E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

মানুষের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আকুতি

১৯৫৭ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ এক ঋতু প্রকাশের প্রায় ন’বছরের ব্যবধান রেখে প্রকাশিত হয় সদর স্ট্রিটের বারান্দা (১৯৬৬) ও নিজস্ব ঘুড়ির প্রতি (১৯৭৫)।

তীর্থঙ্কর দাশ পুরকায়স্থ

শেষ আপডেট: ২৫ জুলাই ২০২৬ ০৭:০৪

বাংলা কবিতার পাঠকদের জন্য প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের শ্রেষ্ঠ কবিতা-র প্রকাশ সুসংবাদ। যাঁরা এই কবির কবিতার সঙ্গে কম-বেশি পরিচিত তাঁরা জানেন, ১৯৮৭ সালে ‘নাভানা’ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতা। হয়তো সে কারণেই দে’জ়-এর যে ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র সিরিজ় রয়েছে, তাতে এত কাল অনুপস্থিত ছিলেন প্রণবেন্দু। কারণ যা-ই হোক, এই শূন্যস্থানটি ভরাট হওয়ায় পাঠক হিসেবে আমরা কৃতজ্ঞ। কয়েক বছর আগে সপ্তর্ষি প্রকাশন প্রণবেন্দুর প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত অধিকাংশ কবিতা একত্র করে দুই খণ্ডে কবিতা সংগ্রহ প্রকাশ করেছে। নানা তথ্যে সমৃদ্ধ খণ্ড দু’টি সম্পাদনা করেছিলেন সুমন্ত মুখোপাধ্যায়। দুঃখের বিষয়, সংগ্রহযোগ্য এই খণ্ড দু’টি মুদ্রণপ্রমাদে কণ্টকিত। বর্তমান গ্রন্থটি সে ত্রুটি থেকে অনেকটাই মুক্ত।

গ্রন্থের শুরুতে প্রকাশকের নিবেদনে ‘নাভানা’র বইটির উল্লেখ রয়েছে। সেখানে ভূমিকা থেকে উদ্ধৃত অংশটিতে কবি জানাচ্ছেন তাঁর নিজের কবিতা সম্পর্কে ‘শ্রেষ্ঠ’ শব্দটির ব্যবহারে তাঁর অস্বস্তির কথা, এবং বলছেন, ‘নির্বাচিত’ শব্দটিই তাঁর বেশি পছন্দের। ১৯৯৯ সালে ‘কবিতা পাক্ষিক’ নির্বাচিত কবিতা নাম দিয়ে যে গ্রন্থটি প্রকাশ করে, তাতে নির্বাচনের ভার কবি স্বয়ং নিয়েছিলেন কি না আমাদের জানা নেই। শেষ গ্রন্থটি প্রকাশের পরেও আরও অনেক কবিতা লেখা হয়েছে। আলোচ্য গ্রন্থের সম্পাদক সন্দীপন চক্রবর্তী একটি গ্রন্থের পরিসরে অনেক কবিতাকেই অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছেন। পৃষ্ঠাসংখ্যার সীমাবদ্ধতা মেনে শুধু ‘বীজ’ কাব্যনাটকটিই রাখা হয়েছে। সূচিপত্রে কাব্যগ্রন্থগুলির প্রকাশকালের উল্লেখ থাকায় পাঠক মোটামুটি ভাবে অনুসরণ করতে পারবেন কবির মনের যাত্রাপথ। তাঁর ভাবনার চলনটি বোঝাতে আমরা জানি, কবি তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতা-য় পরবর্তী কবিতার বইয়ের কবিতাকে নিয়ে এসেছেন আগে। বর্তমান সম্পাদক সে বিন্যাসকে মান্যতা দিয়েছেন।

১৯৫৭ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ এক ঋতু প্রকাশের প্রায় ন’বছরের ব্যবধান রেখে প্রকাশিত হয় সদর স্ট্রিটের বারান্দা (১৯৬৬) ও নিজস্ব ঘুড়ির প্রতি (১৯৭৫)। তার পর থেকে প্রকাশকালের ব্যবধান কমে এসেছে। নিজস্ব কণ্ঠস্বর গড়ে নেওয়ার যে তাগিদ তিনি অনুভব করছিলেন, তা ধীরে ধীরে ফলপ্রসূ হয়ে উঠেছে। তার কিছুটা ইঙ্গিত যেন পাই শেষোক্ত গ্রন্থটির নামকরণে। প্রণবেন্দু কখনওই জনপ্রিয় কবি নন। তাঁর কোনও কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ বেরোয়নি। জীবনের উপান্তে ২০০৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রবীন্দ্র পুরস্কার পেয়েছেন। ২০০৭ সালে তিনি প্রয়াত হন।জনপ্রিয় না হওয়ার কারণটি তাঁর কাছে অস্পষ্ট ছিল না। নিজের সম্পাদিত অলিন্দ পত্রিকায় লিখেছিলেন, “একজন কবি প্রচারযন্ত্রের আনুকূল্য পান তখনই, যখন তিনি যা লিখেছেন তা বাজারে চলে।” তাঁর অনুরাগী পাঠকদের কাছে এ মন্তব্য একই সঙ্গে আনন্দের ও দুঃখের।

প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের শ্রেষ্ঠ কবিতা

সম্পা: সন্দীপন চক্রবর্তী

৩৯৯.০০

দে’জ়

‘কবিতা ভবন’কে কেন্দ্র করে এক সময় বাংলা কবিতার যে বুদ্ধিদীপ্ত পরিমণ্ডলটি গড়ে উঠেছিল, তাঁর তরুণ বয়সে প্রণবেন্দু ছিলেন তার উজ্জ্বল প্রতিনিধি। অগ্রজ কবিদের ও প্রতিভাবান বন্ধুদের সাহচর্যে কবিতার আকাশে তাঁর উড়াল। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ তার শরীরে বহন করে সে দিনের সে প্রাণোচ্ছলতার চিহ্ন। কিন্তু ক্রমশই সমস্ত প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত করে তাঁর কবিতাকে নিজস্ব স্বতন্ত্রতায় পরিচিত করে তোলার প্রণোদনা আসছিল অন্তর থেকে। পাঠক বইটি মনোযোগ দিয়ে পড়লে কবির ভাষা ও ভাবনার ক্রমিক ভাঙা-গড়াটি অনুভব করবেন। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখের প্রশংসা পেলেও তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ তাঁর ভাবী গতিপথ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ সদর স্ট্রিটের বারান্দা-য় কবিতাগুলি যেভাবে বিন্যস্ত, তাতে চোখে পড়ে সঙ্গীতময়তাকে অতিক্রম করে তাঁর কবিতা ক্রমশ আসতে চাইছে মুখের ভাষার কাছাকাছি: “একটা কথা আমায় জানতে হবে/ ওরা আমায় পাহাড় থেকে/ গড়িয়ে ঠেলে দিল কেন?” (‘অপেক্ষা’)। কিছুটা এগিয়ে গেলে শুনতে পাই যা ক্রমশই তাঁর কবিতার একটি ধ্রুবপদ হয়ে উঠবে: ‘মস্ত একটা হাওয়ায়, ভাঙাঘরে,/ মানুষ কাঁপছে’ (‘মানুষ, ১৯৬১’)।

প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের কবিতার সঙ্গে পরিচিত সব পাঠকই জানেন, মানুষের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আকুতি তার মূল সুর। ‘মানুষ’ শব্দটির ধারণা তাঁর কবিতায় কিছুটা বিমূর্ত। কোনও বিশেষ ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠী তাঁর উদ্দিষ্ট নয়। ব্যষ্টির সঙ্কীর্ণ বৃত্তের বাইরে যে বৃহৎ মানবসমাজ, তার সঙ্গেই নিজেকে যুক্ত করতে চান তিনি। রাজনীতি তাঁকে আকৃষ্ট করে না, তবে কলাকৈবল্যবাদে তাঁর আস্থা নেই। রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগ না দিলেও মানবসমাজের যে কোনও আলোড়ন তাঁর মনকে স্পর্শ করত। যে মানুষের কথা তিনি বলেন, তার অন্তর্গত হয়ে আছে জাল হাতে দাঁড়ানো মাঝি, ধুলোয় ঘুমিয়ে থাকা রিকশার চালক, সাইকেল থেকে নেমে হেঁটে যাওয়া নিঃসঙ্গ যুবক, সেই সব সাধারণ মানুষ যারা ঘুম থেকে উঠে দাঁত মাজে, বাথরুমে সস্তা গান গায়, আবার কখনও রঁদার মূর্তির মতো গালে হাত দিয়ে স্তব্ধ বসে থাকে। তাঁর মানুষের দিকে গ্রন্থটিকে তিনি যখন তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ কবিতার বই’ বলে দাবি করেন, ‘সুপারলেটিভ’-এর প্রতি তাঁর স্বাভাবিক অনীহা সত্ত্বেও, তখন বুঝতে হবে, এখানে তার লালিত ভাবনা তাঁর দৃষ্টিতে প্রার্থিত স্পষ্টতা পেয়েছে।

বইটি থেকে অসংখ্য উদ্ধৃতি দিয়ে দেখানো যায় এই আকুতির রূপটি। আবার লক্ষ করে দেখলে বোঝা যাবে পাশাপাশি বিস্তৃত হয়ে আছে আর একটি বিষণ্ন মানচিত্র, প্রত্যাখ্যানের চিহ্নে ভরা। বিচ্ছিন্নতা নয় যে কাব্যগ্রন্থের নাম, সেখানে পড়ি এ আশঙ্কার কথা: ‘কিন্তু যে বাড়াব হাত সে আঙুল পুড়ে যাবে না তো?’ (‘বিচ্ছিন্নতা’)। বাস্তবজীবনে পাঠকের উদাসীনতা বিদ্ধ করেছে তাঁকে। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের ‘কবি সম্মেলন’ নামের কবিতায় পড়ি: ‘কোথাও কেউ নেই/ তবু কবি একলা ঘরে একা একা কবিতা পড়ছেন।/ দু’তিনজন লোক ছিল, তারা দশ মিনিট পরেই উঠে গেল’। কবিতার অমোঘ শক্তিতে বিশ্বাস ও মানুষের বিশ্বাসভঙ্গের টানাপড়েনে বিক্ষত প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের কবিতা।

আজকের বাংলা কবিতার পাঠক কি নিজেকে এ বার প্রস্তুত করে নেবেন প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের কবিতাকে গ্রহণ করার জন্য? শঙ্খ ঘোষের কবিতায় আমরা দেখেছিলাম সে শান্ত কবিতার স্বীকৃতি: ‘কবিতা তোমার কাছে কাঠবিড়ালীর মতো আসে/ ক্ষিপ্র পায়ে ভীরু চোখে স্বতঃস্ফূর্ত ভোরের আভাসে’ (‘প্রণবেন্দু, প্রিয়বরেষু’/ ছন্দের ভিতরে এত অন্ধকার)।


এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Review book review

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy