বীরসিংহ নামের এক অখ্যাত গ্রামে জন্ম নেওয়া দরিদ্র ব্রাহ্মণসন্তান ঈশ্বরচন্দ্রের ‘বিদ্যাসাগর’-এ উত্তরণের নেপথ্যে ভাগীরথীর পশ্চিম পাড়ের কয়েকশো ব্রাহ্মণ, বৈদ্য ও কায়স্থ গ্রাম নিয়ে গড়ে ওঠা ‘খানাকুল-কৃষ্ণনগর বিদ্যাসমাজ’-এর অবদান কী, তা-ই প্রতিপাদ্য বইটির। লেখক তাঁর মত প্রতিষ্ঠা করেছেন প্রত্ননিদর্শন, প্রাচীন পুঁথি, দলিল-দস্তাবেজ, প্রাজ্ঞবচন সহায়ে। পঞ্চদশ শতাব্দীতে কণাদ তর্কবাগীশের সময়ে প্রায় তিনশোটি ব্রাহ্মণ পরিবার নিয়ে এই বিদ্যাসমাজ আরম্ভ হলেও, পরে সপ্তদশ শতকে বাঁকুড়া মেদিনীপুর হুগলি ও অধুনা বর্ধমানের মানকর-মাড়ো-আউশগ্রামের প্রায় সাতশো গ্রাম এর অন্তর্ভুক্ত হয়। মূলত কনৌজ থেকে আনীত পঞ্চ বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ এবং পঞ্চ কায়স্থ পরিবারের বংশধররাই ব্যাকরণ, জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যোতিষ, রসায়ন, গণিত চর্চার ধারা অব্যাহত রেখেছিলেন। জ্ঞানচর্চার এই পরম্পরা বিদ্যাসাগরের সংস্কারমুক্ত চিন্তাধারা, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও পাণ্ডিত্য বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, বলতে চেয়েছেন লেখক। এসেছে রামমোহন ও শ্রীরামকৃষ্ণের প্রসঙ্গও, উভয়েরই ঈশ্বরচন্দ্রের মতো বিদ্যাসমাজভুক্ত ভৌগোলিক বৃত্তে আদিশূর আনীত বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম। স্ত্রীশিক্ষার প্রসার প্রসঙ্গে চণ্ডীচরণ তর্কালঙ্কারের বালবিধবা কন্যা দ্রবময়ীর কথা বলা হয়েছে, যিনি মাত্র চোদ্দো বছর বয়সে টোলে অধ্যাপনা শুরু করেন। সপ্তদশ শতকের শেষার্ধে আরামবাগ-ঘাটাল অঞ্চলে ম্যলেরিয়া-মহামারি-ডাকাতি ও দুর্ভিক্ষের সঙ্গে বর্ধমান জমিদারের শোষণের কারণে সম্পন্ন ব্রাহ্মণ ও বণিকরা এই অঞ্চল পরিত্যাগ করায় এই বিদ্যাসমাজে ভাটা পড়ে। তথ্যবাহুল্যের কারণে কিছু পুনরুক্তি এসেছে, তা বাদে জরুরি কাজ।
বিদ্যাসাগর ও খানাকুল-কৃষ্ণনগর বিদ্যাসমাজ
অরবিন্দ চট্টোপাধ্যায়
৩৫০.০০
সায়ন্তন পাবলিকেশন
বিদ্যাসাগরের সঙ্গে আলাপে খুশি হয়েছিলেন বর্ধমানের রাজা মহতাবচাঁদ। বিদায়ের সময় অতিথিকে পাঁচশো টাকা ও এক জোড়া শাল উপহার দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু বিদ্যাসাগর বলেন, তিনি কারও দান গ্রহণ করেন না, সরকারি বেতনেই তাঁর স্বচ্ছন্দে চলে যায়। মহতাবচাঁদ কিন্তু এই প্রত্যাখ্যান উদার ভাবে মেনে নেন। এর পরে তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক গড়ে ওঠে, বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ আন্দোলনের অন্যতম বড় সমর্থক হয়ে ওঠেন বর্ধমানরাজ। আলোচ্য বইটি শুধু এক জমিদারের জীবনী নয়, তৎকালীন বাংলার সমাজ-সংস্কৃতির নির্ভরযোগ্য দলিলও। বাংলার সংস্কৃতিতে রাজা-জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতার ধারায় উজ্জ্বল উদাহরণ মহতাবচাঁদ বাহাদুর, জন্মসূত্রে অবাঙালি হলেও মনেপ্রাণে ছিলেন বাঙালি। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কালীপ্রসন্ন সিংহের মতো বিদগ্ধজনের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ও সাহিত্যচর্চা তাঁকে সমকালের অন্য জমিদারদের থেকে আলাদা করেছিল। রামায়ণ-মহাভারতের গদ্যানুবাদ, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তাঁর অবদান সবিশেষ। সংগীতরত্নমালা ও সংগীতসূত্ৰাকর-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বই সঙ্কলন করেন তিনি, বাংলা হরফ ও লিপি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও। তাঁর মৌলিক কৃতিত্ব ‘মহতাবলিপি’ তৈরি ও সেই লিপিতে বর্ণপরিচয় লেখার প্রচেষ্টা। সে কালের পত্রপত্রিকার খবর ব্যবহারে বইটি ঐতিহাসিক তথ্যের নিরিখে নির্ভরযোগ্য হয়েছে। রাজসভা থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন গ্রন্থের প্রচ্ছদ ও নামপত্রের ছবিগুলি বাড়তি পাওনা।
বর্দ্ধমানরাজ মহতাবচাঁদ বাহাদুর
অরুণ কুমার সাঁফুই
৭৫০.০০
পত্রলেখা
পাউল সেলান বলতেই মনে পড়ে হলোকস্ট-কবিতা ‘টোডেসফুগে’ (মৃত্যুগীত)-এর কথা। জার্মান ভাষার কবি তিনি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জার্মানি ও ইউরোপের স্বতন্ত্র কবিকণ্ঠ, যে স্বরে মিলেমিশে যায় ব্যক্তিগত শোক আর সমষ্টির বিক্ষত অতীত। তাঁর কবিতা যত না নান্দনিক অভিজ্ঞতা, তারও বেশি— ইতিহাস স্মৃতি ও মানবিক বিপর্যয়ের গভীর এক পাঠ। বাংলা অনুবাদে পাউল সেলান-এর বাছাই কবিতার সঞ্চয়ন এই বইটির ভূমিকায় এক টানে কবিতার অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা নয়, বরং বহু পাঠে পরশপাথর খোঁজার যাত্রায় এগিয়ে দিতে চেয়েছেন সুব্রত সাহা। সেলানের কবিতায় বিশেষ কিছু শব্দের উৎস ও অনুষঙ্গ সম্পর্কে পূর্বধারণা থাকা জরুরি, বইয়ের শেষে টীকাগুলি তাতে সহায়ক হবে। দীর্ঘ অথচ প্রাঞ্জল সূচনাকথাটি নতুন পাঠকের কাছে বিশ শতকের এই গুরুত্বপূর্ণ কবির চমৎকার উপক্রমণিকা। বাকি রইল কবিতাগুলি, পাঠকের নিবিড় সঙ্গ প্রার্থনা করে তা। আরও তিন খণ্ড অনুবাদ-কবিতা বেরোনোর অপেক্ষায়, জানা গেল— সেও আগাম সুসংবাদ।
নির্বাচিত কবিতা, প্রথম খণ্ডপাউল সেলান,
অনু: সুব্রত সাহা
৩০০.০০
গান্ধার