E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

ঊনজীবনের নিজস্ব স্বর

এমনই এক ঊনজীবনের সন্ধান দেয় সাক্ষাৎকারভিত্তিক দু’টি বই, ঊনসতীদের বেত্তান্ত এবং সোনাগাছির সতী-ঊনসতী সন্ধান। ঊনসতী কারা?

প্রহেলী ধর চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৭:৫৬
লড়াই: ধর্মতলায় যৌনকর্মীদের সমাবেশে অধিকারের দাবি, ১৯৯৫।

লড়াই: ধর্মতলায় যৌনকর্মীদের সমাবেশে অধিকারের দাবি, ১৯৯৫।

‘ঊন’ অর্থাৎ কিনা অপেক্ষাকৃত কম, হীন বা ঘাটতিযুক্ত। বাংলা ভাষায় সংখ্যাবাচক শব্দে ‘ঊন’-এর ব্যবহার যতটা, যেমন কুড়ির সামান্য কম বোঝাতে উনিশ, ত্রিশের একটু কম বোঝাতে ঊনত্রিশ, অপরাপর ক্ষেত্রে তার ধারেকাছেও নয়। ঊনাভাত (অর্থাৎ কম ভাত), ঊনপাঁজুরে (পাঁজরের হার কম বা দুর্বল), ঊনসত্ত্ব (সত্ত্ব বা বলের ঘাটতি)-এর মতো শব্দগুলি ব্যবহৃত বাংলা ভাষায় সে ভাবে স্থান পায়নি। হিন্দি বা ইংরেজিতেও ‘ঊন’-এর এমন স্বতন্ত্র ব্যবহার চোখে পড়ে না। কারণ সম্ভবত এই যে, আমাদের সভ্যতা আমাদের গোটা পৃথিবীটাকে অবিসংবাদিত সাদা-কালোর বাইনারিতে দেখতে এবং দাগিয়ে দিতেই অভ্যস্ত করেছে। ‘ঊন’, আপেক্ষিক হীনতা বা ধূসরতার কোনও জায়গা সেখানে নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রবণতা আরও বাড়ছে। আজকাল আমরা সব কিছুই দেখতে চাইছি সত্য-মিথ্যে, ভাল-মন্দ, ঠিক-ভুলের চরম রূপে। যদিও আমরা সকলেই জানি যে সত্য আর মিথ্যের মাঝে হাজারো একটা আধা-সত্য, প্রায়-সত্য কিংবা ঊন-মিথ্যার ‘লেয়ার’ বর্তমান; বুঝি যে ভাল-মন্দ, ঠিক-ভুল সবই আপেক্ষিক ও পরিপ্রেক্ষিত-নির্ভর। এমনকি প্রতিটি মানবজীবনকেই ঊনজীবন বললে অত্যুক্তি হয় না। কারণ দস্তয়ভস্কির ‘দ্য হাউস অব ডেড’ গল্পের মতোই আজকের পৃথিবীতে আমাদের জীবন, জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে দোদুল্যমান— “আমরা জীবিত নই, যদিও আমরা বেঁচে আছি; আবার আমরা কবরে শুয়েও নেই, যদিও আমরা তো কবেই মরে গেছি।”

এমনই এক ঊনজীবনের সন্ধান দেয় সাক্ষাৎকারভিত্তিক দু’টি বই, ঊনসতীদের বেত্তান্ত এবং সোনাগাছির সতী-ঊনসতী সন্ধান। ঊনসতী কারা? লালবাতি অঞ্চলের সতেরো জন যৌনকর্মীর আপন ভাষ্যে “ল্যাখাপড়া জানা লোকেরা ইংরেজিতে বলে যৌনকর্মী, আর সবাই বলে বেশ্যা, খানকি, রেন্ডি, ধান্দাউলি, লাইনের মেয়ে।” এখানে লক্ষণীয় যে, আমাদের সামাজিক নির্মাণের ভাষায় সম্পাদক এঁদের কথা ‘অসতীদের বৃত্তান্ত’ নামেও পরিবেশন করতে পারতেন; কিন্তু সতী-অসতী নির্মাণের গ্লাস সিলিংয়ে টোকা পড়ত না তাতে। বোঝা যেত না যে এই দুই মেরুকরণের মাঝের পার্থক্যটি কেবল এবং কেবলমাত্র শরীর নামক এক দাহ্য পদার্থের অর্থকরী ব্যবহারিক পার্থক্য বই কিচ্ছুটি নয়; ঊনসতীদের ভাষায়— “আমরাও মনের মধ্যে একজনকে ধরে রাকতে পারি, কিন্তু দেহটা তো পাঁচজন খায়, তাই নুংরা চোখেই সবাই দ্যাকে।” এই বই দু’টি তাই নামভূমিকাতেই যুগান্তকারী, যা আমাদেরই মতো ঊনজীবন বাঁচা এক শ্রেণির মানুষের জীবন-বিবৃতি।

ঊনসতীদের বেত্তান্ত

পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুমিতা বীথি

৬৫০.০০

লালবাতি অঞ্চলের শরীরী কেনাবেচার অংশটুকু বাদ দিলে এই বই দু’টির পাতায় পাতায় সন্ধান মেলে এমন এক জীবনের, যা আমাদের গড়পড়তা ‘সাধারণ’ জীবনের থেকে আলাদা নয় মোটেই। লক্ষ্মণরেখার এ পাশে বসবাসকারী তথাকথিত সভ্য সমাজে যেমন একটা সিস্টেম আছে, এখানেও সেই রকমই। সোনাগাছিতেও রোজ বাজার বসে, বিক্রিবাটা হয়, ক্রেতারা দরদাম করে জিনিস কেনে। এখানেও মনুষ্যচরিত্রের নিয়তি একে অপরকে ঠকায়, ডরায়, ধমকায়। এ-ওর ভাগ মেরে রাজা হয়, ‘ম্যাসকুলিন হেজিমনি’ চলে রমরমিয়ে।

লালবাতি অঞ্চলের উত্তরাধিকার হস্তান্তরও চলে স্বাভাবিক গতিতে। লক্ষ্মণরেখার এ পারে যেমন নেতার ছেলে মন্ত্রী হয়, ডাক্তারের ছেলে ডাক্তার; তেমনই আজ যে মহিলা সক্রিয় যৌনকর্মী, কাল তারাই মালকিন, মাসি, বাড়িওয়ালি— অন্য যৌনকর্মী কিনে এনে ব্যবসা চালান, ঘর ভাড়া দেন। এঁদের ছেলেদের বেশির ভাগই হয় দালাল, মেয়ে পাচারকারী বা বাবু, আর মেয়েরা নামে ‘ধান্দা’য়। সত্যি বলতে কী, তথাকথিত ‘ভদ্রসমাজ’ আর লালবাতি দুনিয়ার মধ্যেকার জীবনযাত্রার যে অদ্ভুত অন্ত্যমিল, যে আধুলিমাত্র কম সমাপতন, তা যে বস্তুত এক সোশিয়ো-পলিটিক্যাল নির্মাণ, তার সাক্ষ্যপ্রমাণ এই বই দু’টি।

সোনাগাছির সতী-ঊনসতী সন্ধান

সম্পা: পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রীজা চক্রবর্তী, সুমিতা বীথি

৭০০.০০

আবার এই আধুলি কম পার্থক্যের ভর যে কী মারাত্মক, তা উঠে আসে লালবাতি এলাকায় জন্মে ‘ধান্দা’য় নামা, বা ধান্দায় নামার জন্য লালবাতি এলাকায় জন্মানো সীমা সিংহের জবানবন্দিতে; তেরোতে বিয়ে হয়ে চোদ্দোতে মা হওয়া, মাঠে ‘গেহু’ কাটা জীবন কাটিয়ে ইমামবক্স লেনের চেন স্মোকার যৌনকর্মী হয়ে ওঠা অঞ্জনার অজানা গল্পে; কিংবা সোনাগাছিতে ঘর ভাড়া দেওয়া আর নিজেই নিজেকে ‘চলতা-ফিরতা মুসাফির’ আখ্যায়িত করে, বাপ-মা ফেলে চলে যাওয়া তিন-তিনটে শিশুকে স্নেহশিকড়ে আঁকড়ে বড় করা সাজেদা বেগমের জীবনযুদ্ধে, অথবা সেই কিশোরী বয়সে ‘রক্ত-রক্ত হয়ে যাওয়া’ বিছানায় সার্ভিস দেওয়ার পরেও বুক চিতিয়ে নিজের আসল নামপরিচয়ে আত্মকথন বর্ণনা করা চল্লিশ বছরের আলো-র সাক্ষাৎকারে।

ঊনসতীদের বেত্তান্ত এমনই সতেরো জন যৌনকর্মীর সৎ, নির্ভীক আর বেআব্রু আত্মকথনের সমন্বয়; আর সোনাগাছির সতী-ঊনসতী সন্ধান বইয়ে রয়েছে ষোলো জন ঊনসতী আর আট জন সতীর (যাঁরা বিয়ে হয়ে আসা-সহ নানা কারণে ওই অঞ্চলেই থাকেন কিন্তু যৌন পরিষেবা দেন না) কথা। লেখকদের ভাষ্যে, প্রথম বইটির মূল লক্ষ্য সতীত্বচর্চা আর দ্বিতীয়টির লক্ষ্য— সম্পর্ক। রক্তের সম্পর্ক, প্রতিবেশী-নৈকট্যের সম্পর্ক, শরীরের সম্পর্ক, মনের সম্পর্ক আর ভুলতে বসা মানবধর্মের সম্পর্ক। যা যতটা আমাদের আশপাশের যৌনকর্মীদের অজানা জীবনের দলিল, ততটাই তাদের সাপেক্ষে আমাদের ঊনমানবিক মূল্যবোধের দর্পণ।

আজকের এই ঊনসতী জীবনকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখার সুযোগ মেলে প্রাচীন চন্দননগরের বারাঙ্গনা ও নেশা কলোনির আশ্চর্য জগৎ বইয়ে। কলকাতার ‘বাবু কালচারড’ শহরের নেশা-বিলাসিতার মেহফিল টিকিয়ে রাখতে গড়ে ওঠা ফরাসডাঙা অঞ্চলের (আজকের চন্দননগর) বারাঙ্গনা জীবন, নেশার ইতিহাস ও উনিশ শতকের বাংলা নাটক, গান, সাহিত্য, লোকায়তে লিপিবদ্ধ বারাঙ্গনা জীবনের লিরিক্যাল ম্যানিফেস্টো এই বইটি ঔপনিবেশিক বাংলায় ইংরেজ দৃষ্টিভঙ্গিতে নির্মিত শ্লীল-অশ্লীলের চেনা ছককে কবিগানে প্রশ্ন করে, ‘অশ্লীলতা শব্দ মোরা আগে শুনি নাই’।

প্রাচীন চন্দননগরের বারাঙ্গনা ও নেশা কলোনির আশ্চর্য জগৎ

বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

৪৫০.০০

৯ঋকাল বুকস (সব ক’টি বই)

বারাঙ্গনা জীবনের এই শ্লীল-অশ্লীল, আইনি-বেআইনি বিষয়টিকে সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কারণেই এক প্রহেলিকাময় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আড়ালে রাখা হয়েছে; ঊনসতী বা বারাঙ্গনা জীবনের স্বীকৃতিকে ‘ভদ্রসমাজ’-এর ‘বৈধ’ প্রশ্ন হিসেবে উঠে আসতে দেওয়া হয়নি কোনও দিনই। দিলে হয়তো উত্তর পাওয়া যেত যে, বারাঙ্গনা পল্লির ক্রেতা যদি ভদ্রসমাজের হন, তা হলে বিক্রেতা নিষিদ্ধপল্লির হন কী করে? আর এই প্রশ্নটাই সম্ভাব্য উত্তরমালা সাজিয়ে আরও জোরদার হবে এই বইটি পড়ার পর, যেখানে দেখা যাবে যে ঔপনিবেশিক ফরাসডাঙার ‘ফ্রেঞ্চ সিস্টেম’ কী ভাবে সেই উনিশ শতকেই বারাঙ্গনা কেন্দ্রিক আইন চালু করেছিল, তাঁদের নাম রেজিস্টার করে নিয়মিত চিকিৎসার এবং উপযুক্ত সিভিক আইন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিরাপত্তার বিষয়টি সুনিশ্চিত করেছিল।

বিশ্লেষণধর্মী ও তথ্যনির্ভর পদ্ধতিতে চন্দননগরের বারাঙ্গনাদের ইতিহাস চর্চার মাধ্যমে সেকালের ফরাসডাঙার নেশা ও নেশা কলোনির গল্প শোনার; চৌদ্দ আইন, কলকাতা, চন্দননগর ও ঔপনিবেশিক প্রকৃতির আখ্যান তথা গোটা চন্দননগরের ইতিহাস জানার এই যে উদ্যোগ আলোচ্য বইটিতে প্রতিফলিত হয়েছে, তা বাংলা নন-ফিকশন গদ্য সাহিত্যের অতি উজ্জ্বল ধারায় এক বিশেষ স্থান দাবি করে।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
book review

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy