E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

গৃহশিক্ষকতার বাস্তুতন্ত্র

ছাত্রের কেন গৃহশিক্ষক লাগবে— এটাই কি আপত্তি, না কি বিশেষ ভাবে স্কুলের শিক্ষকদের গৃহশিক্ষকতা করাটাই আসল সমস্যা? সমাজমাধ্যমের কল্যাণে শুনতে পাই বিক্ষুব্ধ অভিভাবকেরা কেউ কেউ কৈফিয়ত চাইছেন, স্কুলে কেন যথেষ্ট লেখাপড়া হবে না যাতে ছাত্রকে আর গৃহশিক্ষকের কাছে যেতে না হয়!

রূপালী গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ৩১ জুলাই ২০২৬ ০৬:২০

একটি মেয়ে। সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত একটি স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রের মা। তাঁর ছেলের সাতটি বিষয়ের জন্য গৃহশিক্ষক আট জন, সবাই ওরই স্কুলের শিক্ষক। তাঁদের বাড়ি কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে। ফলে বইয়ের ব্যাগ নিয়ে রাজাবাজার থেকে রানিকুঠি করতে করতেই ছেলে ও মায়ের দিন কাটে। কিন্তু ছেলেকে বাড়ির কাছাকাছি কারও কাছে কেন পড়তে পাঠাননি? আর এত দৌড়াদৌড়ির মাঝে ছেলেটি নিজে লেখাপড়া করে কখন। এই সব প্রশ্ন করলে মা কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েন। শিবরাম থাকলে হয়তো বলতেন ‘কেন, পরের দিন!’ গৃহশিক্ষকতা বিষয়ে দীর্ঘ দিন ধরে যাবতীয় চাপানউতোর লক্ষ করে আমার মনে হয় সমস্যার কেন্দ্রে না পৌঁছে আমরা চার পাশ দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। তাই নিয়ম তৈরি হয়, মুচলেকা লেখানো হয়, কিন্তু ছবিটা বদলায় না।

ছাত্রের কেন গৃহশিক্ষক লাগবে— এটাই কি আপত্তি, না কি বিশেষ ভাবে স্কুলের শিক্ষকদের গৃহশিক্ষকতা করাটাই আসল সমস্যা? সমাজমাধ্যমের কল্যাণে শুনতে পাই বিক্ষুব্ধ অভিভাবকেরা কেউ কেউ কৈফিয়ত চাইছেন, স্কুলে কেন যথেষ্ট লেখাপড়া হবে না যাতে ছাত্রকে আর গৃহশিক্ষকের কাছে যেতে না হয়! গণিতের অনুশীলনীতে ৪০টি অঙ্ক থাকলে শিক্ষক তার তিন-চারটি করিয়ে দিয়ে কেন বলবেন বাকিগুলো বাড়িতে করে নিতে? প্রশ্নগুলি অগ্রাহ্য করা যায় না। বিভিন্ন ছাত্রের জন্য বিভিন্ন কারণে গৃহশিক্ষক দরকার হয়। স্কুলের একটি ক্লাসে গড়ে ৪০ জন ছাত্রের মধ্যে যেমন এক জন শিক্ষকের সন্তান পড়ে, তেমনই প্রথম প্রজন্মের এক জন পড়ুয়াও পড়ে, যাকে বাড়িতে সাহায্য করার কেউ নেই। শিক্ষক ক্লাসে যা পড়িয়ে যান, সবাই তা সমান ভাবে গ্রহণ না-ও করতে পারে, সেটা শিক্ষকের দোষ নয়, পড়ুয়াটিরও নয়। যে সেটা পারে না বা ততটা মনোযোগী নয়, আর যার বাড়িতেও পড়া দেখিয়ে দেওয়ার উপযুক্ত কেউনেই, সে কী করবে? একটা সময় পর্যন্ত তারা পিছিয়েই থাকত। এখন অভিভাবকদের সচেতনতা বেড়েছে, তাই গৃহশিক্ষক রাখার মৌলিক একটা চাহিদা তৈরি হয়েছে।

এমনকি যে সব শিশু বাড়ির লোকের কাছে পড়তে চায় না, তাদের জন্যও আসছেন গৃহশিক্ষক। প্রাথমিক ভাবে এই ছাত্ররা হয়তো পাড়ার বড় দাদা-দিদি, কাকা, পিসিদের কাছেই পড়ে। কিন্তু যত উঁচু ক্লাসে ওঠে, ততই লেখাপড়া কঠিন ও প্রতিযোগিতামূলক হতে থাকে। নিয়মিত চর্চায় না থাকলে উপযুক্ত পাঠ দেওয়া সম্ভব হয় না। তাই দেখিয়ে দেওয়ার, বুঝিয়ে দেওয়ার উপযুক্ত লোক কাছাকাছি না পেলে স্কুলের মাস্টারমশাইয়ের কাছে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। নিজের স্কুলের মাস্টারমশাই তাকে বিনামূল্যে পড়াতে পারেন, কিন্তু অন্য স্কুলের শিক্ষক তাকে সে ভাবে কেন পড়াবেন? তা ছাড়াও অধিক মেধাবী ছাত্রদের জন্য উন্নততর পাঠ ও অনুশীলন, যা নিয়মিত ক্লাসে সম্ভব নয়, তার জন্যই বা ছাত্ররা কোথায় যাবে? মানে অনগ্রসর ছাত্রকে এগিয়ে আনতে, ভাল ছাত্রকে আরও ভাল করে তুলতে গৃহশিক্ষকের দরকার পড়ে।

উল্টো দিক থেকে ভাবলে, মাস্টারমশাইরা না পড়ালে যদি এই ছাত্ররা পিছিয়েই থাকে, তা হলেই বা কী ভাল হবে! এই ভাবে শিক্ষকদের অপরিহার্য গৃহশিক্ষকতার বাস্তুতন্ত্রটি সম্পূর্ণ হতে থাকে। এতে নিঃসন্দেহে শিক্ষকের প্রভূত আর্থিক লাভ হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, তিনি একটি পরিষেবা দিচ্ছেন। যাঁরা পরিষেবাটি নিচ্ছেন তাঁরাও লাভবান হন বলেই শিক্ষকদের কাছে যান। তবে অত্যধিক গৃহশিক্ষক-নির্ভরতা ছাত্রদের লেখাপড়ায় স্বনির্ভরতা ও আত্মবিশ্বাসকে ধ্বংস করে। তারা নিজে কিছু পড়ে নেওয়া বা সমাধান করার কথা ভাবতেই পারে না।

অভিভাবকরা অবশ্যই চান স্কুলে শিক্ষকরা ভাল ভাবে পড়ান। কিন্তু স্কুলের সময়ের বাইরে শিক্ষক যদি ‘প্রাইভেট’ পড়ান, বেশির ভাগ অভিভাবকেরই তাতে আগ্রহ বেশি। কারণ, স্কুলের শিক্ষকের যোগ্যতা আছে, সিলেবাস, প্রশ্নোত্তরের ধাঁচ ইত্যাদি বিষয়ে তাঁরা বেশি ওয়াকিবহাল থাকবেন এবং হয়তো তাঁর কাছে পড়া ছাত্রদের একটু বেশি নম্বর দেবেন। সেই শিক্ষকদের কাছে আলাদা করে পড়াবার সামর্থ্য যাঁদের নেই, কিন্তু সন্তান লেখাপড়ায় পিছিয়ে থাকে, এই বিষয়ে রাগটা তাঁদেরই হয়তো বেশি। কিন্তু সরকারের অবস্থানটা পরিষ্কার। তারা মুচলেকা লিখিয়ে, শাস্তির ভয় দেখিয়ে বেতনভুক শিক্ষকদের গৃহশিক্ষকতাকে আটকাতে চায়। অর্থাৎ, সরকার গৃহশিক্ষকতার বিরোধী নয়, বরং বেকার যুবসম্প্রদায়ের একটা সুরাহা হিসেবে এই ব্যবস্থা টিকিয়েই রাখতে চায়। এইখানে এসে সরকার ও উপভোক্তার মধ্যে একটা স্বার্থের সংঘাত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে সরকার চাইলেও অভিভাবকরাই কখনও কখনও ঢাল হয়ে দাঁড়ান শিক্ষকদের পক্ষে।

বর্তমানে গৃহশিক্ষকতা একটি যথেষ্ট অর্থকরী উদ্যোগ। শিক্ষিত বেকার সম্প্রদায়ের অনেকেরই স্থায়ী পেশা গৃহশিক্ষকতা। এঁরা এই ব্যবস্থার তৃতীয় অক্ষে অবস্থান করেন এবং তীব্র ভাবে চান স্কুলের মাস্টারমশাইরা গৃহশিক্ষকতা বন্ধ করুন, যাতে এই ক্ষেত্রটি সম্পূর্ণ ভাবে তাঁদেরই আওতায় থাকে। সেই চাওয়াকে এঁরা প্রায় নৈতিক দাবিতে পরিণত করেছেন। নিজেদের উদ্যোগে সংস্থা গড়েতুলেছেন, যেখানে নথিভুক্ত বেকাররাই শুধু গৃহশিক্ষকতার অধিকারী, এমন দাবি তাঁদের। অর্থাৎ সরকার, বেকার, অভিভাবক (ও ছাত্র) সবাই আলাদা আলাদা কারণে চাইছেন গৃহশিক্ষকতা বজায় থাকুক। কে করবেন কে করবেন না, তাই নিয়ে কিছু মতান্তর আছে।

স্কুলের শিক্ষকরা কখনও ক্লাসের পড়ানোয় গাফিলতি করেন না, তা নয়। তার জন্য ছাত্রদের লেখাপড়ার ক্ষতি হয় অথবা তারা আলাদা ‘টিউশন’ নিতে বাধ্য হয়, সেটাও সত্যি। কিন্তু আমাদের পরিকাঠামোয় অজস্র ছুটি ও কাজের ফাঁদে আটকে থাকা অপর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষকের পক্ষে ক্লাসেই সবটুকু সকলকে নিখুঁত ভাবে পড়িয়ে দেওয়া সম্ভব না হলেই তাঁকে ‘টিউশন’-এর দোষ দেওয়া যায় না। অসংখ্য শিক্ষক আছেন, যাঁরা বাড়িতে ছাত্র পড়ালেও ক্লাসেও যত্ন করেই পড়ান। আবার এমন শিক্ষকও আছেন, যাঁরা বিনা কারণেই ক্লাসের পড়ানোয় গাফিলতি করেন। তাই শিক্ষকদের শুধু গৃহশিক্ষকতার কারণে একতরফা অভিযুক্ত করে, তাঁদের বেতনের দিকে কটাক্ষ করে লাভ কিছু হয় না। কলেজ শিক্ষকরা, এমনকি অন্য পেশার লোকজনও সুযোগ-সুবিধামত ছাত্র পড়ান। এই পড়ানো বা পড়া কোনওটাই সমাজসেবা নয়, চাহিদা ও জোগানের পারস্পরিক অচ্ছেদ্য সম্পর্ক, বাইরে থেকে একে ভাঙা কঠিন। যাঁরা মূল্যের বিনিময়ে এই পরিষেবা নেবেন, তাঁরা ভাল শিক্ষক চাইবেন, তাঁদের কোনও দায় নেই কর্মহীনদের সংস্থানের জন্য সন্তানকে সেখানেই পড়ানোর। আবার যত্ন করে পড়ানোর গুণেই ছাত্রছাত্রীরা অনেক শিক্ষিত বেকার ছেলেমেয়ের কাছেও পড়তে যায়, সেটাও সত্যি। তাই স্কুল-কলেজ নির্বিশেষে শিক্ষকদের ক্লাসের সময়ে পড়ানো বন্ধ করা যায়, নিজের স্কুলের ছাত্রদের কাছ থেকে বেতন নেওয়াও বন্ধ করা যায়, কিন্তু পড়ানো বন্ধ করা যায় না। মুচলেকা দেওয়া শিক্ষক বাড়িতে বিনামূল্যে পড়ালে যেমন কিছু বলার নেই, তেমনই গোপনে বেতন নিয়ে পড়ালে বা অনলাইন পড়ালেও কিছু করা সম্ভব নয়। অভিভাবকরাই তাঁর পক্ষে দাঁড়াবেন।

বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা পুরোপুরিই ‘প্রাইভেট টিউশন’ নির্ভর। সেই সব শিক্ষণ কেন্দ্রে কারা পড়ান— নানা স্তরের শিক্ষকরাই তো! না হলে ছেলেমেয়েদের নিট, জেইই, গেট, এই সব পরীক্ষার জন্য তৈরি করবেন কারা? তাই লেখাপড়ার মানের অবনতির হাজারটা কারণ ছেড়ে শুধু শিক্ষকদের ‘প্রাইভেট পড়ানো’র দিকে নজর দেওয়া সমস্যার অতিসরলীকরণ মাত্র। শিক্ষকদের অবশ্যই উচিত ছাত্রকে লেখাপড়ায় কিছুটা স্বনির্ভর করে তোলা। স্কুলের পরিকাঠামো উন্নত হলে শিক্ষকের পক্ষে ক্লাসেই অনেকটা করিয়ে দেওয়া সম্ভব। তাই সরকারের তরফ থেকে শাস্তির বদলে কিছু গঠনমূলক পদক্ষেপ করা যায়। যেমন— স্কুলে শিক্ষকদের কর্মদক্ষতার মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা, এবং পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের জন্য স্কুলেই আলাদা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। আর গৃহশিক্ষকতাকে ‘নিষিদ্ধ’ না করে বরং কোনও ভাবে আয়করের আওতায় নিয়ে আসা— যাতে বেকার গৃহশিক্ষকরা কিছুটা সুবিধা ভোগ করেন। দ্বার বন্ধ করে গৃহশিক্ষকতাকে রুখে দেওয়া আসলে কোনও সমাধানই নয়।

রসায়ন বিভাগ, সিস্টার নিবেদিতা ইউনিভার্সিটি।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
coaching Tuition

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy