়াল মুরাকামির প্রিয় ‘ট্রোপ’ তা জানা, এ-বইয়ে আসল শব্দটা হল তাকে ছেড়ে আসতে (অ্যাবানডনিং) চাওয়া, এবং না-পারা। বোঝা দুষ্কর নয়, লেখক আসলে বলছেন তাঁর জীবনের নাছোড় স্মৃতির কথা, বেড়ালের মতোই বহুদূরে ফেলে এলেও যারা ঠিক পথ চিনে ফিরে আসে ঘরে। আমাদের প্রত্যেকেরই আছে এমন সব স্মৃতির বেড়াল, ‘ট্রমা’রও (‘ট্রমা’ শব্দটা ব্যবহার করে তাঁর ছোটবেলার আর একটা বেড়াল-বিষয়ক ঘটনা আমাদের বলেন লেখক, এক বেড়ালছানার তরতরিয়ে গাছের মগডালে উঠে আর নামতে না-পারার ‘ট্রমা’)। বড় হয়ে উঠতে উঠতে বাবার সঙ্গে দূরত্ব, দু’জনের যোগাযোগ কমে আসা, কুড়ি বছর সম্পর্ক না থাকা এবং বাবার মৃত্যুশয্যায় পুনর্মিলন— অনায়াসেই সব বলে দেন লেখক। যা বলেন না: বাবাকে ছেড়ে গেলেই কি ছেড়ে আসা যায় তাঁর স্মৃতিও?
অ্যাবানডনিং আ ক্যাট: আ পার্সোনাল স্টোরি
হারুকি মুরাকামি
৮৯৯.০০\
হারভিল লন্ডন
তবে প্রিয়জনকে ভুলতে চাওয়ার টানাপড়েন বা ব্যর্থতা এ-বইয়ের উপজীব্য নয়। আসলে মুরাকামি লিখতে চান ছেড়ে আসা ‘বেড়াল’টার বায়োগ্রাফি: তাঁর বাবার জীবনচরিত, সেই সময়টার সারণি। যে বাবাকে ছোটবেলায় দেখেছেন রোজ নিয়ম মেনে বুদ্ধের সামনে সূত্র পাঠ করতে, যাঁর তস্য সাধারণ যাপন নিয়ে আগ্রহ জাগেনি কখনও, তাঁরই জীবন-যৌবন খুঁড়তে গিয়ে ছেলে আবিষ্কার করেন এক আশ্চর্য সময় আর ইতিহাসকে। সেই ইতিহাসে চিন-জাপানের যুদ্ধ আছে, আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ— কিয়োটো শহরের বৌদ্ধ মন্দিরের পুরোহিত হতে চলা এক তরুণকে যে-যুদ্ধে যেতে হয় ‘ট্রান্সপোর্ট ট্রুপ’-এর প্রায়-নিরস্ত্র সেনা হয়ে, স্রেফ একটা বেয়োনেট কাঁধে। তাঁর বাবা কোনও দিন ছেলেকে নিজের এই জীবনপর্ব বলেননি, একটা ঘটনা বাদে যুদ্ধের গল্প পর্যন্ত শোনাননি কোনও দিন, অথচ তিনি ছিলেন দীর্ঘায়ু, বেঁচেছেন নব্বই বছর। সাতাত্তর বছর বয়সি ছেলে এ বার নেমেছেন অনুসন্ধানে, যুদ্ধের নথি ঘেঁটে বার করেছেন বাবার রেজিমেন্টের তথ্য। একটা না-জানা জীবন। এমন না-জানা, না-জানতে চাওয়া বাবারা কি নেই আমাদেরও আশপাশে?
‘কখনও সময় আসে, জীবন মুচকি হাসে’, চেনা গানের এই কথা বিস্ময়কর ভাবে সত্যি চিয়াকি মুরাকামি-চরিতে। এক কেরানির ভুলে কুড়ি বছর বয়সে তাঁকে যুদ্ধে যেতে হয়েছিল, চিনের দুর্গম ভূমি ও দুর্মদ সেনার সঙ্গে যুঝে প্রাণরক্ষা করতে হয়েছিল। ভাগ্যও সহায় হয়েছে তাঁর— দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানি সেনার হয়ে পার্ল হারবার-উত্তর ফিলিপিনসে, বা বর্মায়, কে জানে হয়তো ১৯৪৪-এর ইম্ফল যুদ্ধেও লড়তে হত তাঁকে, কে জানে প্রাণে বাঁচতেন কি না! যুদ্ধক্ষেত্রে বসে মানুষটি হাইকু লিখতেন; বাড়ির চিঠিতে, পত্রিকাতেও লিখে পাঠাতেন হাইকু। যুদ্ধ-ফেরত বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য পড়েছেন, শিক্ষকতা করেছেন, স্বামী ও পিতা হয়েছেন— আর এই সব কিছুর মধ্যেই একটু-একটু করে মুছে ফেলেছেন নিজের পুরনো ইতিহাস।
এই বই কি তবে সন্তানের পিতৃপ্রয়াণলেখ? প্রায়শ্চিত্ত? না কি ইতিহাসের এক কালপর্বে এক সাধারণ মানুষকে গেড়ে বসিয়ে সময়টাই ফিরে দেখা? হয়তো এই সবই, হয়তো এর কোনওটাই নয়। শেষে বলতে হয় গ্রন্থসজ্জার কথা— যে ভাবে প্রকাশক ও গ্রন্থনির্মাতারা এ-বই সাজিয়ে তুলেছেন তা দেখে তাজ্জব বনতে হয়: প্রতিটি পাতা রঙিন, চমৎকার অলঙ্করণ আর নকশায় সেজে ওঠা। সেকেলে জাপানের দেশলাইবাক্সের মার্কাও উঠে এসেছে অলঙ্করণে, অপূর্ব তা। মুরাকামির বহু লেখার ইংরেজি অনুবাদক ফিলিপ গ্যাব্রিয়েল, এই বইও তাঁর অনন্য কীর্তি। “দ্যাট’স হোয়াট হিস্ট্রি ইজ়: আ সিঙ্গল, আনস্পেয়ারিং রিয়ালিটি বর্ন ফ্রম কাউন্টলেস পসিবিলিটিজ়,” মনে থেকে যাবে।
শিশির রায়