E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

স্বাধিকার অর্জন: আপন কথায়

স্বাধিকার-প্রকাশের গোড়াপত্তন হল, যখন ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক রোমিলা উচ্চতর শিক্ষার অভিলাষে লন্ডনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন; বিয়ের জন্য যে টাকা তাঁর বাবা রেখেছিলেন, তা বিদ্যাচর্চাতেই লাগবে— এই দৃঢ় মত তিনি জানিয়ে দেন।

রণবীর চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ২৯ অগস্ট ২০২৬ ০৯:২৯
চিন্তক: রোমিলা থাপর। ইতিহাসচর্চার পাশাপাশি সঙ্গী সাহিত্য, সঙ্গীতও।

চিন্তক: রোমিলা থাপর। ইতিহাসচর্চার পাশাপাশি সঙ্গী সাহিত্য, সঙ্গীতও।

ব্যতিক্রমী ইতিহাসবিদ অধ্যাপিকা রোমিলা থাপর ভারত-ইতিহাসের আদি পর্ব বিষয়ে প্রখ্যাত বই, আর্লি ইন্ডিয়া ফ্রম দ্য অরিজিনস টু এডি ১৩০০ (২০০২)-এর ভূমিকায় জানিয়েছিলেন, এই বই তাঁর ১৯৬৬-তে রচিত আ হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া, প্রথম খণ্ড (পেঙ্গুইন) গ্রন্থটির বিপুল ভাবে পরিবর্তিত, পরিমার্জিত এবং বহু-বর্ধিত রূপ— আসলে তা ছিল একটি আনকোরা নতুন প্রণয়ন। ইতিহাস-বোধের যে রূপান্তর ঘটে গেল ওই চার দশকে, লেখিকার জবানিতে, তা আত্মজীবনীর সমতুল। সেই প্রকাশনার প্রায় সিকি শতাব্দী বাদে তিনি পুরোদস্তুর আত্মচরিত রচলেন চুরানব্বই বছর বয়স পার করে। একত্রিশ পর্বে বিন্যস্ত বইটির বিষয়বৈচিত্র এবং কাল-পরিসর প্রায় মহাকাব্যিক— এক অন্তরঙ্গ, খোলামেলা বয়ান। বিবরণের শুরু তাঁর জন্ম (১৯৩১, তিন ভাইবোনের কনিষ্ঠ) এবং শৈশব দিয়ে— পাঞ্জাবি ক্ষেত্রী পরিবারের সন্তান; তাঁর পিতা যে-হেতু ব্রিটিশ জমানায় সেনাবাহিনীতে চিকিৎসক, তাই বাল্য এবং কৈশোর কেটেছে সেনা-ব্যারাকে।

আখ্যানটি কিন্তু ভারত-ইতিহাসের (বিশেষত প্রাচীন পর্বের) এক বিস্ময়কর ব্যাখ্যাতার সালমাফিক জীবনপঞ্জি নয়। অবিভক্ত ভারতের নানা শহরে (রাওয়ালপিন্ডি, লাহোর, পুণে এবং দিল্লি) স্কুলজীবনের অভিজ্ঞতা, ১৫ অগস্ট, ১৯৪৭-এ স্কুলে স্বাধীন ভারতের পতাকা উত্তোলন এবং ওই সমাবেশে লিখিত ভাষণ পেশ করা; স্নাতক স্তর অবধি ভারতে লেখাপড়ার পর উচ্চতর শিক্ষালাভের জন্যে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাত্রা; সেখানে বিশ্লেষণধর্মী অশোক-অনুসন্ধানের দরুন নজরকাড়া খ্যাতিলাভ, যা ইতিহাসবিদ এবং চিন্তক হিসাবে তাঁর দুনিয়াজোড়া প্রতিষ্ঠার কারণ; ভারতে জেএনইউ-সহ তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সুবাদে বিশিষ্ট মান্যতা (বিতর্কও নিত্যসঙ্গী); পেশাদারি কাজে এবং ভ্রমণপিপাসার তাগিদে তিনি এক বিশ্বপথিক— এই সব স্মৃতিচারণ তাঁর কলমে ঐশ্বর্যবান। অবশ্যই আছে দেশীয় এবং বিদেশি সাহিত্যের মগ্ন এক পাঠকের বৃত্তান্ত এবং ভারতীয় (প্রধানত ধ্রুপদ ও খেয়াল) এবং পাশ্চাত্য সঙ্গীতে তাঁর আশ্রয়। ইতিহাস-চর্চার প্রসঙ্গও অবশ্যই বিশদে হাজির এই বইয়ে; তবে সেই খুঁটিনাটিতে যাব না। এই আত্মকথনের ধ্রুবপদ হল কৈশোর-পার হওয়া ইস্তক স্বাধিকার-সন্ধান আর তার জন্যে আপসহীন, নিরলস প্রয়াস। সেই প্রয়াসে সিদ্ধির ফলে স্বাধিকার-অর্জনের তৃপ্তি তাঁর লেখনীতে দীপ্ত।

স্বাধিকার-প্রকাশের গোড়াপত্তন হল, যখন ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক রোমিলা উচ্চতর শিক্ষার অভিলাষে লন্ডনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন; বিয়ের জন্য যে টাকা তাঁর বাবা রেখেছিলেন, তা বিদ্যাচর্চাতেই লাগবে— এই দৃঢ় মত তিনি জানিয়ে দেন। কী ভাবে ইতিহাস-গবেষণার জগতে পা রাখলেন এ এল ব্যাশাম প্রমুখ শিক্ষকের উৎসাহে, তার স্বাদু বর্ণনা উল্লেখযোগ্য। তবে, বিদেশে স্বাতন্ত্র্যের স্বাদ পেয়ে, পিতৃতান্ত্রিক ভারতীয় সমাজে ফিরতে তিনি দ্বিধাগ্রস্ত। কিন্তু ভারতে কাজের সুযোগ মেলায় তাঁর দেশে প্রত্যাবর্তন। ইতিমধ্যেই দুর্গম মধ্য এশিয়ায় রেশম পথের খানিকটা তিনি ঘুরে নিয়েছেন; ১৯৫৭-তে বিখ্যাত দুন-হুয়াং গুহাতে বৌদ্ধ সংস্কৃতি এবং শিল্পকলা স্বচক্ষে দেখা এক অমূল্য অভিজ্ঞতা। দেশে এসে কুরুক্ষেত্র এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে শুরু করলেন বটে, কিন্তু মন বসেনি। অনেক স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন দিল্লি স্কুল অব ইকনমিক্স-এ অমর্ত্য সেন, সুখময় চক্রবর্তী, কে এন রাজ প্রমুখের সঙ্গে সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি নিয়ে আলাপচারিতায়। এর পরের ধাপ জেএনইউ-তে যোগদান— তাঁর কর্মজীবনে সার্থকতার তুঙ্গাবস্থা এই সন্তানপ্রতিম প্রতিষ্ঠানেই।

