E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সমন্বয়ের অম্লান আদর্শ

ব্রহ্মচর্যে দীক্ষা দিয়ে গুরু নাম দেন নিবেদিতা। আয়ারল্যান্ডের কন্যা পাশ্চাত্যশিক্ষার সঙ্গে প্রাচ্যের দীক্ষা মিলিয়ে ভারতবর্ষের ভগিনী হয়ে উঠলেন। পথটি সহজ ছিল না। ত্যাগ ও দারিদ্রের জীবন বেছে নেওয়াই শুধু নয়, এই নবপরিচিত সমাজের ধ্যানধারণার মর্যাদা রক্ষা করতেও সচেতন থাকতেন তিনি।

চিরন্তন কুন্ডু

শেষ আপডেট: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ০৬:২৫

বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা-র ভূমিকায় স্বামীজির জীবনকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের, অতীত ও ভবিষ্যতের মিলনকেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন তিনি। লিখেছিলেন, আধ্যাত্মিক ও লৌকিকের ভেদ আর রইল না; পরিশ্রম করাই এখন প্রার্থনা করা, জয় করাই ত্যাগ করা, সমগ্র জীবনই ধর্মকার্য। ভগিনী নিবেদিতার জীবনেও সমন্বয়ের সেই আদর্শ অম্লান।

ব্রহ্মচর্যে দীক্ষা দিয়ে গুরু নাম দেন নিবেদিতা। আয়ারল্যান্ডের কন্যা পাশ্চাত্যশিক্ষার সঙ্গে প্রাচ্যের দীক্ষা মিলিয়ে ভারতবর্ষের ভগিনী হয়ে উঠলেন। পথটি সহজ ছিল না। ত্যাগ ও দারিদ্রের জীবন বেছে নেওয়াই শুধু নয়, এই নবপরিচিত সমাজের ধ্যানধারণার মর্যাদা রক্ষা করতেও সচেতন থাকতেন তিনি। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ইস্কুলে ইতিহাস, ভূগোল, আঁকাআঁকির পাশাপাশি নিজে দেখিয়ে ড্রিল ও ব্যায়াম শেখাতেন। স্কুলের প্রথম সরস্বতীপুজো তিনিই করিয়েছিলেন। হিন্দু বিধবা ছাত্রীদের খাওয়াদাওয়ার সংস্কারে যাতে আঘাত না লাগে, তাই দেবীর কাছে ফল ও মিষ্টি নিবেদন করা হয়। সেই প্রসাদ ছাত্রীরা আঁচলে করে বাড়ি নিয়ে যায়, স্কুলে দাঁড়িয়ে খাওয়ার সাহস হয়নি। কিন্তু তাঁর প্রাণের টানে এই সব সংস্কারের গণ্ডি ছাত্রীরা নিজেরাই পেরিয়ে গিয়েছিল। পরের বার পুজোয় স্কুলেই লুচি তরকারি প্রভৃতি রান্না করা হলে পূজা শেষে ছাত্রীদের আগ্রহে তিনি দোতলা থেকে একতলায় নেমে এক সঙ্গে বসে প্রসাদ গ্রহণ করেন, সকলের কাছে তা আনন্দের অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। সমাজের প্রতি অভিযোগ নয়, বিক্ষোভের কালাপাহাড়ি পথ নয়, ভালবাসার মধ্য দিয়েই ঐতিহ্য ও আধুনিক চিন্তার মিলনবিন্দু হয়ে উঠেছেন তিনি। আবার দি ওয়েব অব ইন্ডিয়ান লাইফ বইয়ে পাশ্চাত্যে প্রাচ্যের পরিচয় তুলে ধরেছেন, যাতে মনগড়া ধারণায় আটকে না থেকে পশ্চিমের মানুষ ভারতকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে শেখে। দুই সভ্যতার মধ্যে সেতুবন্ধনের চেষ্টা করেছেন আজীবন।

হিন্দু ভাবধারার সঙ্গে ব্রাহ্মসমাজের সম্পর্কও সহজ করতে চেয়েছেন তিনি। ঠাকুরবাড়ি, জগদীশচন্দ্রের পরিবারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। তাঁর উদ্যোগেই রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দকে নিয়ে চায়ের আসর বসেছে। স্বামীজির প্রয়াণের পরবর্তী কালে রবীন্দ্রনাথ, জগদীশচন্দ্র, স্বামী সদানন্দ প্রমুখের সঙ্গে তাঁর বুদ্ধগয়া ভ্রমণ। বুদ্ধগয়া তখন শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধ নেতা ধর্মপালের দাবির জেরে হিন্দু-বৌদ্ধ বিরোধের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। কার্জন হিন্দু মোহান্তের হাত থেকে নিয়ন্ত্রণ সরিয়ে বুদ্ধগয়ার পরিচালনা সরকারের আয়ত্তে আনতে চাইছিলেন। বিভিন্ন দেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ও এতে জড়িয়ে পড়ে। নিবেদিতা বুদ্ধগয়ায় মোহান্তের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর লেখায় ও বক্তৃতায় তিনি হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিদ্বন্দ্বিতার বদলে তাদের গভীর সংযোগের কথা প্রতিষ্ঠা করেন, বুদ্ধগয়াকে সব ধর্মের মানুষের পুণ্যক্ষেত্র বলে অভিহিত করেন। এখানেও তিনি সমন্বয়ের পথেই হেঁটেছিলেন।

জোসেফিন ম্যাকলাউড স্বামীজিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “স্বামীজি, কী ভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?” স্বামীজি উত্তর দিয়েছিলেন, “ভারতবর্ষকে ভালবাসো।” গুরুর আরাধ্য ভারতের সেবায় নিবেদিতা তাঁর জীবন দিয়ে গেছেন। ভারতের জাতীয় আন্দোলনকে সমৃদ্ধ করেছিলেন তিনি। তাঁর রবিবারের প্রাতরাশের আসরে ডন সোসাইটি-র ছাত্ররা, কংগ্রেসের সদস্যরা, বরোদা ও কলকাতার মধ্যে যোগাযোগ রাখা অরবিন্দের দলের কর্মীরা (বারীন্দ্র সমেত), সাহিত্যিক সাংবাদিক সকলেই নিজেদের ফারাক ভুলে জাতীয়তাবাদের ভাব নিয়ে ফিরে যেতেন। স্বামীজি নিবেদিতাকে শিখিয়েছিলেন, “সকলের ভাবনায় কোথায় ঐক্য আছে সেইটি বুঝে নিয়ে একেবারে বিভিন্ন চরিত্রের বহু লোককে সঙ্ঘবদ্ধ করতে পারাই হল খাঁটি নেতৃত্বের পরীক্ষা।” বিভিন্ন ধারার কর্মীদের সমন্বয়ে নিবেদিতা সেই পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হন।

ধর্ম ও বিজ্ঞানকে দুই বিপরীতমুখী বিষয় বলে ভাবতেন না তিনি। লিখেছিলেন, সনাতন ধর্ম জ্ঞানার্জনের সব রকম সৎ প্রচেষ্টাকেই সমর্থন করে, সমস্ত জ্ঞানই তার কাছে পবিত্র। ব্রুনো বা গ্যালিলিয়োর আবাস যদি ভারতে হত, তবে তাঁদের নির্যাতনের শিকার হতে হত না। নিবেদিতার সঙ্গে বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্রের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। জগদীশচন্দ্র যখন ব্রিটিশ প্রশাসনের বৈষম্যের শিকার, নিবেদিতা তাঁর পাশে দাঁড়ান। বেতন-বৈষম্যের পাশাপাশি সরকার জগদীশচন্দ্রকে উপযুক্ত গবেষণাগার ও তহবিল দিতে অস্বীকার করার পর নিবেদিতা নিজের পরিচিত ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সাহায্যে জগদীশচন্দ্রের জন্য তহবিল গড়ে তোলেন। তাঁর গবেষণাপত্রের সম্পাদনা ও পরিমার্জনে নিবেদিতার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। নিজে বিজ্ঞানী না হলেও জগদীশচন্দ্রের বিজ্ঞানসাধনায় তাঁর অপরিসীম প্রেরণা ছিল। ধর্ম ও বিজ্ঞানের চলাচলের মধ্যে তিনি দেওয়াল তোলেননি। এই যোগাযোগের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বসু বিজ্ঞান মন্দিরের ভিত্তিস্থলের নীচে নিবেদিতার চিতাভস্ম একটি ছোট বাক্সে রাখা হয়। এ ছাড়াও প্রবেশপথের কাছে আছে খোদাইচিত্র, পতাকায় নিবেদিতার প্রিয় বজ্রচিহ্ন। ‘বিজ্ঞান মন্দির’ শব্দবন্ধটিও ধর্ম ও বিজ্ঞানের ঐক্যের কথা বলে।

গুরুর মতোই বহু বৈচিত্রের মধ্যে মিলনের বার্তাবাহক ছিলেন নিবেদিতা। সংঘাতময় এই সময়ে তাঁর সমন্বয়ী চরিত্র আমাদের তা-ই শেখায়।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Sister Nivedita birth anniversary

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy