বাংলা ভাষা-সাহিত্যের গবেষকদের একদা প্রাথমিক কাজ ছিল সাহিত্যগ্রন্থগুলি আতিপাতি করে পড়া। এক বার নয়, বার বার। এক দিক দিয়ে ভাবলে এ আর কী এমন কঠিন কাজ, পড়াই তো! আর এক দিক দিয়ে ভাবলে খুবই কঠিন। সংস্কৃত কাব্যশাস্ত্রীরা সহৃদয়রসিক বলতে তাঁদেরকেই বোঝাতেন, যাঁদের হৃদয় বারংবার কাব্যানুশীলনের ফলে কোনও এক কবিপক্ষে দর্পণের মতো, নির্মল। এখন অবশ্য সাহিত্য-গবেষণার ধারা বদলেছে। ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞানের ভাবনা কৌলীন্যে নিত্যনূতন সাহিত্যতত্ত্বের উদ্ভাবন ও প্রয়োগে পাঠ্যটিকে টীকা-খচিত করার বাসনা বহুধাবিস্তৃত। পাঠ-পদ্ধতির এই আয়োজনে অনেক সময় কায়দাটা পাঠের চেয়ে এত বেশি বড় হয়ে ওঠে যে কবির রচনাটি দেখাই যায় না; ‘মনে হয়, তাকে না দেখিলেও চলে।’ এর অর্থ এই নয় যে সাহিত্য-বিচারে তাত্ত্বিকতা নিতান্ত দেখানেপনা, তত্ত্ব-সহযোগে সাহিত্যপাঠ স্বাদু মৌলিক দিগন্তপ্রসারী হতে পারে। তবে সাহিত্য নামক বিদ্যাচর্চার বিষয়টি যখন নিজত্ব হারিয়ে কেবলই অপর বিদ্যাচর্চার যষ্টি সহায়ে জ্ঞানের বৃহৎ মার্গ অতিক্রম করতে চায়, তখন মনে হয় সাহিত্য-পাঠকেরও জ্ঞানমার্গে অনেক কিছু দেওয়ার আছে, সেই দেওয়ার অধিকার নিজের বিদ্যাচর্চার প্রতি আত্মপ্রত্যয়ের অভাবের ফলে তিনি হারিয়েছেন। সেই দেওয়ার প্রথম ও প্রাথমিক শর্ত, সোজা বাংলায় যাকে বলে সাহিত্যগ্রন্থগুলি আতিপাতি করে পড়ে রসাস্বাদন। পাঠ্যটিকে নানার্থে নানা সম্ভাবনায় অন্যদের কাছে উন্মোচন।
গোপা দত্তভৌমিক আলোচ্য বইয়ে এই ‘কাব্যের পাণ্ডুলিপির নানা পরিবর্তন ও পরিমার্জনে কবিমনের গতিটিকে’ অনুসরণ করতে চেয়েছেন। জানিয়েছেন, এই ‘কাব্য ও তার পাণ্ডুলিপির তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকাটি’ বিশ্লেষণ করা তাঁর উদ্দেশ্য। প্রসঙ্গক্রমে ‘কেন্দ্রাতিগ আলোচনায়’ তিনি স্পর্শ করতে চেয়েছেন ‘রবীন্দ্রসৃজনকলার বিভিন্ন বিচিত্র স্তর’। কবিতাগুলির পাঠভেদ আলোচনায় প্রতিটি শব্দের বদল যান্ত্রিক ভাবে নির্দেশ করেননি তিনি, ‘শব্দের বদলে কবির মানসিকতা কীভাবে ধরা পড়েছে তার ইতিহাস’ ধারণ করতে চেয়েছেন। গোছানো সুলিখিত গবেষণা-গ্রন্থটি পাঁচটি অধ্যায়ে বিভক্ত। প্রতিটি অধ্যায় পরস্পর সংলগ্ন কতকগুলি পরিচ্ছেদে বিন্যস্ত। ‘কালের পটভূমি’, ‘পাণ্ডুলিপি পরিচয়’, ‘কবিতার পর্যালোচনা’, ‘ভাষা, ছন্দ, চিত্রকল্প’, যথাক্রমে চারটি অধ্যায়ের বিষয়।
পঞ্চম অধ্যায়ে এসেছে ‘পাণ্ডুলিপির চিত্রচর্চা’। পাণ্ডুলিপির কাটাকুটি থেকে ছবি গড়ে তোলার যে লীলায় রবীন্দ্রনাথ আত্মনিয়োগ করেছিলেন, তা-ই কালক্রমে রবীন্দ্র-চিত্রাবলির আগ্নেয় উচ্ছ্বাসে মুক্তি পেয়েছিল। পূরবী কাব্যগ্রন্থের সঙ্গে যে নামটি অঙ্গাঙ্গি, রবীন্দ্রনাথের বিজয়া অর্থাৎ ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো কবির চিত্রী জীবনকে সর্বার্থেই সাহচর্য দিয়েছিলেন। এই বইয়ে গোপা রবীন্দ্রনাথের ‘মিরালরিও’ নামের বাড়িতে থাকার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। মিরালরিও মানে স্রোতস্বিনীকে দেখা। এই বাড়িতে ছিল একটি ব্যালকনি। ভিক্টোরিয়া জানিয়েছেন, “বেশ সচেতন ছিলাম রবীন্দ্রনাথকে এই একটি জিনিসই আমি দিতে পারি, নদীর দৃশ্যে সাজানো এই অলিন্দ। এই ছবিই তাঁর যোগ্য উপহার...।” মিরালরিওতে বাগানে বসে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন পূরবী কাব্যগ্রন্থের কবিতা ‘বিদেশী ফুল’। ‘কহিলাম, বোঝনি কি তোমার পরশে/ হৃদয় ভরেছ মোর রসে।/ কেই বা আমারে চেনে এর চেয়ে বেশি,/ হে ফুল বিদেশী।’ কবিতার পাশাপাশি গোপা রবীন্দ্রনাথের আগের লেখা একটি চিঠি উদ্ধার করেছেন। সন্তোষচন্দ্র মজুমদারকে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “বিদেশীর বন্ধুত্ব বড় বহুমূল্য জিনিষ...।” বন্ধুত্ব শব্দের অর্থ ক্ষেত্রবিশেষে নির্ভার ভাবে সম্প্রসারিত হতে পারে সন্দেহ নেই।
পূরবীর পাণ্ডুলিপি পাঠ: কবিতা ও ছবি
গোপা দত্তভৌমিক
৫০০.০০
টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট, কলকাতা
পাঠান্তর প্রসঙ্গে আলোচনায় সেই অংশই এই গবেষণাগ্রন্থে উদ্ধৃত, যেখানে পাঠান্তর অর্থবহ। যেমন ‘প্রভাত’ কবিতায় পাণ্ডুলিপিতে ছিল ‘রূপের প্রবাহ। স্পন্দিত করিছে মোর বক্ষস্থল আজি।’ গ্রন্থপাঠে ‘রূপের প্রবাহ’-র আগে ‘জন্মমৃত্যুতরঙ্গিত’ বিশেষ ব্যঞ্জনাবাহী। গোপা এই পাঠান্তরের সূত্রে জগদীশ ভট্টাচার্যের রবীন্দ্র কবিতা শতক-এর কথা স্মরণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের কাব্যবিচারে পাঠভেদের অপরিহার্যতা কাব্যরসিক পাঠকমাত্রেই স্বীকার করবেন। সন্দেহ নেই, এ কাজের দায়িত্ব সাহিত্যবিদ্যার পড়ুয়াদেরই নিতে হবে। এখনকার প্রযুক্তিকুশলতায় পাঠভেদের কাজ অনেক সহজ হয়েছে। অধ্যাপক পশুপতি শাশমল প্রযুক্তি-পূর্ববর্তী পর্বে সচেতন যত্নে শেষের কবিতা উপন্যাসের পাণ্ডুলিপিভিত্তিক পাঠান্তর নির্ণয় করেছিলেন।
পঞ্চম অধ্যায়ে রবীন্দ্রনাথের পাণ্ডুলিপির চিত্র-বিচিত্রকে কবিতার ভাবের সঙ্গে মেলানোর প্রয়াস কখনও অতিকল্পনার আশ্রয় গ্রহণ করেনি। পাণ্ডুলিপির কাটাকুটিতে কালো রঙের বহুল ব্যবহারকে মৃত্যুবোধের অনুষঙ্গে পড়া অনিবার্য ও স্বাভাবিক। পাণ্ডুলিপির অন্তর্গত বিভিন্ন ফিগার: দীর্ঘচঞ্চু পাখি, ঘন কালি লেপে প্রাণী ও মানুষের তালগোল পাকানো মূর্তি, কুকুরজাতীয় উদ্ভট মূর্তি, মনুষ্যমূর্তির আভাস, বক্রপাখি— সবই রবীন্দ্রচেতনার অন্তর্লোকের ছায়ায় বিম্বিত। পূরবী-র ‘বীণাহারা’ কবিতায় ছিল, ‘অস্তরবি গোধূলিতে/ বলে গেল পূরবীতে/ আর তো অধিক নাই দেরি।’ অস্তরবির গোধূলির ছায়া, ক্রমঘনায়মান সান্ধ্য বিষাদের ছায়াচ্ছন্নতা এই সব চিত্র-বিচিত্রের অবয়বে পড়েছে।
ছবিতে-কবিতায় রবীন্দ্রনাথ নিজেকে ভাঙেন, পূর্বরূপকে অস্থিত করেন। ভারতশিল্পের স্থিতি পূরবী-র পাণ্ডুলিপির ছবিতে ভেঙে গিয়েছিল আর পাঠান্তরের মনোযোগী পথে এই কাব্যের কবিতায় স্বীকার করা হয়েছিল, ‘রাত্রির নিকষে হায় কত সোনা হয়ে যায় মিছে’। সেই অন্ধকার অজানায় সুন্দরের শেষ অর্চনায় যোগদানের জন্য পাঠককে বার বার ফিরতে হয় পূরবী-র কবিতাগুলির কাছে। সেই ফেরার পথটিই এই গ্রন্থে বড় যত্ন করে তৈরি করা হয়েছে।