জেএনইউ-এ রোমিলা ও তাঁর সহকর্মীরা দীর্ঘ আলোচনা এবং বিতর্কের মাধ্যমে যে ধীমান পাঠ্যক্রম তৈরি করেন এবং আপন-আপন ইতিহাস-গবেষণা জারি রেখেছিলেন, তা অচলায়তন হয়নি কখনও; তাতে নানা রকম বাঁকবদল ঘটত। জেএনইউ-এর ইতিহাস-চর্চার কেন্দ্রে ছিল ভারতবাসীর ইতিহাস বোঝা। ভারত-ইতিহাসের পাঠ্যক্রম প্রধানত রাজবৃত্ত-নির্ভর; ভারতবাসীর ইতিহাসচর্চার প্রধান ভিত্তি লোকবৃত্ত। পরীক্ষিত তথ্য-উপাত্ত দর্শিয়ে, নানা প্রশ্ন তুলে, সমাজবদ্ধ মানুষের জীবনব্যাখ্যাই হচ্ছে এই পাঠের চালিকাশক্তি। প্রশ্ন তুলতে গেলে সমাজবিজ্ঞানের বিবিধ শাখার সঙ্গে পরিচিতি গড়ে তুলতেই হয়। তাতে রাজবংশের খতিয়ান, তারিখ-মুখস্থ, দাপুটে শাসকদের নিয়ে আলোচনা গৌণ থাকে। এই পদ্ধতির অতীত-চর্চা সাবেকপন্থীদের একেবারেই না-পসন্দ। তাঁদের সমালোচনার প্রধান অভিমুখ ছিল— সেই জিগিরে কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে— ওখানে শুধু মার্ক্সবাদ পড়ানো হয়, বিকৃত ইতিহাস তৈরি করা হয়; ভারত-ইতিহাসের গৌরব খাটো করে দেখালে দেশপ্রেমের হানি অবশ্যম্ভাবী। এই অভিযোগগুলির অনুপুঙ্খ-সহ জবাব থাপর আগেও দিয়েছেন, এই বইয়েও সে-কথা হাজির। প্রাচীন ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রস্থানে অপছন্দের তত্ত্বগুলিকে ‘পাষণ্ড’ বলে গাল পাড়ার রেওয়াজ ছিল; তার সাম্প্রতিক সহোদর মার্ক্সবাদী তকমা। মার্ক্স-সহ আরও বহু তাত্ত্বিককে নিয়ে গভীর পাঠ করার মূল উদ্দেশ্য অতীত নিয়ে প্রশ্ন তোলা; তার সম্ভাব্য উত্তর কিন্তু আসবে আকর তথ্যসূত্রের নির্মোহ বিচারে। এই বনিয়াদি বক্তব্যের ইচ্ছাকৃত বিকৃতি করে রটনা চলে, জেএনইউ-তে ইতিহাস-চর্চা দেশদ্রোহিতার নামান্তর । এই কারণেই ২০১৪-য় রোমিলা থাপর-সহ বহু বিশেষজ্ঞ ক্লাসঘরের বাইরে খোলা মঞ্চে নিয়মিত ব্যাখ্যা দিতেন জাতীয়তাবাদ নিয়ে। সে-ও তো বিদ্যায়তনে স্বাধিকার রক্ষার প্রচেষ্টাই।

প্রাচীন ভারতে ইতিহাসবোধের অভাব নিয়ে পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের ধ্রুব ধারণাকে নস্যাৎ করার জন্য রোমিলা কী ভাবে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় ডুব দিয়েছিলেন, তার বিবরণ বইটির এক সম্পদ। সংস্কৃত ‘ইতিহাস’ (আর ইতিহাস-পুরাণ) আর ‘হিস্ট্রি’র তরজমা ইতিহাস সমোচ্চারিত হলেও যে ভিন্নার্থক, তা এক বিরল উন্মোচন। প্রাচীন সাহিত্যকীর্তিগুলির পরিবর্তনশীল চরিত্র তিনি দেখিয়েছিলেন মহাভারত, রামায়ণ এবং শকুন্তলা-আখ্যানের সপ্রশ্ন সন্ধান করে। এই মৌলিক চর্চাগুলির জন্যে তিনি দেশে-বিদেশে সমাদর পেয়েছেন।

বেশ কিছু কাল যাবৎ জনমানসে ধারণা জাঁকিয়ে বসেছে যে, ইতিহাস লেখার মতো সহজ কাজ আর নেই। ইতিহাস-লেখার পদ্ধতির এবং প্রাথমিক তথ্যসূত্রের সঙ্গে তিলেক পরিচয় না নিয়ে, পাঁচটি বই পড়ে ছয় নম্বর বই লিখে ইতিহাসবিদ বনবার অসুস্থ মানসিকতা তো আছেই; তার সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে বিকৃত ইতিহাস লিখে ঘৃণাভাষণের আয়োজন। ইতিহাস-চর্চার স্বাধিকার রক্ষায় অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকায় রোমিলা থাপর লিখে চলেছেন জনপাঠ্য-ইতিহাস (এই শব্দবন্ধটির প্রণেতা অশীন দাশগুপ্ত), তার জন্যও আলোচ্য বইটির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। চিন্তার আবিলতা থেকে বাঁচার রসদ মুক্তমতি মানুষের কাছে পৌঁছনোর জন্যে তাঁকে লাখো কুর্নিশ।

