স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ যাঁর গানে মজেছিলেন, যাঁর সহজ কথায় বলা দেহমনের গূঢ়তত্ত্ব ও দর্শন দীর্ঘকাল ধরে চর্চার বিষয়, আজও যাঁর গান নিয়ে মানুষের অশেষ আগ্রহ, এই বইয়ে সেই লালনকে কিঞ্চিৎ ভিন্নরূপে উপস্থাপিত করতে প্রয়াসী হয়েছেন লেখক। আলোচনায় এসেছে লালনের জীবনবৃত্তান্ত-সহ অক্ষয়কুমার মৈত্র, সরলাদেবী, জলধর সেন, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ, প্রমুখ বিশিষ্ট লালন-চিন্তকের তথ্য। স্থান পেয়েছে বাউলতত্ত্ব, নদিয়া থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের সমকালীন সমাজচিত্র, কৃষক বিদ্রোহ এবং বাংলার নবজাগরণে লালনের সম্পৃক্ততা। এ ছাড়া রয়েছে জাতি-ধর্মের ঊর্ধ্বে লালনের মানবতাবাদী অনাড়ম্বর জীবনচর্যায় আকৃষ্ট হয়ে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে প্রথাগত শিক্ষারহিত অগণিত গ্রাম্য মানুষের অনুগমনে এক নতুন ভাবাবেগের জন্ম, রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক তিন শতাধিক লালনগীতি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ-সহ নানা তথ্যে সমৃদ্ধ এই বইটিতে ১৮৮৯ সালের ৫ মে শিলাইদহে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে ১১৫ বছর বয়সি লালনের সাক্ষাৎ এবং তাঁর স্বহস্তে অঙ্কিত লালনের একমাত্র ছবিটির প্রসঙ্গ এবং রবীন্দ্রনাথ-লালন মিলন-জল্পনার অসারতার তথ্যনিষ্ঠ বিবরণ। তবে লালনের অনুষঙ্গে কাঙাল হরিনাথের জীবন ও কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত আলোচনা, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়ে নিরীহ প্রজাদের নিগ্রহের অভিযোগ, শিলাইদহের জমিদারির ইতিহাস-সহ নানা প্রসঙ্গের আড়ম্বরে বইটির লালন-কেন্দ্রিকতা কিঞ্চিৎ অতিক্রান্ত।
লালন: এক নিঃসঙ্গ বিগ্রহ
বিধায়ক ভট্টাচার্য
২৫০.০০
সোনাই-তুলি
দুই-তিন প্রজন্ম আগের আদি উৎস বা ‘দেশ’ সংক্রান্ত আলোচনার গুরুত্ব কি কেবল স্মৃতি ও অতীত রোমন্থনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ? বিশ্বায়ন ও আধুনিক উন্নয়নের জোয়ারে হারিয়ে যাওয়া গ্রাম ও মফস্সলের সেই পুরনো জীবন নিয়ে পর্যালোচনার মধ্যেই আত্মপরিচয় খোঁজার এক গুরুত্বপূর্ণ সূত্র লুকিয়ে। এই প্রেক্ষাপটেই আলোচ্য বইটি স্থানীয় ইতিহাস ও আঞ্চলিক সংস্কৃতি-চর্চার আলোয় সেই বিলুপ্তপ্রায় সময়ের জীবন্ত আখ্যান। সঙ্কলিত ৩১টি নিবন্ধে পাওয়া যায় লেখকদের অতীত অভিজ্ঞতায় ডুব দিয়ে তুলে আনা বাঙালির উৎসব ও পার্বণের বহুমাত্রিক রূপ। সেখানে চৈত্রের গাজন আর দুর্গাপূজার স্মৃতির পাশাপাশি বড়দিন, ইদ, শবে বরাত কিংবা চাঁদের জন্মকথার মতো ধর্মীয় পার্বণের সঙ্গে জায়গা করে নিয়েছে ‘ধানের সাধ ভক্ষণ’-এর মতো কৃষিভিত্তিক সমাজের নানা লোকাচার। গাজীর গান, শিবের গান, ওলাবিবি, দক্ষিণ রায়ের মতো লৌকিক দেবতাদের কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গ্রামবাংলার লোকায়ত পার্বণের আখ্যানই সঙ্কলনের প্রাণ। ভৌগোলিক বিস্তারের নিরিখে রাঢ়বঙ্গের মকর পরব ও সিলেটের চা-বাগানের উৎসবপঞ্জির পাশাপাশি স্থান পেয়েছে সুদূর আমেরিকার প্রবাসজীবনের পুজো-পার্বণের খতিয়ানও। কালীপূজার সন্ধ্যায় কবরস্থানে জ্বালানো ‘দিয়ার প্রদীপ’, সিলেটের নৌকাপূজায় ওঝা নাচে সুফিয়ানা চালের উল্লেখ বাংলার অসাম্প্রদায়িক যাপনচিত্র ফুটিয়ে তোলে। অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে থাকা এই সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে, এই বইটি নিশ্চিতভাবেই সফল।
দেশের বাড়ির পালা পার্বণ ও পূজা
সম্পা: সুশীল সাহা
৪৭৫.০০
খড়ি
বাণীকুমার, বলতেই আম-বাঙালির মনে ভেসে ওঠে কলকাতা বেতার আর বিশেষত মহালয়ার ভোরে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ অনুষ্ঠানের কথা— যে সঙ্গীত-স্তোত্র-আলেখ্যের রচয়িতা ছিলেন তিনি। বাঙালির স্মৃতিতে তিনি বাণীকুমার হয়েই রয়ে গেছেন, আসল নামটি— বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য— চলে গেছে অন্তরালে। বেতারসূত্রে যিনি ছিলেন আজকের ভাষায় ‘সেলেব্রিটি’, তাঁরও জীবন, কর্ম ও যাপনের নানা দিক থাকে লুকিয়ে, প্রচারের আড়ালে, একটি পূর্ণাঙ্গ বই-ই পারে সেই সব দিক-আঙ্গিক তুলে ধরতে। এই বইটিকে হয়তো পূর্ণাঙ্গ বলা যাবে না, কিন্তু পেশাদার ও ঘরোয়া বাণীকুমার, কলকাতার বেতার-দুনিয়ার অবিসংবাদিত পুরোধা, ভারতবর্ষ বসুমতী ভারতী-র মতো পত্রিকার নিয়মিত লেখক বাণীকুমারকে চিনতে সাহায্য করবে অনেকটাই; পরিচয় করিয়ে দেবে কলকাতা তথা বাংলার সেই সময়ের সংস্কৃতি-পরিবেশটির সঙ্গেও। তুহিন শুভ্র ভট্টাচার্য বাণীকুমারের জীবনকথা গড়েছেন সহজ ভাষায়, নানাজনের স্মৃতি-তথ্য সহায় হয়েছে জরুরি সে-কাজে।
বেতারের বাণীকুমার
তুহিন শুভ্র ভট্টাচার্য
২০০.০০
পত্রলেখা