বলা হয়, একটি ছবি হাজার শব্দের সমান! ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীকে নিয়ে বিজয় গোয়েলের বইটির ক্ষেত্রে এই উপমা অনেকাংশেই প্রযোজ্য। বইটিতে লেখকের শব্দ-বাক্যের ব্যবহার থাকলেও ছত্রে-ছত্রে বাজপেয়ীর জীবনের বহু ঘটনার ছবি আছে, যা হাজার-হাজার শব্দের থেকেও বেশি সরব। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে অটলবিহারী এক উল্লেখযোগ্য চরিত্র। সঙ্ঘ পরিবারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হওয়ার পাশাপাশি সংসদীয় গণতন্ত্রেও তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। সেই ভূমিকা শুধু প্রধানমন্ত্রী বা জনতা সরকারের আমলের বিদেশমন্ত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বইটির শিরোনামেই সেই প্রতিপাদ্য লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন।
বইটির শুরুতেই ছ’টি ছবির ব্যবহার করে বাজপেয়ীর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। যার মধ্যে বিশেষ করে নজর কাড়ে জয়প্রকাশ নারায়ণের সঙ্গে বাজপেয়ীর একটি ছবি, যা তৎকালীন সময়ে কংগ্রেস তথা ইন্দিরা-বিরোধী ব্লকের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। মোট আটটি অধ্যায়ে বাজপেয়ীর জীবনকে ভাগ করেছেন বিজয়। যার মধ্যে জীবনের গোড়ার কথা, ভারতীয় জনসঙ্ঘের দিন, জনতা পার্টির সময়কাল, প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী-জীবনের পরবর্তী সময়কালকে ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি। এই পর্বে বিভিন্ন ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি ছাড়াও কয়েকটি ছবি রাজনৈতিক গবেষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তার মধ্যে রেলকর্মীদের সভায় বাজপেয়ীর উপস্থিতি এবং পাশাপাশি গোরক্ষা সভায় তাঁর বক্তৃতা। জনসঙ্ঘ কী ভাবে শ্রমিক সংগঠন এবং হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর মধ্যে যুগপৎ প্রবেশের পথ নিয়েছিল, তা স্পষ্ট। একই ভাবে ছবিতে সত্তরের দশকে রাজনৈতিক পরিস্থিতিও উঠে এসেছে। যেমন, ১৯৭৩-এ পেট্রলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে গরুর গাড়ি চেপে সংসদ ভবনে হাজির হন বাজপেয়ী। সেই ছবিও এই বইয়ে ঠাঁই পেয়েছে।
বাজপেয়ী যে শুধু রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, বরং বিরোধী দলে থাকার সময়েই রাষ্ট্রনেতা হয়ে উঠেছিলেন, প্রমাণ করতে চেয়েছেন লেখক। সেই সূত্রেই ১৯৭১-এর কথা বলেছেন, যেখানে কূটনৈতিক ও সামরিক স্তরে দেশকে এগিয়ে দিতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সহযোগিতার পথে হেঁটেছিলেন বাজপেয়ী। এ-প্রসঙ্গে ইন্দিরা-অটলের একটি ছবি বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে।
অটল বিহারী বাজপেয়ী: দি ইটারনাল স্টেটসম্যান
বিজয় গোয়েল
৪০০০.০০
হেরিটেজ ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন
১৯৭৭ সাল সম্ভবত বাজপেয়ীর রাজনৈতিক জীবনে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ মোড়। দুই দশকের সংসদীয় অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিয়ে জনতা সরকারের বিদেশমন্ত্রী হন তিনি। এই পর্বেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির দুনিয়ায় তাঁর প্রবেশ। বইয়ের দু’টি ছবি এ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমটি মস্কোর রেড স্কোয়ারে সম্মানজ্ঞাপন এবং দ্বিতীয়টি দিল্লি বিমানবন্দরে চিনা কূটনীতিকদের সঙ্গে বাজপেয়ী। ভারত-সোভিয়েট মৈত্রী নেহরু এবং ইন্দিরার হাত ধরে শক্ত হয়েছিল। সরকার বদলালেও কূটনৈতিক ভারসাম্যে বাজপেয়ী বদল আনতে চাননি। এ দিকে, ১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধের পর বেজিংয়ের সঙ্গে দিল্লির দৌত্য বিদেশমন্ত্রী বাজপেয়ীর আমলেই শুরু।
বর্তমানে দেশে রাজনৈতিক বিরোধিতার সঙ্গে পারস্পরিক কুকথা, কদর্য বচন জুড়ে গিয়েছে। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে এই বইটির সম্পদ— সত্তর, আশি, নব্বইয়ের জগতে যুযুধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দের ছবি। এর উপমা হিসেবে বাজপেয়ী এবং চন্দ্রশেখরের ছবির কথা যেমন বলা যায়, তেমনই তৎকালীন কংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিংহ রাওয়ের হাতে বাজপেয়ীর কবিতার বইয়ের উদ্বোধনের কথাও বলতে হয়। এ-প্রসঙ্গেই আর একটি ঘটনা উল্লেখের দাবি রাখে। রাওয়ের সিদ্ধান্তেই ১৯৯৩-এ রাষ্ট্রপুঞ্জে ভারতের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন তৎকালীন বিরোধী দলনেতা বাজপেয়ী। এ-প্রসঙ্গে বাজপেয়ী পরবর্তী কালে বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক স্তরে রাওয়ের এই সিদ্ধান্ত গণতন্ত্রে শাসক-বিরোধীর সৌজন্যের বিরল নজির হিসেবেই গৃহীত হয়েছিল। শাসক-বিরোধীর রাজনৈতিক তর্কের বাইরেও বিভিন্ন দলের নেতাদের হাসিঠাট্টা, বন্ধুত্বের নানা মুহূর্ত এই বইয়ে। এই মুহূর্তগুলির মধ্যে কয়েকটি বিরল ছবিও জুড়ে গিয়েছে। যেমন, ১৯৯৮ সালে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ইন্দ্রকুমার গুজরালের হাত ধরে হাসছেন সদ্য প্রধানমন্ত্রী হওয়া বাজপেয়ী। দু’জনের মাঝে দাঁড়িয়ে নীল পাগড়ি পরিহিত এক শিখ। যিনি ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রী পদে বাজপেয়ীর উত্তরসূরি হবেন। বাজপেয়ীর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়ে পরমাণু শক্তি পরীক্ষা, কার্গিল যুদ্ধ ইত্যাদি বহুচর্চিত ঘটনার ছবিও ঠাঁই পেয়েছে বইয়ে। উঠে এসেছে এনডিএ-র শরিক বিভিন্ন আঞ্চলিক দলগুলির নেতাদের সঙ্গে বাজপেয়ীর সৌহার্দের ছবিও। ইন্দিরা জমানা থেকেই মহাশক্তিধর কংগ্রেসের সঙ্গে যুঝতে বাজপেয়ী বুঝেছিলেন, দেশের জাতীয় রাজনীতিতে আঞ্চলিক দলগুলিকে গুরুত্ব দিতেই হবে। এনডিএ-র নেতৃত্বে থাকার সময়েও আঞ্চলিক দল ভাঙিয়ে বিজেপির সাংসদ-ঝুলি ভরার চেষ্টা করেননি।
বইয়ের সংযোজিত অংশে বাজপেয়ীর বিভিন্ন পছন্দের তালিকাও দিয়েছেন বিজয় গোয়েল। তাৎপর্যপূর্ণ, গেরুয়া শিবিরের অন্যতম মহারথী মাছ খেতে, চিনা খাবার খেতে ভালবাসতেন। দিল্লির চাঁদনি চকের পরাঠেওয়ালে গলি, চাংওয়া ছিল প্রিয় খাবারের জায়গা। প্রিয় সিনেমার তালিকায় ছিল গান্ধী! প্রিয় কবির নাম ফৈজ় আহমেদ ফৈজ়। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে এই তালিকা বিস্মিত করে!
তবে অটলবিহারী বাজপেয়ীর জীবনে ব্যর্থতা বা কঠিন সময় কি একেবারেই ছিল না? ভোটে পরাজয়ের পর তাঁর মুখের অভিব্যক্তি কেমন হত? সে-সব ছবি তেমন ভাবে ঠাঁই পায়নি এখানে। পেলে হয়তো বইটি আরও সমৃদ্ধ হত।