জাস্ট বিয়িং: আ মেমোয়ার

রোমিলা থাপর

১৪৯৯.০০

সিগাল বুকস

আত্মকথার দু’টি প্রসঙ্গ নিয়ে আমার দ্বিধা আছে। সুপ্রসিদ্ধ, গবেষণানির্ভর সাপ্তাহিক পত্রিকা ইকনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি, যা সমীক্ষা ট্রাস্ট দ্বারা পরিচালিত (এই ট্রাস্টের অন্যতম সদস্য রোমিলা), তা এক জটিল পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিল (২০১৭)। তৎকালীন সম্পাদক পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা আদানিদের ব্যবসা-উদ্যোগ নিয়ে একটি নিবন্ধ লেখার পর ট্রাস্টি বোর্ডের সঙ্গে তুমুল মতানৈক্যের জেরে পদত্যাগ করেন। এই সিদ্ধান্তের অংশীদার হিসাবে রোমিলা সমালোচিতও হয়েছিলেন যথেষ্ট। আত্মকথায় তার বিবরণ দিয়ে তিনি বলেছেন, সম্পাদক না সরে গেলে ইপিডব্লিউ-কে চিরকালের জন্য বন্ধই করে দিতে হত। তাঁর বক্তব্য এবং যুক্তির প্রতি পূর্ণ মর্যাদা দিয়েও জানতে চাই, ব্যক্তিবিশেষের বিদায় নিশ্চিত করে কি প্রতিষ্ঠানের সার্বিক মঙ্গলসাধন সম্ভব?

দ্বিতীয় ধন্দ, জাতীয়তাবাদী মতাদর্শে রোমিলার প্রায় অচলা আস্থা নিয়ে। আত্মকথায় তিনি স্পষ্ট করেছেন, ঔপনিবেশিকতাকে হটিয়ে যে স্বাধীন ভারতের উন্মেষ ঘটল, তা প্রধানত গান্ধীজির ডাকে সাড়া দেওয়া, সর্বভারতীয় আন্দোলনের ফসল। অসংখ্য বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে এক মহাজাতির সত্তাকে তা দিশা দিয়েছিল। এই জাতীয়তাবাদই থাপরের কাঙ্ক্ষিত আদর্শ। তিনি উগ্র জাতীয়তাবাদী, পেশিবহুল, সংখ্যাগরিষ্ঠের আস্ফালন এবং বৈরানুসারী মতাদর্শকে রুখে যাচ্ছেন আজও। কিন্তু, জাতীয়তাবাদের অপরিহার্য উপাদান দেশপ্রেম এবং স্বদেশগৌরব, যার মধ্যে প্রকট বা প্রচ্ছন্ন থাকেই দেশের অন্দরে বা বাহিরে কোনও গোষ্ঠীকে অপর তথা দুশমন বলে দাগিয়ে দেওয়ার মালমশলা। রোমিলার অন্যতম শ্রদ্ধেয় ইতিহাসবিদ এরিক হবসবম তো জাতীয়তাবাদের মতাদর্শকে নাকচ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ আমৃত্যু সচেতন ছিলেন জাতীয়তাবাদের বিপদ নিয়ে, যে-হেতু দেশপ্রেমের দ্বেষপ্রেমে পর্যবসিত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা। রবীন্দ্রনাথ বিকল্প মতাদর্শ খুঁজেছিলেন স্বাদেশিকতার মধ্যে। এই বিশালায়তন গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ প্রায় অনুচ্চারিত, নির্ঘণ্টেও অনুপস্থিত। এই নীরবতা যুগপৎ হিরণ্ময় এবং বাঙ্ময়।


এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Historian Writer

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy