নব উদারনীতিবাদ-অনুপ্রাণিত বিশ্ব-শাসনব্যবস্থায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান-সহ বিভিন্ন সামাজিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ক্রমহ্রাসমান যোগদান সমকালীন সমাজে আর্থিক বৈষম্যের উত্তরোত্তর বৃ্দ্ধির এক অন্যতম কারণ হিসাবে দেখা হয়। নিম্নবিত্ত মহিলা-সহ আর্থ-সামাজিক ভাবে পিছিয়ে পড়া অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করার উপায় হিসেবে শর্তসাপেক্ষে বা বিনা শর্তে নগদ হস্তান্তরকে বেছে নিয়েছে অনেক রাষ্ট্রই। স্বরোজগার-চালিত আর্থিক স্বনির্ভরতার ধারণা অবশ্য এর অনেক আগে থেকেই ভারত-সহ অন্য তথাকথিত ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর রাষ্ট্রগুলি নিজেদের উন্নয়ন নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করে আসছে। পশ্চিমবঙ্গের মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠী আন্দোলনের রূপরেখা ও সমকালীন হাল-হকিকতের সন্ধান দেওয়া, দেবরাজ ভট্টাচার্য ও সুমন নাথ সম্পাদিত এই বইটি স্বনির্ভর-ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন যাবৎ কর্মরত উন্নয়ন-কর্মীদের দৃষ্টিকোণ সম্বলিত এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
‘ওয়েস্ট বেঙ্গল সেল্ফ হেল্প গ্রুপ প্রোমোশনাল ফোরাম’-এর পরিকল্পিত এই বইয়ে সম্পাদকদ্বয়ের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নক্ষেত্রে দীর্ঘকালীন তাত্ত্বিক ও তৃণমূল স্তরের অভিজ্ঞতা বইয়ে পরিবেশিত উন্নয়নের বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে কথোপকথনকে উপলব্ধিসম্পন্ন ও সুখপাঠ্য করেছে। ভূমিকা ও পরিশিষ্ট বাদে বইটি মূলত কথোপকথন-প্রধান, এবং চার ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে স্বনির্ভর গোষ্ঠী সম্পর্কিত নীতি প্রণয়নকারীদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগে যথাক্রমে নাগরিক সংগঠনের উন্নয়ন-কর্মী ও উন্নয়ন-বিশেষজ্ঞ সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয়েছে। চতুর্থ ভাগে মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর নেত্রীদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবেশিত হয়েছে। পরিশিষ্টে ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের স্বনির্ভর গোষ্ঠী আন্দোলনের বিভিন্ন মাইলফলকের সূচি দেওয়া হয়েছে।
বইয়ের ভূমিকা আলোকপাত করে উন্নয়নবিদ্যা চর্চার জগতে অ্যাকাডেমিক গবেষকদের স্বরের প্রাধান্য ও তার সঙ্গেই উন্নয়ন-কর্মীদের মূল্যবান অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির দুর্বল প্রতিনিধিত্বের উপরে। উন্নয়ন-কর্মীদের স্বরের এ-হেন প্রান্তিকীকরণের হেতু সম্পাদকদ্বয় মূলত সমকালীন গবেষণাজগতে বিশেষভাবে সমাদৃত অ্যাকাডেমিক লেখার ধরনে খুঁজেছেন, যা সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষিত অধ্যাপক-গবেষকদের দৃষ্টিকোণকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। সেই প্রেক্ষিতে এই বইয়ের অবদান অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিতে কর্মরতা দরিদ্র ও প্রান্তিক শ্রেণির