E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

খোপমুক্ত পাঠকের ব্যক্তিগত বিশ্ব

এই মুক্ত পাঠেই রবিশংকর বিশেষ। যে পাঠ নতুন করে ভাবাতে চায়। প্রথাগত অ্যাকাডেমিক সাহিত্যচর্চার সমান্তরাল এই চর্চা একদা বাঙালির ছিল। এখন লুপ্তপ্রায়। লুপ্তপ্রায় সাহিত্যবোধের ছাঁচ-ভাঙা-মূর্তিগুলিও।

আশিস পাঠক

শেষ আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৪:৫৭

দোজখনামা-ই তাঁকে বাংলা সাহিত্যে স্মরণীয় করে রেখেছে। যে রবিশংকর সেই উপন্যাসটি লিখেছেন, তাঁর ‘আমি’ সম্প্রসারিত হয়ে আছে তাঁর ছড়ানো-ছিটানো অনেক গদ্যে। সে অর্থে সেই সব গদ্য তাঁর আর এক রকম আত্মজীবন।

সে সব লেখা প্রকাশিত হয়েছিল খবরের কাগজে আর লিটল ম্যাগাজ়িনে। সাধারণত হারিয়ে যাওয়াই তার নিয়তি হয়। এ ক্ষেত্রে হয়নি যে তারই প্রমাণ এই দু’খণ্ডের গদ্যসংগ্রহ। লেখাগুলো ফিরে পড়তে পড়তে মনে হয়, প্রায় এক দশক আগে প্রয়াত এই লেখক যত না লেখক, তার চেয়ে বেশি পাঠক। এবং, বৃহৎ বাঙালি পাঠক। ইতালো কালভিনো পড়েন তিনি। কোনও খোপে না ফেলে পড়েন। লেখেন, “ইউরোপ-আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের পণ্ডিতরা এঁদের লেখার শরীরে ‘পোস্ট-মডার্ন’ বা ‘উত্তর-আধুনিক’ ছাপ্পা মেরে দিয়েছেন।… কোনও লেখকই অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের এইসব তকমাকে কেয়ার করেন না। কালভিনো বিশ্বাস করতেন, লেখকের জীবন ও ব্যক্তিত্বকে তাঁর লেখার মধ্যেই খুঁজতে হয়। তাঁর জীবনকাহিনিতে লেখককে পাওয়া যায় না। কেননা লেখকের জীবনকাহিনি ও লেখার মধ্যে থাকে সংযোগহীন এক অতল খাদ।” (কালভিনো-গ্যালাক্সি)

এই মুক্ত পাঠেই রবিশংকর বিশেষ। যে পাঠ নতুন করে ভাবাতে চায়। প্রথাগত অ্যাকাডেমিক সাহিত্যচর্চার সমান্তরাল এই চর্চা একদা বাঙালির ছিল। এখন লুপ্তপ্রায়। লুপ্তপ্রায় সাহিত্যবোধের ছাঁচ-ভাঙা-মূর্তিগুলিও। নিজের লেখায় যেমন, তেমনই নিজের পড়াতেও বার বার ছাঁচ ভাঙতে চেয়েছিলেন রবিশংকর। অবলীলায় লিখতে পেরেছিলেন, “চমক-প্রধান গল্পের এই ছকটাকে জিইয়ে রাখে আমাদের এখানকার খবর-কাগজ-পত্রিকা-কেন্দ্রিক সাহিত্যের বাজার।… আর সাহিত্যের বাজারে নিজের নাম ধরে রাখার জন্য যেহেতু রবিবার/সাপ্তাহিক/পাক্ষিকে বছরে অন্তত ছ’টা গল্প লিখতেই হয় এবং পুজোর সাহিত্যে অন্তত গোটা দশেক, অতএব চেনা মডেল অনুসরণে লিখে যাওয়া ছাড়া গল্প লেখকের ভাবনার আর অবকাশই বা কোথায়? তার ওপর সম্প্রতি টেলিফিল্ম বা সিরিয়ালের হাতছানি।… আমার তো প্রথমেই মনে পড়ছে গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের কথা। ইনি ব্রাত্য নন, বাণিজ্যিকভাবে সফল লেখক বলতে যা বোঝায়, তাই-ই। অথচ মার্কেস তাঁর ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউড’ উপন্যাসটি সিনেমা করতে দিলেন না। প্রত্যাখ্যান করলেন হলিউডের বিশাল টাকার অঙ্ক। কারণ মার্কেস জানেন, তাঁর উপন্যাসটি সাহিত্য হিসেবে যা, সিনেমা কখনও তাকে ছুঁতে পারবে না। কোনও বা. লে. বিলোচন (বা. লে. অর্থে বাঙালি লেখক, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের সংক্ষেপণ) এই গাটস্ দেখাতে পারবেন কি?” (প্লট ভাঙো, গল্প লেখো)

সাহিত্য নিয়ে লেখালিখির চেনা প্লটকে ভেঙেছেন রবিশংকর। লেখক হিসেবে যেমন, পাঠক হিসেবেও তিনি নিরন্তর ভবঘুরে। সেই খোপমুক্ত পাঠকের ব্যক্তিগত ডায়েরি যেন তাঁর লেখা, যেখানে বিশ্বসাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস এবং নিজেকে খোঁজা একাকার। সমকালের খবরের চেয়েও বেশি খবরের ভিতরের খবর— মানুষের অস্তিত্বের সঙ্কট, নিঃসঙ্গতার হাহাকার নিয়ে বেঁচে আছে তাঁর গদ্য।

গদ্যসংগ্রহ ১, ২

রবিশংকর বল

১২০০.০০ (দু’খণ্ড একত্রে)

দে’জ়

যে গদ্য অনেক বাঙালি পাঠককে নতুন করে চিনিয়েছে সাদাত হাসান মান্টো, মির্জা গালিব, হোর্হে লুইস বোর্হেস, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বা ওরহান পামুককে। অ্যাকাডেমিক সাহিত্য-সমালোচনার প্রথা ও নিয়মকে তুচ্ছ করে তিনি যখন মান্টোকে নিয়ে লেখেন, তখন দেশভাগের যন্ত্রণা আর লাহোরের ধুলোমাখা রাস্তা যেন তাঁর গদ্যের যুক্তিতে নতুন বাঁচার আশা পায়। গালিব তাঁর কাছে আসেন শুধু শায়েরির অর্থ নিয়ে নয়, ঊনবিংশ শতাব্দীর দিল্লির এক বিষণ্ণ কবির আত্মা নিয়ে। লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতা বা ফারসি সাহিত্যের সুফিবাদের মতো বিষয় নিয়ে পাঠকের সঙ্গে তাঁর আলাপ প্রবন্ধের তরফ ছেড়ে বেড়াতে নিয়ে যায় সাহিত্যের বিশ্বভুবনে।

তাঁর গদ্যে ফিরে ফিরে আসে বিস্মৃত ইতিহাস। শহরের পুরনো ইমারত, ধুলোপড়া বইয়ের দোকান, হারিয়ে যাওয়া গান বা ধ্রুপদী সঙ্গীত— সব কিছু নিয়েই তাঁর গদ্য জানান দেয় যে রবিশংকর কেবল মূল স্রোতের ইতিহাসে সন্তুষ্ট নন। তাঁর খোঁজ সেই ইতিহাসে, যা রয়ে গিয়েছে মার্জিন বা ফুটনোটে। পড়ুয়ার চলার পথের এই সব ফুটনোট যদি সমগ্রে কোনও ছবি তৈরি করে তবে রবিশংকরের উপন্যাস-গল্প সেই ছবির উপর ছবি। যেন সেই প্রাচীন কালের প্যালিম্পসেস্ট, নতুন ছবির স্তরের আড়ালে পুরনো ছবির পরত।

এই নানা স্তরের স্মৃতি থাকে বলেই এক ধরনের মৃদু বিষণ্ণতাও ঘিরে থাকে লেখাগুলিকে। ১৯৮০ থেকে ২০১৭— এই সাঁইত্রিশ বছরের লেখক-জীবনে পঁচিশটা উপন্যাস, একশোর বেশি গল্প আর নানা গদ্য লিখে গিয়েছেন তিনি। গল্প-উপন্যাস ছাড়া বাকি গদ্যগুলির দেড়শোটির মতো এই চার মলাটে ধরা আছে। লেখার কোনও সংরূপে বিশ্বাস করতেন না রবিশংকর, তবে এ বইয়ের সম্পাদক (কোনও ঘোষিত সম্পাদক নেই এই সংগ্রহের, তবে ভূমিকার মতো লেখাটির স্বাক্ষর পড়ে মনে হয় সীমা বল এর সম্পাদক) লেখাগুলিকে কয়েকটি গুচ্ছে ভাগ করেছেন। প্রথম খণ্ডের প্রথম গুচ্ছের নাম ‘বাংলা সাহিত্য’। পরেরটির নাম ‘জীবনানন্দ ও অন্যান্য’। তার পরে আবার ‘অন্যান্য রচনা’ নামে আর এক গুচ্ছ। এ ভাবে ভাগ করতে গিয়ে একটা অনর্থক কুয়াশা তৈরি হয়েছে। জীবনানন্দ বাংলা সাহিত্যের মধ্যে পড়ছেন না, আবার জীবনানন্দকে ঘিরে লেখাগুলিকেও আলাদা থাকে রাখা যাচ্ছে না, ঢুকে পড়ছে ‘অন্যান্য’। আসলে জীবনানন্দ ও অন্যান্য নামে রবিশংকরের একটি বই প্রকাশিত হয়েছিল। সে বইটিকে অক্ষত রেখে এই সংগ্রহে নিতে গিয়েই বিপত্তি। সে ক্ষেত্রে এই বই এবং অন্য প্রকাশিত বইগুলিও অক্ষত রেখে অগ্রন্থিত সব রচনাকে আলাদা করা উচিত ছিল বিষয়ভিত্তিক গুচ্ছ না করে।

সম্পাদকীয় নীতির এই দুর্বলতার এক ধরনের কৈফিয়তও রয়েছে ‘নিখুঁত শূন্যতার দিকে যাত্রা’ নামের সম্পাদকীয়-প্রতিম লেখাটিতে, “সংলাপের মধ্যবর্তী এই নীরবতা’য় লেখা আছে মাত্র দু’-একটি কথা— ‘কালানুক্রমিকভাবে লেখাগুলো সাজানো হয়নি। চেষ্টা ছিল একটা ভাবনার সুত্র তৈরি করা। কতদূর হয়েছে জানিনা। না-হলেও ক্ষতি নেই।’ এর থেকে হয়তো ধারণা করা যেতে পারে কেন তাঁর লেখায় তারিখ থাকত না। সময়ের চেয়ে বিষয়ভিত্তিক ভাবনায় বরাবর মন দিয়েছেন। এ কথাও সত্যি, তাঁর রচনা সময়ের হিসেব ধরে সাজাতে হলে অতিমাত্রায় অনুসন্ধানী আর পরিশ্রমী হতে হবে। একমাত্র কোনো গবেষক যদি এগিয়ে আসেন, তবেই...। তাই সবরকম অক্ষমতা মেনে নিয়ে এই গদ্যসংগ্রহ পাঠকের সামনে রাখা হল।”

এই অক্ষমতা আপাতত মেনে নেওয়া গেল। ভরসা করি, প্রকাশক এই বইয়ের পরবর্তী সংস্করণে যথার্থ সম্পাদনায় মন দেবেন। বঙ্গ-খোপ থেকে বেরিয়ে সাহিত্যের বিপুল ভুবনের যাত্রী হয়েছিলেন রবিশংকর বল। তাঁর গদ্যসংগ্রহের সম্পাদনাও বঙ্গীয় অক্ষমতার ছুতো থেকে বেরোবে নিশ্চয়ই।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
book review

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy