বইটা হাতে নিয়ে অনেক দিন আগে পড়া সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের দু’টি বইয়ের কথা আমার মনে এল— শান্তা দেবীর রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় ও অর্ধশতাব্দীর বাংলা এবং মহাশ্বেতা দেবীর তুতুল। যদিও বাংলায় লেখা পিতৃস্মৃতি/জীবনীর মধ্যে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতৃস্মৃতি বোধ হয় সর্বাধিক পঠিত, শান্তা দেবী ও মহাশ্বেতা দেবীর বই দু’টিও পাঠকের ভালবাসা পেয়েছে ঢের। প্রখ্যাত বাবাদের নিয়ে মেয়েরা বহু দিন ধরে লিখছেন। ইদানীং মায়েদের নিয়েও মেয়েদের লেখালিখি বেরোচ্ছে— তাঁদের নামডাক থাক বা না থাক। কিন্তু শাশুড়ি-বৌদের কাজিয়া নিয়ে সিরিয়াল/সিনেমার শ্রীবৃদ্ধির যুগে পুত্রবধূরা স্বনামধন্য শাশুড়িদের নিয়ে বই তৈরি করছেন— এটা বিরল। আশাপূর্ণা দেবীকে নিয়ে তাঁর ছেলের বৌ নূপুর গুপ্তের একটি জীবনীমূলক প্রবন্ধ পড়েছি। আর বিশেষ কেউ শাশুড়ি-বৌ সম্পর্কের বাঁধা গত ভেঙে গ্রন্থনির্মাণ করেছেন বলে তো মনে পড়ছে না।
চম্পাকলি আইয়ুবের বইটা ব্যতিক্রমী হওয়ার একটা কারণ এই ছক-ভাঙা প্রতিস্পর্ধী বয়ান। শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও মানবাধিকার কর্মী গৌরী আইয়ুবের একাধিক রচনাসংগ্রহ সম্পাদনা/ সহ-সম্পাদনার কাজ এর আগে করেছেন লেখক, যিনি পেশায় এক জন বিজ্ঞান-গবেষক। তবে এ বই হল তাঁর খুব কাছের মানুষ গৌরীকে দেখার ও পাঠিকা/পাঠকের সঙ্গে পরিচয় করানোর ভিন্নধর্মী প্রয়াস। গৌরীর জীবনীমূলক এবং সেই সঙ্গে কিছুটা চম্পাকলির আত্মজীবনীমূলক— বিষয়বস্তু ও গঠন-বিন্যাস দু’দিক দিয়েই। সেটাও বইটাকে একটা অন্য মাত্রা দিয়েছে।
গৌরীর একটি জীবনপঞ্জি শুরুতেই পাওয়া যায়। তা ছাড়া পাঁচটি অধ্যায় রয়েছে বইয়ে। প্রতি দিনের জীবনে গৌরীর পোর্ট্রেট ও প্রবাসী চম্পাকলির সঙ্গে গৌরীর পত্রবিনিময়ের মধ্যে দিয়ে মা-মেয়ে হয়ে ওঠার আখ্যান পল্লবিত হয়েছে বইয়ের অনেকটা জুড়ে। বাকি তিনটিতে রয়েছে গৌরীকে লেখা কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তির চিঠি, গৌরীর একটি স্মৃতিচারণা, এবং গৌরীদের পার্ক সার্কাসের বাড়ির/সংসারের শেষ অঙ্ক নিয়ে লেখকের ভাষ্য। গৌরীকে লেখা বিশিষ্টজনদের চিঠিগুলোতে কখনও ছলকে পড়ছে কৌতুক— যেমন কথাশিল্পী তথা পারিবারিক বন্ধু সৈয়দ মুজতবা আলির বার্তায়— আবার কখনও ধারণ করে আছে চার অধ্যায় ও পথের দাবী-র মতো উপন্যাস সম্পর্কে এক বিপ্লবীর গভীর অনুভব— যেমন গৌরীর এক সময়কার অগ্রজ সহকর্মী বীণা ভৌমিকের (দাস) চিঠিতে।
পুত্রবধূর কলমে গৌরী আইয়ুব এবং প্রসঙ্গত
চম্পাকলি আইয়ুব
৩৭৫.০০
পরবাস
আইয়ুবদের ৫ নম্বর পার্ল রোড (যে রাস্তা পরে ওই অঞ্চলের অত্যন্ত জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ ও দরদি চিকিৎসক, ডাক্তার আবু আসাদ গনি তথা আবু সয়ীদ আইয়ুবের দাদার নামে হয়) বাড়ির শেষ অঙ্ক নিয়ে লেখকের পরিক্রমা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। নানা কারণে এটি একটি ঐতিহাসিক ঠিকানা। ওই বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে শুরু হয়েছিল গৌরী ও আবু সয়ীদ আইয়ুবের যৌথজীবন। তার পর বিয়াল্লিশ বছর ধরে গৌরীর হাতে তিলে তিলে গড়ে ওঠে এক অন্য রকমের সংসার।
বুদ্ধদেব-প্রতিভা বসু, সুধীন্দ্রনাথ-রাজেশ্বরী দত্ত, সাদাত আবুল মাসুদ, সন্জীদা খাতুন, মৈত্রেয়ী দেবীর মতো মানুষজনের জমায়েত হত সেখানে। আশ্রয় নিতেন বাংলাদেশ যুদ্ধের সময়কার মুক্তিযোদ্ধারা। গৌরীর কাছে পড়তে বা পারিবারিক/সামাজিক সমস্যায় পরামর্শ নিতে নিয়মিত যেতেন পার্ক সার্কাস অঞ্চলের গরিব ছাত্রছাত্রীরা, বিশেষত মেয়েরা, আর পশ্চিমবঙ্গের নানা জায়গা থেকে সাধারণ মুসলমান পরিবারের অনেক তরুণ-তরুণী। সব সামাজিক স্তরের ও গোষ্ঠীর মানুষকে সমমর্যাদায় গ্রহণ করার আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তাঁর। ওই ঠিকানায় ১৯৬৪-৬৫’তে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির লক্ষ্যে জোট বাঁধার জন্য সভা হয়েছে, ১৯৭৫-৭৭’এ জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে ডাকা হয়েছে গোপন মিটিং। গৌরী আইয়ুবের মৃত্যুর পর মীনাক্ষী দত্তের একটি লেখায় পড়েছিলাম, গৌরকিশোর ঘোষ, জ্যোতির্ময় দত্তের বড় ভরসার জায়গা ছিলেন তিনি। আবু সয়ীদ আইয়ুব ভয় পেতেন যে, পুলিশ গৌরীকে ধরবে, কিন্তু গৌরী গ্রাহ্য করতেন না।
গ্রাহ্য করলে কি আর পিতা ধীরেন্দ্রমোহন দত্ত গৌরীর সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করতে চলেছেন জেনেও, নিজের বিশ্বাস ও প্রেমে অবিচল থেকে, পঁচিশ বছর বয়সে আবু সয়ীদ আইয়ুবের হাতটা ধরতেন! সেই রাজনৈতিক বোধের জায়গা থেকেই এর অনেক বছর পর ভাবী পুত্রবধূ চম্পাকলিকে প্রথম আলাপেই মাতৃস্নেহে কাছে টেনে নেন গৌরী, যখন আইয়ুব পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক হওয়া নিয়ে বাপের বাড়ির অমতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে চম্পাকলি নিজেও লড়ছিলেন। নদীর বেণিবন্ধনের মতো এ বইয়ে সে-সব কাহিনি বোনা আছে।
৫ নম্বর পার্ল রোডের ফ্ল্যাটে একই সঙ্গে যে সারস্বত-সাধনা, অগণিত বন্ধু আপ্যায়ন, সমাজসেবা, অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রসার ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার জন্য আলাপ-আলোচনা চলত, তাকে চম্পাকলি বলেছেন গৌরীর পরিচালনায় অনুষ্ঠিত এক যজ্ঞ। তাই বইয়ের শেষ অধ্যায়কে তিনি ‘অন্ত্য যে ইষ্টি’ অর্থে ‘একটি সংসারের অন্ত্যেষ্টি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পার্ল রোডের বাড়ির অংশীদাররা নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকায় বহু বছর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জরাজীর্ণ বাড়িটা যখন হস্তান্তরিত হয়, সেই সময়ে অর্থাৎ বছর পাঁচেক আগে, বাড়িটা মাটিতে মিশে যাওয়ার ঠিক আগের পর্বে লেখক ও তাঁর স্বামী পূষণ আইয়ুব যে ভাবে দু’-তিন সপ্তাহ ধরে গৌরীর সংসারের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করেন, তার রোজনামচা রয়েছে এখানে।
কোনও ঐতিহাসিক বাড়ির অস্তিত্বসঙ্কট হলে, ইমারতটা রক্ষা করা না গেলেও কী ভাবে সেই বাড়ির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গের ব্যবহৃত জিনিসপত্রের উপযুক্ত আশ্রয় নির্ণয় করা যায়, তাঁদের অমূল্য সৃষ্টি ও জীবনযাপনের আদর্শ সকলের কাছে পৌঁছনো এবং জনমানসে তাঁদের স্মৃতি জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করা যায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে— এই রোজনামচা থেকে তার একটা আভাস পাওয়া যেতে পারে। বিহ্বলতা ও বেদনা অতিক্রম করে কঠিন পরিশ্রম ও গভীর চিন্তাভাবনার মধ্যে দিয়ে যা আমাদের নিয়ে যেতে পারে সংবেদনশীল সংরক্ষণের দিকে। ইতিহাস গুলিয়ে দেওয়ার প্রবণতার বিরুদ্ধে হয়ে উঠতে পারে জরুরি প্রতিরোধ।