মহিলাদের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন; আত্মমর্যাদাবোধ, ধীরে ধীরে পরিবারের পুরুষ সদস্যদের দৃষ্টিভঙ্গির বদল এবং বাল্যবিবাহ, মদে আসক্তি প্রভৃতির মতো বিষয়জনিত সামাজিক সচেতনতার প্রকাশ দ্বারা মহিলাদের প্রকৃত ক্ষমতায়নের কথাও তুলে ধরেন সম্পাদকদ্বয়। ভূমিকা-সহ বইয়ের বিভিন্ন অংশে ‘পার্টি সোসাইটি’ অভিহিত পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পট-পরিবর্তন ও মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর কার্যকলাপের উপরে তার প্রভাব নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে।
লিসনিং টু দ্য প্র্যাকটিশনারস: দ্য এসএইচজি মুভমেন্ট ইন ওয়েস্ট বেঙ্গল
সম্পা: দেবরাজ ভট্টাচার্য, সুমন নাথ
৬৫০.০০
সোপান
বইয়ের প্রথম ভাগে স্বনির্ভর গোষ্ঠী সম্পর্কিত নীতি প্রণয়নকারীদের সঙ্গে সম্পাদকদের কথোপকথনে গ্রামীণ দারিদ্র দূরীকরণার্থে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের দ্বারা গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পের ধারাবাহিকতা, আন্তঃসম্পর্ক, পারস্পরিক প্রভেদ ও সংঘাতের ছবি ফুটে ওঠে। অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক দিলীপ ঘোষের বক্তব্যে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সঙ্গে গ্রাম পঞ্চায়েত ব্যবস্থার সম্পর্কের জটিলতার পাশাপাশি অন্ধ্রপ্রদেশ ও কেরলের মতো রাজ্যগুলিতে স্বনির্ভর গোষ্ঠী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও ভিন্নধর্মী বাস্তবতার কথাও জানা যায়। স্বনির্ভর গোষ্ঠী-সম্পর্কিত জাতীয় নীতির অন্ধ্রপ্রদেশের অভিজ্ঞতা দ্বারা গভীর ভাবে প্রভাবিত হওয়া, এবং পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক প্রেক্ষাপটের স্বতন্ত্রতা প্রতিষ্ঠা করা নিয়ে এ রাজ্যের আধিকারিক ও অন্য নীতি প্রণয়নকারীদের দীর্ঘ লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যায় এই অংশে।
নাগরিক সংগঠনের উন্নয়ন-কর্মীদের বক্তব্যে উঠে আসে স্বনির্ভর গোষ্ঠীতে কর্মরতা বা যুক্ত হতে ইচ্ছুক প্রান্তিক মহিলাদের রাষ্ট্র বা এনজিও কর্মীদের তত্ত্বাবধানে নিবিড় প্রশিক্ষণ, যত্ন ও সহায়তার প্রয়োজনীয়তার প্রসঙ্গ। কেন্দ্রের স্বর্ণজয়ন্তী গ্রাম স্বরোজগার যোজনার অধীনে মহিলাদের স্বনির্ভর গোষ্ঠীতে অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি সাক্ষরতা মিশন, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি-সহ নীতি নির্ধারণের পূর্ণাঙ্গ অভিমুখের কিছুটা বিপরীতেই লক্ষ করা যায় অপেক্ষাকৃত নবীন জাতীয় গ্রামীণ জীবিকা মিশনের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও পুঁজির প্রসার-প্রধান অভিমুখ। বইয়ের প্রথমাংশে উন্নয়ন-কর্মী ও গবেষক মেরিন মুখোপাধ্যায়ের মতে, নীতি নির্ধারণে এ-হেন অসামঞ্জস্যের প্রতিবিম্ব রাজ্যে বাম ফ্রন্ট সরকারের আমলে কর্মরত আধিকারিক ও পরবর্তী তৃণমূল সরকারের আমলের নবীন আধিকারিকদের কর্মের নিজ নিজ অভিমুখেও দেখা যায়। বাম আমলে ও তৃণমূল আমলে কর্মরত আধিকারিকদের মধ্যে সমাজচেতনার প্রভেদ এবং তৃণমূল জমানায় স্বনির্ভর গোষ্ঠীর বিকাশে যত্নশীলতার অভাবে আলোকপাত করেন মেরিন-সহ অন্য উন্নয়ন-কর্মীরা। বর্তমান সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক অনাগ্রহের পাশাপাশি স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির অগ্রগতি বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে কোভিডজনিত লকডাউনের অভিঘাতেও, মনে করেন উন্নয়নকর্মী রাজেশ্বর বসু।
