E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

স্বতন্ত্রতা রক্ষার লক্ষ্যে

পঁচাশি বছর আগে, নাগাল্যান্ডের ইতিহাসের হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁকটির সূচনা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ১৯৪১ সালে যখন জাপান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পার্ল হারবার ঘাঁটিতে অতর্কিত হামলা চালায়, এশিয়ার বুকে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে।

অশোক ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০৬ অগস্ট ২০২৬ ০৬:৫১
সংগ্রামী: দীর্ঘ প্রতিবাদ-বিক্ষোভ পর্বে নাগা আন্দোলন, দিল্লি, ১১ জুন ২০২২।

সংগ্রামী: দীর্ঘ প্রতিবাদ-বিক্ষোভ পর্বে নাগা আন্দোলন, দিল্লি, ১১ জুন ২০২২। ছবি: পিটিআই।

এই দেশের উত্তর-পূর্বে এমন একটি রাজ্য আছে, যার জনতাত্ত্বিক বৈচিত্র ও ইতিহাসের জটিলতা বিশ্বের যে কোনও রাষ্ট্রতত্ত্ব ও সমাজতত্ত্বের আলোচকের কাছেই বিরাট কৌতূহলের বিষয়। তার নাম নাগাল্যান্ড। বর্তমান নাগাল্যান্ডে রাজ্যের প্রশাসনিক সীমানার মধ্যে ১৬টি প্রধান নাগা জনজাতি গোষ্ঠীর বাস। এদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব ভাষা, স্বকীয় সংস্কৃতি, প্রাচীন লোককাহিনি এবং জীবনযাপনের স্বতন্ত্র রীতিনীতি। এই জনজাতিদের মধ্যে আও, আঙ্গামি, সেমা, লোথা, কন্যাক এবং চাং-রা আছেন। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, এই রাজ্যের ৮৭.৭০ শতাংশ মানুষ তফসিলি জনজাতিভুক্ত, যা এই রাজ্যকে ভারতের অন্যান্য প্রান্ত থেকে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্র দিয়েছে।

পঁচাশি বছর আগে, নাগাল্যান্ডের ইতিহাসের হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁকটির সূচনা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ১৯৪১ সালে যখন জাপান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পার্ল হারবার ঘাঁটিতে অতর্কিত হামলা চালায়, এশিয়ার বুকে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। কয়েক মাসের মধ্যেই জাপান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে নেয়। ১৯৪২ সালের মধ্যে জাপানি বাহিনীর আগ্রাসন বর্মায় পৌঁছে যায়। রেঙ্গুন ও মান্দালয়ের পতন ঘটে।

জাপানের লক্ষ্য ছিল, ব্রিটিশ ভারতের সীমানায় প্রবেশ করা। ১৯৪৪ সালের বসন্তকালে জাপানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন ইউ-গো’ নামক একটি সুপরিকল্পিত সামরিক অভিযান শুরু করে। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল বর্মা সীমান্ত অতিক্রম করে নাগা পাহাড়ের দুর্গম পথ ধরে কোহিমা দখল করা, এবং ইম্ফল ও ডিমাপুরের যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে ব্রিটিশ বাহিনীকে অবরুদ্ধ করা। ১৯৪৪ সালের ৪ এপ্রিল থেকে ২২ জুন পর্যন্ত কোহিমার পাহাড়ে যে ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়, তা সামরিক ইতিহাসের এক বিরল এবং রোমাঞ্চকর অধ্যায়।

এই যুদ্ধকে সামরিক ইতিহাসবিদরা ‘প্রাচ্যের স্তালিনগ্রাদ’ বলেন। ইউরোপের রণাঙ্গনে রাশিয়ার ভোলগা নদীর তীরে স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধে যেমন জার্মান নাৎসি বাহিনীর অজেয় ভাবমূর্তি ধূলিসাৎ করে সোভিয়েট ইউনিয়ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছিল, ঠিক তেমনই এশিয়ার মাটিতে কোহিমার পাহাড়ে জাপানি বাহিনীর অদম্য অগ্রযাত্রা রুখে দিয়েছিল মিত্রবাহিনী।

অবশ্যই মনে রাখতে হবে, কোহিমার এই যুদ্ধের সঙ্গে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য যোগসূত্র রয়েছে। জাপানি বাহিনীর এই আগ্রাসনের অন্যতম সহযোগী ছিল নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বাধীন আজ়াদ হিন্দ ফৌজ। নেতাজি চেয়েছিলেন, জাপানি বাহিনীর সহযোগিতায় ভারতের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করে ব্রিটিশ শাসন উৎখাত করতে। কোহিমার যুদ্ধে আইএনএ অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৪৪ সালে ইম্ফল থেকে একটু দূরে অবস্থিত মৈরাং শহরে আইএনএ এবং জাপানি বাহিনীর যৌথ আক্রমণে ব্রিটিশ শাসন মুক্ত হয়েছিল। মেজর শওকত মালিক সেখানে প্রথম স্বাধীন ভারতের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন।

এই যুদ্ধে স্থানীয় নাগা জনজাতিদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত নির্ণায়ক। তারা দুর্গম পাহাড়ি পথ চিনিয়ে দিয়ে, রসদ বহন করে আহত সৈন্যদের শুশ্রূষা করেছিল। কোহিমার গ্যারিসন পাহাড়ে অবস্থিত ‘ওয়ার সিমেট্রি’ বা যুদ্ধ গোরস্থানে গেলে আজও সেই ভয়াবহ বিষাদময় স্মৃতির মুখোমুখি হতে হয়। সারি সারি কবরের ফলকে খোদিত রয়েছে ব্রিটিশ, ভারতীয় এবং গোর্খা বাহিনীর ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সি তরুণ সৈন্যদের নাম।

ব্রিটিশ শাসনে নাগা পার্বত্য এলাকা অসমের একটি জেলা হিসেবে থাকলেও তাত্ত্বিক ভাবে তা ছিল ‘এক্সক্লুডেড এরিয়া’ বা শাসনতন্ত্রহীন একটি অঞ্চল, যেখানে ব্রিটিশ প্রশাসন খুব একটা হস্তক্ষেপ করত না। ভারতের স্বাধীনতার প্রাক্কালে ১৯৪৬ সালে নাগা পার্বত্য এলাকার জন্য ষষ্ঠ তফসিলের অধীনে স্বশাসনের প্রস্তাব দেওয়া হয়, কিন্তু নাগা জাতীয় নেতারা তা দৃঢ় ভাবে প্রত্যাখ্যান করে নাগাদের একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান। দাবিটি বাতিল হয়েছিল।

এই রাজনৈতিক বঞ্চনার অনুভূতি থেকেই ১৯৪৯ সালে ফিজো স্বাধীন নাগাল্যান্ডের দাবিতে নাগা পার্বত্য এলাকায় এক গণভোটের আয়োজন করেন। কিছু বছর পর ১৯৫২ সালের অসম বিধানসভা নির্বাচনে দেখা যায়, নাগা পার্বত্য এলাকার মানুষ তা সম্পূর্ণ ভাবে বয়কট করছেন।

ক্ষোভ ক্রমশ তীব্র হয়। ১৯৫৪ সালে বর্মা সীমান্তে তুয়েনসাং জেলার ফিজো ‘নাগাল্যান্ড সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র’ গঠন করেন। প্রায় ১৫,০০০ নাগা বিদ্রোহী সশস্ত্র ভাবে ভারত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ভারতীয় সেনাবাহিনী কঠোর পদক্ষেপ করে। ফিজো দেশ ত্যাগ করে লন্ডনে আশ্রয় নেন, সেখান থেকেই আন্দোলন পরিচালনা করতে থাকেন।

১৯৬০-এ নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিলের একটি নরমপন্থী অংশের সঙ্গে ভারত সরকারের ১৬ দফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৬৩ সালে নাগাল্যান্ড একটি স্বতন্ত্র রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু ১৯৭৫-এ ভারত সরকারের সঙ্গে এনএনসি-এর একটি অংশের ‘শিলং চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হলে নাগাদের মধ্যে ফাটল ধরে। এই চুক্তির শর্ত ছিল, অস্ত্র সমর্পণ এবং ভারতীয় সংবিধান মেনে নেওয়া। তা প্রত্যাখ্যান করেন থুইঙ্গালেং মুইভা, ইসাক চিশি সোয়ে এবং এস এস খাপলাং-এর মতো নেতারা। ১৯৮০ সালে তাঁরা গঠন করেন ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট কাউন্সিল অব নাগাল্যান্ড। তাঁদের মূল দাবি ছিল বৃহত্তর নাগাল্যান্ড বা ‘নাগালিম’ গঠন, যেখানে উত্তর-পূর্ব ভারত ও মায়ানমারের সমস্ত নাগা অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে এই সংগঠনেও বেশি দিন ঐক্য বজায় থাকেনি। ১৯৮৮-র এক রক্তক্ষয়ী অন্তর্ঘাতের মাধ্যমে তা বিভক্ত হয়ে যায়। এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নাগা জীবনে এক গভীর ছাপ রেখে গেছে।

নাগাল্যান্ডের প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামো ভারতের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭১(ক) অনুচ্ছেদ নাগাল্যান্ডকে এক অনন্য আইনি ও সাংস্কৃতিক সুরক্ষা প্রদান করেছে, যা এই রাজ্যের স্বকীয়তা বজায় রাখার মূল ভিত্তি। উত্তর-পূর্ব ভারতের অনেক রাজ্যে ষষ্ঠ তফসিল কার্যকর থাকলেও নাগাল্যান্ডে তা প্রযোজ্য নয়। গ্রামগুলির শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয় ‘ভিলেজ কাউন্সিল’ বা গ্রাম পরিষদ দ্বারা। এদের হাতে সমস্ত স্থানীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের চূড়ান্ত ক্ষমতা রয়েছে। পাশাপাশি, অরুণাচল প্রদেশের মতো নাগাল্যান্ডেও বাইরের রাজ্য থেকে আগত নাগরিকদের জন্য ‘ইনার লাইন পারমিট’ চালু আছে, যা এই অঞ্চলের জনতাত্ত্বিক কাঠামো ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করার একটি আইনি ঢাল হিসেবে কাজ করে।

কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যটিতে আন্তঃসীমান্ত বিদ্রোহ এবং নিরাপত্তার নানাবিধ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ভৌগোলিক দুর্গমতা, অনুন্নত পরিকাঠামো এবং ক্রমাগত বঞ্চনার অনুভূতির কারণে ‘ইস্টার্ন নাগাল্যান্ড পিপলস অর্গানাইজ়েশন’ ২০১০ সাল থেকে নাগাল্যান্ডের থেকে আলাদা হয়ে পৃথক একটি রাজ্যের দাবি জানিয়ে আসছে, যার প্রস্তাবিত নাম ছিল ফ্রন্টিয়ার নাগাল্যান্ড। এই দাবির সমর্থনে ইএনপিও ব্যাপক গণআন্দোলন গড়ে তোলে। রাজনৈতিক অচলাবস্থা, তীব্র অসন্তোষ এবং দীর্ঘ ১১ বছর ধরে সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যকলাপ রাজ্য এবং কেন্দ্র সরকারের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। অবশেষে সমাধানে পৌঁছনো সম্ভব হয় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ভারত সরকার, নাগাল্যান্ড এবং ইএনপিও-এর মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ত্রিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য পূর্ব দিকের ছয়টি জেলার জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার স্বীকৃতি প্রদান। গঠিত হয় ‘ফ্রন্টিয়ার নাগাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অথরিটি’। কোনও পৃথক রাজ্য না তৈরি করে রাজ্যের অভ্যন্তরে এক স্বশাসিত প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করার এক অভূতপূর্ব মডেল এটি। আশা করা যায়, বিগত কয়েক দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা এ বার কমে আসবে।

যে মাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তরুণ সেনাদের রক্তে ভিজেছিল এক দিন, সেই একই ভূখণ্ড আজ পরিবর্তনের নতুন স্বপ্নে রঙিন। নাগাল্যান্ডের শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম ও সচেতন নারীরা আজ স্থির করছেন যে, তাঁদের প্রকৃত যুদ্ধ আর রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে নয়, বরং দারিদ্র, বঞ্চনা, অনুন্নয়ন এবং পিতৃতান্ত্রিক জড়তার বিরুদ্ধে।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
nagaland Politics

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy