E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সব ছাপিয়ে জেগে থাকে মানবিক চেতনার কবিকণ্ঠ

কবিতা প্রকাশ থেকে কবি বিরতি নেবেন, এ সঙ্কলনে এমনটাই ধ্বনিত। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, প্রকাশে বিরতি, কিন্তু লেখায় নয়।

সেবন্তী ঘোষ

শেষ আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৫:১৯

তাঁর কবিতা নিয়ে কিছু লিখতে বসা, সমুদ্রে ডুব দেওয়ার মতো। যতটুকু দেখতে পাবেন, অধরা থেকে যাবে তার দশগুণ। একত্রে ষোলো জয় গোস্বামীর সাম্প্রতিকতম ষোলোটি কবিতাপুস্তিকার সঙ্কলন। ২০২২-এর মার্চ মাস থেকে ২০২৩-এর শেষ পর্যন্ত নয় মাসের সময়সীমায় এই পুস্তিকাগুলি লিখিত এবং প্রকাশিত। দগ্ধ, নিজের বিরুদ্ধে, কঙ্কাল, ঘাতক, র‍্যাগিং, ভয়, মণিপুর ইত্যাদি নামকরণে প্রত্যক্ষ ভাবে সামাজিক, রাষ্ট্রিক নিপীড়নের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তাঁর কবিতার প্রধান শক্তি ব্যক্তি মানুষের অভিজ্ঞতা, প্রেম, নিঃসঙ্গতা ও অস্তিত্ববোধ। তিনি সরাসরি রাজনৈতিক স্লোগানধর্মী কবিতা লেখেননি; বরং সমাজের অসাম্য, শোষণ, বঞ্চনা, সাম্প্রদায়িকতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে মানবিক প্রতিবাদকে কাব্যের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন। ফলে নির্দিষ্ট ঘটনার তীক্ষ্ণতা সরিয়ে দিলেও কবিতা মূল্যের হানি হয় না। “কেউ আর ফিরেও দেখে না/ এ বৃহৎ গণতন্ত্রে আবর্জনা হয়ে পড়ে থাকে/ নারী সম্মানের ধ্বংসস্তূপ...” এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর রাজনৈতিক চেতনার মূল ভিত্তি।

কবিতা প্রকাশ থেকে কবি বিরতি নেবেন, এ সঙ্কলনে এমনটাই ধ্বনিত। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, প্রকাশে বিরতি, কিন্তু লেখায় নয়। কবি কলম নামিয়ে রাখছেন না মোটেই, শুধু কোন এক অভিমানে পাঠকের কাছে পৌঁছতে চান না, “লিখি দু-বেলাই দু-বেলাই.../ সযত্নে জমিয়ে রাখি খাতাগুলি/ বিধাতা পুরুষ এসে একদিন পড়বেন তাই,” এ বানপ্রস্থ তাই লেখা থেকে বিরতি নয়। যখন দেখি, “সন্ধ্যার সঙ্গে এ বানপ্রস্থেও লেখা নিয়ে... প্রত্যক্ষ সঙ্গমে লিপ্ত হই,” এ যেন দেহাতীতের সন্ন্যাস নয়, সংরাগময় জীবন্ত কবির ‘না ছাপা সংসার’।

যে শঙ্খ ঘোষের কথা তাঁর লেখায় ঘুরেফিরে আসে, তাঁর কবিতার মতোই আত্মসমালোচনার স্বর শুনতে পাই এখানে। ভয়ানক হাহাকারে মোড়া আর্তস্বর, “তোমার সাহিত্য পুরস্কার/ বারবার সাহিত্য পুরস্কার/ তিন-তিনটি ডি. লিট সম্মান/ দেখো সব ভেসে চলে যায়/ সরকার প্রেরিত বাহিনীর/ হাতে মৃত উদ্বাস্ত দলের/ অবিরল রক্তের ধারায়/ অবিরল রক্তের ধারায়...” বিশেষ কোনও ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে লেখা হলেও এই পঙ্‌ক্তিগুলি চিরকালীন প্রতিবাদ হয়ে ওঠে না কি?

সঙ্কলনের ভূমিকাগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বলা যেতে পারে কবিতাগুলির ধরতাই। কালানুক্রমে প্রথম ‘দগ্ধ’ শীর্ষক অংশে, বীরভূমের বগটুই-এর হত্যাকাণ্ডের কথা উঠে এসেছে। “ওরা গোষ্ঠীদ্বন্দের শিকার?/ কার গোষ্ঠী? কার গোষ্ঠী কার?/ ওই পাঁচজন মহিলার/ শক্ত কালো দেহ জানাবে কি ওদের ওপর/ কীভাবে সক্রিয় ছিল কোন বিশেষ গোষ্ঠী অধিকার?” ‘নিজের বিরুদ্ধে’ পুস্তিকায় সেই রামপুরহাট সংলগ্ন গ্রামে জ্বলন্ত বাড়িতে বন্ধ করে পুড়িয়ে মারার ঘটনাটি আবার ফিরে আসে। ভূমিকায় কবি উল্লেখ করছেন গণহত্যার বিশেষত্ব। কখনও তা বিরোধী হত্যা, কখনও পুলিশ দ্বারা, কখনও ‘ক্ষমতার দখল নিয়ে গোষ্ঠীর মধ্যে হত্যা বিনিময়’। এই অবধি সচেতন নাগরিকের দৃষ্টি কিন্তু তার পরেই কবির চোখ দেখতে পাই। গণহত্যার অন্তত চারটি সংঘটিত হয় বসন্ত ঋতু চলাকালীন। “অর্থাৎ যখন দোলযাত্রা। যখন আবির। যখন পলাশ। রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে যখন বসন্ত উৎসব— তখন”। বলা বাহুল্য, এই ভূমিকার পর কবিতার অভিঘাত কী ভাবে আসতে চলেছে, পাঠক বুঝে নিতে পারবেন।

বাংলা কবিতার গীতি-উৎসকে সঙ্গে নিয়ে চলেছেন চির সঙ্গীত সন্ধানী জয়। ‘ঘাতক’ শীর্ষক কাব্যপুস্তিকায় ভূমিকায় ছন্দের বিন্যাস বিষয়ে শুধু ধ্বনি নয়, বক্তব্য কী ভাবে ওতপ্রোত জড়িত, দেখিয়ে দিচ্ছেন তিনি। “পুস্তিকার শেষ কবিতায় গান্ধিজী শব্দটির ব্যবহারে ছন্দ একমাত্রা কম রয়েছে, সর্বত্রই”— কবির সচেতন এই প্রয়াসে অগ্রজ ছান্দসিক কবিদের উল্লেখ করছেন। “অক্ষরবৃত্ত ছন্দে এমন সূক্ষ্ম কারুকৌশলের প্রয়োগ প্রথম সূচিত হয় সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের হাতেই। দুই যুগের দুই কিংবদন্তি কবি ও কবিতা-আলোচক, বুদ্ধদেব বসু ও শঙ্খ ঘোষ, এইভাবে লাইনের শেষ শব্দে একমাত্রা কম রেখেও ছন্দপতন আটকানোর বিষয়টিকে সপ্রশংস ভাবে উল্লেখ করেছেন তাঁদের সুভাষ সম্পর্কিত আলোচনায়।”

একত্রে ষোলো: সাম্প্রতিক কবিতা পুস্তিকাসমূহ

জয় গোস্বামী, সঙ্কলক: অভিরূপ মুখোপাধ্যায়, তুষার বিশ্বাস

৮০০.০০

ঋত

কিন্তু কেন তিনি ইচ্ছা করে ‘গান্ধিজী’ লেখার ক্ষেত্রে একমাত্রা কম রেখেছেন? “ইচ্ছে করেই পরিপূর্ণ মাত্রা মূল্য রাখিনি ‘গান্ধিজী’ শব্দের প্রয়োগে। যে মাত্রাটি এল না ছন্দের ক্ষেত্রে, বা বলা যায় শূন্য রয়ে গেল যে-মাত্রাটি... গান্ধিজীর আদর্শ সে রকমই শূন্য হয়ে গেছে আজকের ভারতবর্ষে।” কবির কলমে যে কোনও ব্যক্তিগত অনুভূতি, সমষ্টির অনুভবে সঞ্চারিত হয়ে যায়। যেমন ‘ঔরস’ কবিতাবইয়ের ভূমিকায় লিখছেন, “একটি অপমান ঘটে, ফোনে... তার আগেই এক অতি নিকটজনের অপমান সংবাদ পাই। সেদিন, দুটি ক্ষেত্রেই, সম্পূর্ণ নিরুত্তর থাকি— তারপর সারারাত নির্ঘুম।” এই ব্যক্তিগত অপমানের উত্তরে আমরা যে কবিতা পেয়ে যাই তা আর কবির পরিমণ্ডলে বদ্ধ থাকে না। “আমি ধরতে থাকি সে মাল্যের দোষ ত্রুটি, খুঁত-শেষে দেখি তোমারই গলায় মাল্য হয় আমার বিদ্যুৎ...”

‘দৈব’-র ভূমিকা লিখেছেন সঙ্কলক অভিরূপ মুখোপাধ্যায়। সম্পর্কজাত যোগাযোগে অন্যান্য কবিতাপুস্তিকাগুলি থেকে এর অভিমুখ ভিন্ন। দৈব লেখার সময় জয় যে আট লাইনের কবিতা গঠন খুঁজে নিয়েছিলেন, তার ব্যাখ্যা রেখেছেন সঙ্কলক। সেই দুরন্ত প্রেমের কবি জয়কে পাওয়া যায় এখানে। “যৌবন কী জিনিস! তার উদয় ভানু খেলা/বুঝতে গিয়ে তলিয়ে গেল গভীর জলাশয়ে...” ‘কঙ্কাল’ পুস্তিকার ভূমিকায় লিখছেন, গুজরাতে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের কথা ওঠার পর সেই রাত্রে কতগুলি কবিতা লেখা শুরু হল। “দাঙ্গা থেমে গেছে। রাত্রি হল।/ জ্যোৎস্না ফুটেছে।/... ভাঙা দরগার ধ্বংসস্তূপে/ একা বসে আছেন নিশ্চুপে একজন পীরবাবা, পীর।” এর পরে কবিতা-পাঠকের চুপ করে থাকা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। ‘শান্তি’-র ভূমিকায় জানাচ্ছেন, প্রতিটি লাইনেই ছন্দের শেষ পর্বটি দুই মাত্রায় রাখা। কেবল ষষ্ঠ লাইনে শেষ পর্বটি এক মাত্রার। “যে গহ্বর থেকে প্রবল মাধ্যাকর্ষের টানে আলোক বিন্দু পর্যন্ত বাইরে আসতে পারে না— সেই গহ্বরে পতন মুহূর্তে ছন্দও কি অটুট থাকতে পারে? তাই ওই পতনদশার দিকে উড়ন্ত অবস্থায় একতিল হলেও ছন্দচলনকে টলিয়ে দিয়েছে কবিতার বিষয় কেন্দ্র-ই।”

এই সঙ্কলনেই তিনি একটি ভূমিকায় জানাচ্ছেন, “এই আটষট্টি বছরে দাঁড়িয়ে মেনে নিচ্ছি; কবিতা কী করে লিখতে হয় আমি এখনও শিখিনি।” এ কথা বলছেন বটে, কিন্তু তরুণ কবি ও সাধারণ কবিতাপাঠক তাঁর কাছে অবিরল শিখে চলেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে জয় কবি হিসেবে সক্রিয়। পাঠক ও নবীন কবিউভয়ের উপরে তাঁর প্রভাব অভূতপূর্ব। তাই হয়তো তাঁর সামাজিক দায় অনেকটাই। সে কারণেই আমাদেরও তাঁর কাছে প্রত্যাশা থাকে। গোধরা থেকে বগটুই, যাদবপুরের ছাত্রের আত্মহত্যার প্রতি ঘৃণা ও ক্ষোভ থেকে উচ্চারিত কবিতায় আমরা নত হয়েছি। তাঁর জাদুকলমে আর জি করের নির্যাতিত ও নিহত মেয়েটির কথাও হয়তো এক দিন উঠে আসবে।


এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Joy Goswami Poem

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy