বিশ্ববিদ্যালয় তার নিজস্ব উদ্যানে যখন আবাদ করবে তখন সরকারের দায়িত্ব হবে তাতে সঠিক পরিমাণে উপযুক্ত সারের জোগান দেওয়া। মরসুম শেষে সরকার ওই উদ্যানের ফসল নিশ্চয় দাবি করবে, কিন্তু কুসুমিত হওয়ার আগে কোনও কিশলয়কে সমূলে উৎপাটিত করবে না।” ১৯৫৩ সালে কথাটি বলেছিলেন ব্রিটিশ সরকারের চ্যান্সেলর অব এক্সচেকার, রিচার্ড অস্টেন বাটলার। তিনি শিক্ষাবিদ নন, রাজনীতিবিদ ছিলেন, মন্ত্রীও হয়েছিলেন। ফরাসি ভাষার অধ্যাপক ইউজিন ভিনাভার ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বক্তৃতায় বলেছিলেন, “যে অবস্থায় শিক্ষার উন্নতি হতে পারে তার সঙ্গে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো বা সেনাবাহিনীর প্রশাসনিক ব্যবস্থার কোনও তুলনাই চলতে পারে না।... একটি শিক্ষা পরিচালন সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের স্বাধীনতা যত বেশি হবে ওই সংস্থার কার্যকারিতা তত বৃদ্ধি পাবে। কারণ বৌদ্ধিক শক্তি এমনই যে, ব্যক্তির স্বাধীনতা খর্ব হলে তার বিনাশ অবশ্যম্ভাবী।” পশ্চিমি গণতন্ত্রগুলি বিশ্ববিদ্যালয় নামক প্রতিষ্ঠানকে কেমন চোখে দেখে, তা এই দুই ভাষ্য থেকে পরিষ্কার। আজ এ দেশে, বিশেষ করে এ রাজ্যে এই দুটো কথাই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
‘পশ্চিমবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয় (প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রণ) সংশোধন বিল ২০২৬’ বিধানসভায় পাশ হল। তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে, এমন আশঙ্কা যথেষ্ট। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, ‘এক রাজ্য, এক শিক্ষা’ ব্যবস্থা চালু হলে, এবং আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় বদলি চালু হলে দুর্বল বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে ‘সেন্টার অব এক্সেলেন্স’ হিসাবে গড়ে তোলা যাবে। প্রথম প্রশ্ন, শিক্ষার উৎকর্ষের জন্য ‘এক রাজ্য এক শিক্ষা’ নীতি নিতে হবে কেন? প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে একটা বিশেষ সময়ের বৌদ্ধিক ও সামাজিক প্রয়োজনে। যেমন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের সময়ে, বিদেশি শিক্ষা বর্জনের আবহে। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা হয়েছিল অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল ও তৎসংলগ্ন মানুষের বিশেষ প্রয়োজন-ভিত্তিক বিষয়ের চর্চার উদ্দেশ্যে। রবীন্দ্রভারতী, বিদ্যাসাগর প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য এবং আবহও ভিন্ন ছিল। সেই অনুসারে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব শিক্ষা-ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে। সেই সব বৈশিষ্ট্যকে মুছে এক করে দিলে রাজ্যের উচ্চশিক্ষার বিকাশে কী সুবিধে হবে?
দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় কি সরকারি দফতর, যেখানে আধিকারিকরা ইচ্ছামতো শিক্ষকদের বদলি করতে পারেন? উত্তর হল, না। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোতে যা চলে, বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থায় তা চলতে পারে না। একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে, যে কোনও উচ্চমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠন-পাঠন ও গবেষণার ঐতিহ্য শিক্ষক-ছাত্র-গবেষকদের দীর্ঘ ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফসল। অতএব একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি উচ্চমানের বিভাগ থেকে এক-দু’জন শিক্ষককে অন্যত্র বদলি করলে সেই বিদ্যালয় লাভবান হবে না, বরং ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় তো কেবল পড়ানো আর পরীক্ষা নেওয়ার জায়গা নয়, গবেষণার জায়গা। গবেষণার জন্য লাইব্রেরি লাগে, ল্যাবরেটরির প্রয়োজন হয়, গবেষণা প্রকল্প এবং তার জন্য অনুদানের দরকার হয়। তার জন্য নানা অর্থদানকারী সংস্থা আছে, যেগুলি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম (র্যাঙ্কিং) ও শিক্ষক— যিনি গবেষণার তত্ত্ববধায়ক হন— তাঁর অতীত সাফল্যকে ভিত্তি করে অর্থ দান করে। এক জন তত্ত্বাবধায়ককে যদি বদলি করে অন্য কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ করা হয়, তা হলে তাঁর গবেষণা প্রকল্প বা গবেষক-ছাত্রদের ভবিষ্যৎ কী দাঁড়াবে? দু’পক্ষই অগাধ জলে পড়বেন না কি?
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান আইন মোতাবেক বিশেষজ্ঞদের নির্বাচন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী উপাচার্য শিক্ষক নিয়োগ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলি স্বশাসিত সংস্থা। রাজ্য সরকারের শিক্ষক নিয়োগে কোনও ভূমিকা নেই। রাজ্য সরকার যাঁদের নিয়োগ করেনি, তাঁদের বদলি করবে কোন অধিকারে? আইন সংশোধন করে সেই অধিকার রাজ্য সরকার অর্জন করল। কিন্তু তার অর্থ, এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলি পত্তনের আইন থেকে ‘স্বশাসিত’ (অটোনমাস) শব্দটি থেকে মুছে দিতে হবে। যা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণের ইতিহাসকেই নস্যাৎ করবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলির নিয়ম এ দেশে কোথাও কি আছে? কোনও রাজ্যে নেই, এমনকি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতেও নেই। হঠাৎ এ রাজ্যে তা চালু করতে এত উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে কেন?
অনেকে এই আইনের পিছনে দেখছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, বিরুদ্ধ মতের শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীদের সরিয়ে শাসক-ঘনিষ্ঠদের আনার প্রয়াস। সরকার অবশ্য ঘোষণা করেছে, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষক বদলি করতে চায়। তাতে বাস্তবিক ফল কী হবে? এমন নয় যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে যথেষ্ট শিক্ষক রয়েছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে ১৫ জন শিক্ষকের পদ রয়েছে, রয়েছেন ৭, ইতিহাসে ২৫টি পদে ৮, দর্শনের ২১টি পদে ৬ জন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু বিভাগে অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষকের পদ শূন্য, রবীন্দ্রভারতীতে ৯৮টি শিক্ষক পদ শূন্য। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে মজবুত করার উপায় অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষক বদলি নয়, নতুন শিক্ষক নিয়োগ। সম্ভব হলে শিক্ষকের নতুন পদ তৈরি করে নিয়োগ করা দরকার। যথেষ্ট আলোচনা না করে কেবল সংখ্যাধিক্যের জোরে আইন পাশ করলে শিক্ষার পরিবেশটিই বিনষ্ট হয়।