স্বনির্ভর গোষ্ঠীতে অন্তর্ভুক্তি ও যোগদানের অভিজ্ঞতা গ্রামীণ প্রান্তিক মহিলাদের কাছে কোন উপলব্ধি বহন করে? বইয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ অংশে লেখক-সাংবাদিক ও স্বনির্ভর গোষ্ঠীর নেত্রীদের বয়ানে এর হদিস পাওয়া যায়। লেখক-সাংবাদিক স্বাতী গুহের কথায় উঠে আসে স্বনির্ভর গোষ্ঠীতে যোগদানকারী মহিলাদের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে যাত্রা করার মাধ্যমে স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদন করার এবং গ্রামীণ সড়ক-সহ অন্যান্য পরিকাঠামোর বিকাশে শরিক হতে পারার মাধ্যমে তাঁদের আত্মমর্যাদার বোধ তৈরি হওয়ার কথা। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর নেত্রী মাধবী হাজরার বয়ানে ফুটে ওঠে তাঁর ইংরেজি ভাষা আয়ত্ত না করতে পারার যন্ত্রণা, এবং কাজের মাধ্যমে সঞ্চিত পুঁজির দ্বারা কন্যাসন্তানকে ইংরেজি মাধ্যমে উচ্চশিক্ষিত করতে পারার প্রজন্মগত স্বপ্নপূরণের কাহিনি। স্বনির্ভর গোষ্ঠীতে যোগদানের মাধ্যমে সঞ্চারিত মহিলা ক্ষমতায়নের সংজ্ঞার মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের স্থান কতটা? লেখক-সাংবাদিক স্বাতী ভট্টাচার্যের কথায় যানা যায় যে, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর নেত্রীরা সামাজিক স্তরে যথেষ্ট সাহসী ও দৃঢ়চেতা হওয়া সত্ত্বেও পঞ্চায়েতের নির্বাচনী রাজনীতিতে তাঁদের যোগদানের পরিসর সঙ্কীর্ণ, যদিও স্বনির্ভর গোষ্ঠীর ফেডারেশনগুলির রাজনীতিকরণ ক্রমশই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ ক্ষেত্রে এই সঙ্কলনে স্বনির্ভর গোষ্ঠী সম্পর্কে পঞ্চায়েত স্তরের রাজনৈতিক পদাধিকারীদের কিছু বক্তব্য অন্তর্ভুক্ত হলে হয়তো বইটি আরও সমৃদ্ধ হত।
পশ্চিমবঙ্গে নারীদের সার্বিক সশক্তিকরণের ক্ষেত্রে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর অবদান অসীম এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা ও রূপান্তর পেরিয়েও তার প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। তবুও সাম্প্রতিক কালে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর পরিধির সঙ্কোচন ও সমান্তরালে মাইক্রোক্রেডিটের সম্প্রসারণের ফলে নিম্নবিত্ত পরিবারের মহিলাদের ঋণের জালে জড়ানোর ঘটনা এক প্রকার প্রাত্যহিকতার রূপ ধারণ করেছে। এ-হেন প্রেক্ষিতে এই বইটিতে আলোচিত মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠী-সম্পর্কিত উন্নয়ন-পেশাজীবীদের বয়ান গ্রামীণ লিঙ্গ-রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ে আগ্রহী ছাত্র-গবেষক, নাগরিক সংগঠনের কর্মী, প্রশাসনিক আধিকারিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব তথা কর্মীদের কাছে অবশ্যপাঠ্য ও মূল্যবান।