E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সর্বজনীনতার খোঁজে

জমিদারবাড়ির পূজা থেকে বারোয়ারি পূজা এবং পরিশেষে সর্বজনীন পূজার দিকে যাত্রাপথ আসলে দীর্ঘ এক গণতান্ত্রিকীকরণের প্রক্রিয়া বলা চলে।

সন্দীপন মিত্র

শেষ আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:১৩

ইউনেস্কো-র ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’-র তালিকায় দুর্গাপূজাকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ‘ডোসিয়ার’ তৈরির সময় সংস্কৃতিমন্ত্রক আমাদের বার বার বলেছিল, যাতে বিষয়টিকে ‘ভারতের দুর্গাপূজা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। আমরা যুক্তি দিই, ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ বিষয়ক ২০০৩-এর কনভেনশনে ভৌগোলিক নির্দিষ্টতা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাই বিষয়টিকে ‘কলকাতার দুর্গাপূজা’ বলে তুলে ধরাই যুক্তিযুক্ত হবে। শেষ পর্যন্ত মন্ত্রক তাতে সম্মত হয়। আমাদের এই অবস্থানের সপক্ষে আমরা উল্লেখ করেছিলাম, যদিও বর্তমানে দুর্গাপূজা বিশ্ব জুড়ে পালিত হয়, তবুও কলকাতাই এর ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দু; কারণ এখানেই দুর্গাপূজা সর্ববৃহৎ আকারে উদ্‌যাপিত হয় এবং এখানেই এটি সর্বসাধারণের উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে। ১৯২৬ সালে সিমলা ব্যায়াম সমিতি যখন তাদের প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করে, তখন ওই সমিতির প্রাণপুরুষ তথা স্বাধীনতা সংগ্রামী অতীন্দ্রনাথ বসু তাকে ‘সর্বজনীন’ আখ্যা দেন। উত্তর কলকাতার অন্য বারোয়ারি পূজাগুলোও শীঘ্রই এই পরিভাষা গ্রহণ করে, যেমন বাগবাজার সর্বজনীন, যেটি ১৯১৯ সালে নেবুবাগান বারোয়ারি হিসেবে যাত্রা শুরু করে। এই ঘটনাটি একটি প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে: ঠিক কেন এই সময়েই এই নতুন পরিভাষার উদ্ভব হয়েছিল? এ কি নিছক আকস্মিক ঘটনা, না কি অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে দুর্গাপূজার যে সামাজিক পরিবর্তন হচ্ছিল, তারই পরিণতি?

একটি মত অনুযায়ী, ৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে জগৎ মল্ল কর্তৃক সূচিত বিষ্ণুপুর রাজপরিবারের দুর্গাপূজাই বাংলার প্রাচীনতম দুর্গাপূজা। আর একটি মত অনুযায়ী, ১৫৮০ সালে তাহেরপুরের কংসনারায়ণ শরৎকালীন দুর্গাপূজার প্রবর্তন করেন। আবার অনেকের মতে, নদিয়ার কৃষ্ণচন্দ্র রায়ই শরৎকালীন দুর্গাপূজার রীতি জনপ্রিয় করে তোলেন। এই দাবিগুলোর ঐতিহাসিকতা নিয়ে বিতর্কে না জড়িয়ে যা অনেকটা নিশ্চিত ভাবে বলা যায় তা হল, মোগল সুবাদার ও পরবর্তী কালে আধা-স্বাধীন নবাবদের শাসন বাংলায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনে, যার ফলে জমিদারদের অবস্থারও উন্নতি ঘটে। এই জমিদাররা নিজেদের ক্ষমতা ও সম্পদের প্রকাশ হিসেবে নিজ নিজ বাসভবনে বার্ষিক দুর্গাপূজার আয়োজন শুরু করেন।

ঔপনিবেশিক শাসন এই আর্থ-সামাজিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনে। পুরনো রাজপরিবারগুলোর পতন ঘটে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এক নতুন জমিদার শ্রেণির জন্ম দেয়, যাঁদের অধিকাংশই কলকাতায় থাকতেন। পাশাপাশি কলকাতায় আর একটি অভিজাত গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে— বিত্তশালী বণিক সম্প্রদায়, যাঁরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সহায়তায় ব্যবসা করে বিপুল সম্পদের অধিকারী হন; কেউ কেউ এতটাই ধনী ছিলেন যে যুদ্ধের সময় কোম্পানিকেও ঋণ দিতেন। প্রাক্‌-ঔপনিবেশিক যুগের অভিজাতদের মতোই, এই দুই গোষ্ঠীও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিজ গৃহে জাঁকজমকপূর্ণ পূজার আয়োজন শুরু করে। এই পূজাগুলোতে ইউরোপীয়রাও যোগ দিতেন; তাঁদের কাছে এগুলো ছিল স্থানীয় সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণির সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ। যদিও সাধারণ মানুষকে গানবাজনা ও নৃত্য পরিবেশনা দেখার অনুমতি দেওয়া হত, তবু জমিদার ও বণিকদের বাসভবনে অনুষ্ঠিত দুর্গাপূজাকে প্রকৃত অর্থে সর্বসাধারণের উৎসব বলা যায় না, কারণ এগুলো মূলত ছিল সামন্ততান্ত্রিক অভিজাত শ্রেণির গৃহকেন্দ্রিক ব্যক্তিগত আয়োজন। এখান থেকেই পরবর্তী প্রশ্নটি ওঠে, ঠিক কোন সময়ে এবং কোন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার সর্বজনীন রূপটি গড়ে উঠল?

বারোয়ারি পূজার উৎপত্তি বিষয়ে সবচেয়ে প্রচলিত মতটি হুগলির গুপ্তিপাড়ার ঘটনার দিকে নির্দেশ করে, যেখানে বারো জন ব্রাহ্মণ বন্ধু স্থানীয় জমিদারবাড়ির দুর্গাপূজায় অংশগ্রহণের সুযোগ না পেয়ে ১৭৯০-এ নিজেদের উদ্যোগে পূজা শুরু করেন। ১৮২০-র মে মাসে দ্য ফ্রেন্ড অব ইন্ডিয়া সংবাদপত্রে এর উল্লেখ পাওয়া যায় এবং যেখানে পূজাটি হয়েছিল, সেই স্থানে এখন একটি ফলক বিদ্যমান। তবে ঊনবিংশ শতাব্দী জুড়ে বাংলায় বারোয়ারি পূজার বিস্তারের কারণ শুধু এই একটি ঘটনা হতে পারে না। আমার মতে, বারোয়ারি পূজার প্রথা আরও অনেক প্রাচীন। এর পক্ষে তিনটি যুক্তি রয়েছে। এক, কৃষ্ণনগরের বেশ কিছু বারোয়ারি জগদ্ধাত্রী পূজা গুপ্তিপাড়ার পূজারও আগের। দুই, চতুর্দশ শতাব্দী থেকেই পূজাপদ্ধতি-বিষয়ক অসংখ্য নির্দেশিকাগ্রন্থ রচিত হয়; দুর্গাপূজা শুধু রাজপরিবারের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকলে এগুলির প্রয়োজন হত না। তিন, বহুকাল ধরেই বাংলার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই একটি করে চণ্ডীমণ্ডপ থাকত, যার মালিকানা কোনও ব্যক্তি বা পরিবারের ছিল না; স্থানীয় বিদ্যালয় পরিচালনা ও বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ে আলোচনায় ব্যবহৃত হলেও এর মূল উদ্দেশ্য ছিল গ্রামে দেবী চণ্ডী বা দুর্গার বারোয়ারি পূজার আয়োজন। কোনও কোনও ইতিহাসবিদ আর একটি কারণ উল্লেখ করেন— ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠার পর পুরনো রাজপরিবারগুলোর পতন, ও পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ হওয়ায় গ্রামবাসীরা যৌথ উদ্যোগে পূজা আয়োজনে বাধ্য হন। এগুলো প্রমাণ করে, বারোয়ারি পূজার রীতি বহু আগে থেকেই গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। পূজার এই সর্বাঙ্গীণ প্রাণঢালা রূপটি প্রত্যক্ষ করে ইন্দিরাদেবীকে লেখা এক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জানান, ধর্মীয় কারণে হিন্দুদের থেকে সামাজিক ভাবে দূরে থাকা সত্ত্বেও পূজা যে সম্মিলিত আনন্দের সৃষ্টি করে, তা তাঁকে গভীর ভাবে স্পর্শ করে।

গ্রামের যৌথ উদ্যোগে পূজা আয়োজনের প্রথাটি শহরের জটিল পরিসরে আরও পরিবর্তিত হয়। বিশ শতকের প্রথমার্ধে বারোয়ারি পূজার জায়গা নেয় সর্বজনীন পূজা। এই রূপান্তরটি বুঝতে হলে যে স্থানে ঘটনাটি ঘটেছিল তার প্রকৃতি অনুধাবন প্রয়োজন। যদিও ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী দিল্লিতে স্থানান্তরিত হওয়ায় কলকাতা সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় নগরীর মর্যাদা হারায়, তবু ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ও এশিয়ার অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে শহরটি নিজের অবস্থান ধরে রেখেছিল। বাংলার রাজনীতিতে তখন চিত্তরঞ্জন দাশের মতো স্বরাজ্যপন্থী নেতার নেতৃত্বে এক ধরনের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় রাজনীতির বিকাশ ঘটছিল, যা কৃষক ও মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রেক্ষিতে জন্ম নিয়েছিল, এবং যার লক্ষ্য ছিল হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ও জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ। একই সময়ে শহরটি অর্থনৈতিক ভাবেও পরিবর্তিত হচ্ছিল। কলকাতা ও তার আশপাশে নতুন নতুন পাটকল ও কারখানা গড়ে ওঠায় বিপুল সংখ্যক মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আসতে শুরু করে, যারা অপরিচিত নগর-পরিবেশের মাঝেও পরিচিত ধর্মীয় জীবনের সন্ধান করত। এই রাজনৈতিক ও সামাজিক সমীকরণের পরিবর্তনই সর্বজনীন পূজার উত্থানের প্রেক্ষাপট রচনা করে। এক দিকে এটি যেমন গড়ে উঠতে থাকা জাতিসত্তার প্রতিচ্ছবি হিসেবে কাজ করেছিল, তেমনই বৈচিত্রময় গ্রামীণ অভিবাসীদের আকাঙ্ক্ষাও পূরণ করেছিল।

দুর্গাপূজার এই নতুন রূপটি তার আয়োজনের শৈলীতেই স্পষ্ট। সর্বজনীন পূজাগুলোর আয়োজক কমিটিতে জাতি, বর্ণ, শ্রেণি ও ধর্ম-নির্বিশেষে স্থানীয় বাসিন্দারা স্থান পেত। মণ্ডপ চত্বরে দেশীয় কারুশিল্প ও সমরকলা প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে তারা জাতীয়তাবাদী ভাবধারা প্রচার করত; যেমন, বাগবাজার সর্বজনীন। অনেকে প্রতিমার সাজসজ্জায় জাতীয়তাবাদী প্রতীক ব্যবহার করত; সিমলা ব্যায়াম সমিতিতে প্রতিমাকে খাদির কাপড় পরানো হত, হাতিবাগান সর্বজনীনে প্রতিমার চালচিত্রের জায়গায় ভারতের মানচিত্র স্থাপন করা হত। এ ধরনের পদক্ষেপ দুর্গাপূজাকে গণচেতনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে তোলে। স্বাধীনতার পর শহরটির রূপ আবারও বদলায়। কলকাতার পরিধি বৃদ্ধি পায়, বিশেষত দক্ষিণ দিকে, যেখানে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পেশাজীবীদের নতুন বসতি গড়ে ওঠে, আর সেগুলো পেরিয়ে পূর্ববঙ্গ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের কলোনি স্থাপিত হয়। ধীরে ধীরে দুর্গাপূজার কেন্দ্রবিন্দু উত্তর থেকে দক্ষিণ কলকাতায় সরে আসে। পাড়ার ক্লাব ও যুব সংগঠনগুলোর উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে পূজার আয়োজন অভিজাতদের পৃষ্ঠপোষকতার গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের চাঁদা ও সম্মিলিত শ্রমের ভিত্তিতে পরিচালিত হতে শুরু করে। নব্বই দশকের শেষ দিকে এই পূজাগুলো থেকেই থিম-ভিত্তিক পূজার প্রচলন হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিমাশিল্পী থেকে আয়োজক, পূজার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি আগে যাঁদের পূজায় অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হত না, পুজো সংগঠকদের পক্ষ থেকে তাঁদেরও অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নানা উদ্যোগ করা হচ্ছে এবং বছরভর বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রম আয়োজিত হচ্ছে।

জমিদারবাড়ির পূজা থেকে বারোয়ারি পূজা এবং পরিশেষে সর্বজনীন পূজার দিকে যাত্রাপথ আসলে দীর্ঘ এক গণতান্ত্রিকীকরণের প্রক্রিয়া বলা চলে। বারোয়ারি পূজা দুর্গাপূজাকে অভিজাত বাড়ির অন্দরমহল থেকে জনপরিসরে নিয়ে আসে। স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে, সর্বজনীনতার আদর্শ তাকে এক রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার রূপ দেয়। শুরুর দিকের সর্বজনীন পূজাগুলো যেমন দুর্গাপূজাকে জাতি বর্ণ শ্রেণি ও ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে এক সমতাভিত্তিক জাতিসত্তা কল্পনার ভিত্তিতে পরিণত করে, তেমনই স্বাধীনতা-উত্তর পর্বের সর্বজনীন পূজাগুলো দুর্গাপূজাকে স্থানীয় পাড়ার পরিসরে স্থাপন করে তাকে এক গণ-শিল্প উৎসবের রূপ দিয়েছে, যা তাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। তবে প্রকৃত অর্থে সর্বজনীন হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি আজও অসম্পূর্ণ। এক ভাবে দেখলে, জাতিগঠনের মতোই এ কাজও কখনও শেষ হওয়ার নয়; আর ঠিক এ জন্যই প্রতি বছর আয়োজক থেকে শিল্পীরা দুর্গাপূজাকে আরও বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যান।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Durga Puja

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy