এ বছর যাঁর শতবর্ষ, সেই মিশেল ফুকো-ই প্রথম আমাদের খেয়াল করিয়ে দিয়েছিলেন যে নামকরণ কেবল একটা নিরীহ ক্রিয়া নয়, তা আসলে একটা প্রতিপ্রস্তাব, একটা ভিন্ন বয়ান পেশ করার উদ্যোগ। গৌতম চক্রবর্তী তাঁর বইয়ের নাম দিচ্ছেন বেনারসনামা, কারণ যদিও এই মুহূর্তে সে প্রধানমন্ত্রীর কেন্দ্র, যদিও নতুন ভাবে বিশ্বনাথ মন্দির ঘিরে হিন্দুত্বের সাজো-সাজো রব, যদিও জ্ঞানবাপী মসজিদের উপরে ঝুলে আছে মামলার খাঁড়া, বারাণসীর বহুপরত ইতিহাসের নীচে, তার মহল্লা মহল্লায়, তার ঘাটে ঘাটে রয়েছে এক বহুস্বরনন্দিত জীবনযাপনের আখ্যান যা স্পষ্ট, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, সুস্বাদু এবং আশ্বাসজনক।
সাংবাদিক গৌতমের বারাণসী নিয়ে নয়টি লেখার সঙ্কলন এই বই। প্রথম লেখাটি— ‘রামমন্দিরের বারাণসীতে’— আয়তনে, মেজাজে, দেখার অনন্যতায়, এই বইটির সুর বেঁধে দিয়েছে। এর পর পাঠকের গৌতমকে অনুসরণ করে নানা গলিঘুঁজি ঘুরে বেড়ানো ছাড়া উপায় নেই। গৌতম দেখছেন এক নগর রামমন্দির উদ্বোধন উপলক্ষে সরকার যাকে সাজিয়েছে অকাতর বিলাসে, কিন্তু হিন্দুত্বের বাহ্বাস্ফোট যে শহরের ধমনী থেকে মুছে ফেলতে পারেনি মেহমানদারির যুগসঞ্চিত পরম্পরা। এই শহরের বুনটের মধ্যে রয়েছে সহজ ভাবে ভিন্নতাকে স্বীকার করেই যৌথ ইতিহাসযাপনের নানা উদাহরণ। তাজিয়া যেন আটকে না যায় তাই হিন্দু যুবকেরা গাছের ডাল কাটতে উদ্যোগী হয়, সংস্কৃত নামের মসজিদে অনায়াসে দোয়া করেন মুসলমানেরা, বৈষ্ণব উৎসবের জন্যে নমাজিরা ছেড়ে দেন তাঁদের মাজার। দুই জীবনের ধারা নিরুদ্বেগে পাশাপাশি বয়ে যায় স্বাতন্ত্র্যের চিহ্ন বজায় রেখেই। এই জীবনযাপন, গৌতম বলছেন, ‘সেকুলারিজ়ম’ শব্দটি বা তার ধারণার থেকেও ঢের পুরনো।
এর পর প্রেমচন্দের প্রথম কিসসা-র প্রসঙ্গ টেনে বেনারসের চরিত্রের এক অন্তঃতদন্ত চালাবেন গৌতম। তাঁর আক্ষেপ, বাংলা ভাষায় আজ অবধি এই উপন্যাসটি অনূদিত হয়নি। যে নারীরা জীবনের প্রয়োজনে শরীর বিনিময়ের পথে হাঁটেন, তাঁদের এক জনকে নিয়ে এই গল্পে কী আশ্চর্য পক্ষপাতহীন থাকতে পেরেছেন তরুণ প্রেমচন্দ। বাইজিদের সম্ভ্রম কেরেস্তানি নীতিবোধে ঠাহর করা যায় না। আরও গোলমাল পাকিয়ে ওঠে বাইজি মহল্লায় উচ্ছেদ আর উন্নয়নের প্রসঙ্গটি মতলবি সাম্প্রদায়িকতায় যখন বিষিয়ে যায়। একশো বছর আগেই এ-সব সূক্ষ্ম প্রশ্ন প্রেমচন্দ লক্ষ করে সতর্কবার্তা দিয়ে গিয়েছিলেন।
বেনারসনামা: জীবন যাপন উদ্যাপন
গৌতম চক্রবর্তী
৩০০.০০
সপ্তর্ষি প্রকাশন
গৌতমের বইটি পড়ার আর একটা আরাম হল— হালের যেমন রীতি— ব্যক্তিগত ঝাঁকিদর্শন থেকে তিনি কোনও বড় বড় সিদ্ধান্ত নেন না। মেধাবী কৌতূহল নিয়ে পড়ে দেখেন আগেকার ইতিহাসবিদ, সমাজবেত্তা এবং সুসাহিত্যিকদের লেখা। এবং দেখান মোগল শাসকদের হিন্দু মন্দির-বিদ্বেষ অনেকটাই কাল্পনিক। ঔরঙ্গজেব নির্বিচারে বারাণসীতে মন্দির ভাঙেননি। একটি ভাঙার কারণ সেই মন্দিরের পূজারিদের কৃত একটি ভয়াবহ অপরাধের শাস্তি প্রদান, আর একটি খুব সম্ভবত সড়ক তৈরির প্রয়োজনে। অনেক মঠ-মন্দিরেই তাঁর কোষাখানা থেকে অর্থসাহায্য এসেছে নিয়মিত। কাশীর পণ্ডিত কবীন্দ্রাচার্য শাজাহানকে যখন বলেন জিজিয়া করটা তুলে দিন, দেশদ্রোহ আইনে তাঁর কোনও শাস্তি হয় না, বরং তিনি হয়ে যান রাজসভার কবি। আজ যে গঙ্গা আরতি দেখার জন্যে ভিড় ভেঙে পড়ে, তার বীজ রয়েছে মীর রুস্তম আলির চালু করা একটি উৎসব। গণেশ পূজার সময় তিনি চালু করেন ভূর্বমঙ্গল উৎসব। গঙ্গাবক্ষে বজরা আর পানসিতে এলাহি নাচগানের বন্দোবস্ত। জ্ঞানবাপী মসজিদের নামে রয়ে গেছে স্কন্দপুরাণের গল্পের আভাস। ইতিহাস এবং লোকসংস্কৃতির এই সব উজ্জ্বল উদ্ধার দিয়েই একরৈখিক হিদুত্বের বয়ানকে নস্যাৎ করেন গৌতম।
উৎসর্গপত্র অনুযায়ী গৌতম ভক্ত নন, সংশয়ী। নির্দ্বিধায় ঘুষ দিয়ে তিনি ফুলের উপচার নিয়ে বিশ্বনাথ দর্শনে যান যখন, পুলিশ বুঝতে পারে না কেন তিনি শিবকে অঞ্জলি দিচ্ছেন না। গৌতমের পরিক্রমার মানচিত্র তাঁর অধ্যয়ন থেকে নির্মিত। তিনি জানেন যখন মণিকর্ণিকা থেকে সটান বিশ্বেশ্বরের কাছে আসার এই সড়ক বানানো হয়নি তখন পুণ্যার্থীরা জ্ঞানবাপী মসজিদের গায়ে প্রণাম সেরে শিবদর্শনে আসতেন। আর সেখানেই পরিক্রমা শেষ হত না, যেত ওঙ্কারেশ্বর অবধি। সে-মন্দির আজ বিস্মৃত। পুরনো রিকশাচালক বা মুসলমান প্রতিবেশীরাই তা চিনিয়ে দিতে পারেন।
সংশয়ী বলেই গৌতম বামপন্থীদের মনে করিয়ে দেন যে, কোনও ধর্মাচরণকেই যেন তাঁরা হিন্দুত্বের মাদক না ভাবেন, যেন তলিয়ে দেখেন তাতে মিশে আছে কোন নিপীড়িত জীবনের দীর্ঘশ্বাস। কাশী শুধু হিন্দুদের জন্যে পবিত্রভূমি নয়, এখান থেকেই সারনাথ যাত্রা করবেন তথাগত, জৈনদের চার তীর্থঙ্করের জন্মই বারাণসীতে, আর রয়েছে গুরু তেগ বাহাদুর এবং শ্রীচৈতন্যের স্মৃতি।
ইতিহাসের আর একটি কৌতুক, অওধের নবাবের খাজনা হস্তগত করতে গিয়ে বলবন্ত রাও যে রামানন্দী সাধুদের ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে ব্যবহার করবেন, তাদের বিজয়মিছিল থেকেই সূচনা হবে এখনকার রামনবমীর মিছিলের জঙ্গি ধাঁচা।
লেখক মজলিশি কায়দায় এই ভাবেই ইতিহাস থেকে চলে যান গল্পে, গল্প থেকে চলে আসেন সমাজ আর রাজনীতি চর্চায় উত্তরবাহিনী গঙ্গার মতোই অনায়াসে। বারে বারে তিনি সতর্ক করে দেন ইতিহাসের অতিসরলীকরণ সম্পর্কে, আধিপত্যের বয়ানের একদেশদর্শিতা সম্পর্কে, বারাণসীর বিচিত্র এবং জটিল জীবনজালিকার বিস্মৃতি সম্পর্কে। এ বই নিঃসন্দেহে পাঠ-তালিকায় এক মূল্যবান সংযোজন।
তবে একটি অনুযোগ করতেই হবে— এত সুন্দর একটি বই আরও যত্নে সম্পাদিত হওয়া উচিত ছিল। বেশ কিছু পীড়াদায়ক মুদ্রণপ্রমাদ এবং পুনরুক্তি তা হলে এড়ানো যেত।