উমর খালিদ লিখতে পারেন, এবং চমৎকার লিখতে পারেন। একটা সময় বাম রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের অনেকেই সুলেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। উমরের ফ্র্যাকচারড কমিউনিটিজ়: আদিবাসী হিস্ট্রিজ় অ্যান্ড দ্য পলিটিক্স অব পাওয়ার সেই ধারার উত্তরাধিকার। এই ধারায় সুলিখন হচ্ছে চিন্তার অনুশীলন, গভীর গবেষণা ও প্রশস্ত পর্যবেক্ষণ থেকে উঠে আসা।
বর্তমান ঝাড়খণ্ডের পশ্চিম সিংভূম অঞ্চলের আদিবাসী সমাজ— বিশেষত হো জনগোষ্ঠীর ইতিহাস— এই গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু প্রশ্নগুলি অনেক বিস্তৃত: রাষ্ট্র কী ভাবে প্রান্তিক সমাজকে চিহ্নিত করে, শ্রেণিবদ্ধ করে, শাসনের আওতায় আনে, এবং সেই প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সামাজিক সম্পর্ককে পুনর্গঠিত করে— উমরের অনুসন্ধান সেই জটিল ইতিহাসেরই উন্মোচন। ঔপনিবেশিক শাসন, জ্ঞান-উৎপাদন এবং আধুনিক ভারতীয় রাষ্ট্রের গঠনপ্রক্রিয়া বোঝার এক গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানচর্চা, উমরের পিএইচ ডি-গবেষণার ভিত্তিতে রচিত এই বই।
বইটির প্রধান শক্তি তাঁর গবেষণার গভীরতা এবং যুক্তির সূক্ষ্মতায়। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ও আদিবাসী সমাজকে দু’টি পরস্পর-বিচ্ছিন্ন, অভ্যন্তরীণ ভাবে সমজাতীয় শক্তি হিসেবে না দেখে তাঁর গবেষণা থেকে আমরা পাচ্ছি, উভয়ের মধ্যেকার সংঘাত, সমঝোতা, সহযোগিতা,আত্মগতকরণ এবং পারস্পরিক রূপান্তর। এই দৃষ্টিভঙ্গি বইটিকে ঔপনিবেশিকতা বনাম প্রতিরোধের সরল দ্বিবিভাজন থেকে মুক্ত করেছে।
উমর দেখিয়েছেন, সিংভূমে ব্রিটিশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অর্থ কেবল সামরিক বিজয় ছিল না। ভূমির জরিপ, রাজস্বব্যবস্থা, আইন, পুলিশ, বন-নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক সীমানা এবং জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক শ্রেণিবিভাগ— এ-সবের সম্মিলিত প্রয়োগে একটি নতুন শাসনতান্ত্রিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল। ঔপনিবেশিক শাসকেরা যে সমাজকে বুঝতে চেয়েছিল, সেই বোঝার প্রক্রিয়াতেই তারা সমাজটিকে বদলে দিয়েছিল। ‘প্রথা’, ‘গোষ্ঠী’ কিংবা ‘জনজাতি’— এ-সবকে শিলীভূত, অপরিবর্তনীয় পরিচিতি হিসেবে নথিভুক্ত করে তারা বহমান সামাজিক সম্পর্ককে প্রশাসনিক শ্রেণির খোপে পুরে দেয়। এই ঔপনিবেশিক জ্ঞানই পরে আধুনিক রাষ্ট্রের বহু প্রতিষ্ঠান, আইনি বিভাগ এবং জনজাতি-সম্পর্কিত নীতির ভিত তৈরি করে।
এই জায়গাতেই বইটির তাৎপর্য সিংভূমের সীমানা অতিক্রম করে। আধুনিক ভারতীয় রাষ্ট্র ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের সরল প্রতিলিপি নয়; কিন্তু তার প্রশাসনিক ভাষা, জনসমষ্টিকে শ্রেণিবদ্ধ করার অভ্যাস, ভূখণ্ড ও সম্পদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি এবং রাষ্ট্রের পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রতিনিধিত্ব নির্মাণের প্রবণতার মধ্যে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার স্পষ্ট। উমরের গবেষণা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা শাসকের পরিচয় বদলালেও রাষ্ট্র ও আদিবাসী সমাজের সম্পর্কের মৌলিক অসাম্য দূর করতে পারেনি। উন্নয়ন, খনি, শিল্পায়ন ও সংরক্ষণের নামে ভূমি ও অরণ্যের উপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বর্তমান প্রকল্পগুলির সঙ্গে ঔপনিবেশিক শাসনকৌশলের সংযোগ ধারাবাহিক ভাবে ঐতিহাসিক।
ফ্র্যাকচারড কমিউনিটিজ়: আদিবাসী হিস্ট্রিজ় অ্যান্ড দ্য পলিটিক্স অব পাওয়ার
উমর খালিদ
৪৯৯.০০
জাগারনট
ঔপনিবেশিক শাসন কৌশলের বিশ্লেষণে উমর তুলে এনেছেন হো সমাজে মুন্ডা–মানকি প্রথাকে শাসনের কাজে লাগানো: গ্রামপ্রধান মুন্ডা ও কয়েকটি গ্রামের প্রধান মানকি। এঁদের শাসনব্যবস্থার অঙ্গ করে তুলে ব্রিটিশ শাসকরা সমাজে শ্রেণিবিভাজন সৃষ্টি করে। প্রথাগত প্রতিষ্ঠানকে তারা ধ্বংস করে, কিন্তু আবার প্রয়োজন মতো স্বীকৃতি দেয় ও পুনর্গঠিত করে, এবং রাষ্ট্রের প্রশাসনিক যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করে। ফলে স্থানীয় নেতৃত্বের একটি অংশ ঔপনিবেশিক ক্ষমতার মধ্যস্থতাকারীতে পরিণত হয়— যে ভাবে হয় আমাদের কালের ছত্তীসগঢ়ের সালওয়া জুড়ুম। এ বই দেখাচ্ছে, ক্ষমতা কী ভাবে সমাজের ভিতরে প্রবেশ করে, স্থানীয় স্বার্থ ও মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত হয় এবং নতুন সামাজিক ব্যবধান সৃষ্টি করে।
অবশ্য, এই যুক্তিকে বিশ্লেষণের একটি প্রধান ভিত্তি করে এগিয়ে যাওয়া বইটির একটি বড় দুর্বলতা। মুন্ডা–মানকি ব্যবস্থাকে ঔপনিবেশিক শাসনের কাজে ব্যবহারের বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু এই বিভাজনের উপর অতিরিক্ত জোর দিলে ‘আদিবাসিয়ত’-এর গভীর অন্তঃস্রোতটি আড়াল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ‘আদিবাসিয়ত’ কোনও অভ্যন্তরীণ বৈচিত্রহীন বা কালাতীত পরিচয় নয়; এটি ভূমি, অরণ্য, পূর্বজ, সমষ্টি এবং মানব-প্রকৃতি সম্পর্কের একটি স্বতন্ত্র নৈতিক ও রাজনৈতিক বোধ। ধরিত্রী যতই বিপন্না হচ্ছে, ততই পৃথিবী জুড়ে এই ‘আদিবাসিয়ত’-এর দার্শনিক ধারণা মানুষের জ্ঞানচর্চার আশ্রয় হয়ে উঠছে।
সে কারণেই আমরা দেখি, যে হো সমাজে মুন্ডা ও মানকিদের প্রথাগত মর্যাদাকে ব্যবহার করে উমরের দাবি অনুযায়ী ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকেই শ্রেণিবিভাজন গড়ে উঠেছে, সেই সমাজেই একবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে প্রায় সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠী তথাকথিত মূলধারায় না মিশে নিজেদের সারনা ধর্ম-পরিচিতি আঁকড়ে ধরছে। ঝাড়খণ্ড আন্দোলনে ঝাড়খণ্ডী পরিচিতি গড়ে তোলার একটি উপাদান ছিল আদিবাসীদের নিজেদের হিন্দুর জায়গায় সারনা ধর্মীয় পরিচিতি লেখানো। এই ধারা বহমান— এবং শ্রেণিগত ফাটলের চেয়ে পরিচিতিগত যূথবদ্ধতার দিকে বেশি করে ইঙ্গিত দেয়। উমরের বিশ্লেষণে এই স্বাভাবিক দিকগুলি গুরুত্ব পায়নি, যেমন গুরুত্ব পায়নি হুল বা উলগুলানের মতো বিদ্রোহের ভিন্নতর প্রকৃতিগুলো। পাশাপাশি হো-দের সঙ্গে এই অঞ্চলের অধিবাসী অন্য আদিবাসী গোষ্ঠীগুলির সম্পর্কের দিকটিও বিশ্লেষণের বাইরে থেকে গেছে। কিন্তু, খামতিগুলো এর কৃতিত্বকে খর্ব করে না, বরং একটি গভীর চিন্তাগত সংলাপের সুযোগ তৈরি করে।
এমন এক উজ্জ্বল বিদ্যাবেত্তা দীর্ঘ দিন ধরে বিনা বিচারে জেলে আটকে আছেন, এটা উমর খালিদের নয়, ভারতবাসীর দুর্ভাগ্য। এ বইয়ের মুখবন্ধে রামচন্দ্র গুহ নিজের এবং উমর খালিদের ধর্মীয় পরিচয়ের পার্থক্যকে সামনে এনে প্রশ্ন তুলেছেন— একই ধরনের রাজনৈতিক মতপ্রকাশের জন্য এক জন হিন্দু বিদ্যাজীবী যে স্বাধীনতা ভোগ করতে পারেন, এক জন মুসলমান চিন্তক কি তা পারেন? কিন্তু খালিদের কারাবাসকে কেবল তাঁর মুসলমান পরিচয়ের ফল হিসেবে দেখা অসম্পূর্ণ হবে। তাঁর মুসলমান ও কাশ্মীরি পরিচয় অবশ্যই রাষ্ট্র ও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাজনীতির দৃষ্টিতে তাঁকে বিশেষ ভাবে দৃশ্যমান এবং আক্রমণের লক্ষ্য করে তুলেছে। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে অস্বস্তিকর পরিচয় সম্ভবত অন্যত্র— তিনি একটি স্বাধীন ও অনুসন্ধিৎসু মনের অধিকারী, যে মন ইতিহাসের মধ্যে ক্ষমতার কৌশল শনাক্ত করার পাশাপাশি সমকালীন রাজনীতির ক্ষেত্রেও ক্ষমতাকে প্রশ্ন করেছে। তাঁর গবেষণা এবং রাজনৈতিক সক্রিয়তা তাই বিচ্ছিন্ন দু’টি জগৎ নয়; উভয়ের কেন্দ্রে রয়েছে কর্তৃত্বের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করা।
এই অর্থে আলোচ্য বইটি একই সঙ্গে ইতিহাসের গ্রন্থ এবং আমাদের সময়ের দলিল, যা দেখায়— ক্ষমতা সমাজকে বিভক্ত করে শুধু শাসনই করে না, সেই বিভাজন সম্পর্কে জ্ঞান উৎপাদন করে নিজেকে বৈধ করে তোলে। আর উমর খালিদের কারাবাস মনে করিয়ে দেয়, যে ধীশক্তি এই প্রক্রিয়াকে বুঝতে পারে এবং যে রাজনৈতিক সাহস প্রকাশ্যে তাকে প্রশ্ন করে— ক্ষমতার কাছে সেই ধীশক্তি সবচেয়ে বিপজ্জনক।
কুমার রাণা