ভারতে ডাক্তারি পড়ার প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট’-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে কিছু দিন আগে সারা দেশ উত্তাল হয়েছিল। তার মাঝে আর একটি ‘নিট’ অর্থনীতি সংক্রান্ত আলোচনায় সাড়া ফেলেছে। এই ‘নিট’-এর অর্থ ‘নট ইন এডুকেশন, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং’। সোজা কথায়, এঁরা হলেন ১৫-২৯ বছর বয়সি সেই সব তরুণ-তরুণী, যাঁদের পড়াশোনা, প্রশিক্ষণ বা কর্মক্ষেত্রে কোনও অস্তিত্ব নেই। নীতি আয়োগের রিপোর্ট ‘রিইমেজিং স্কিলিং ফর বিকশিত ভারত @ ২০৪৭’ অনুসারে, ভারতে এখন এই ধরনের যুবশক্তির সংখ্যা ৮ কোটি ৭০ লক্ষ। তবে, প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো এবং নীতি আয়োগের স্পষ্টীকরণ অনুযায়ী, এই ৮.৭ কোটির পুরো অংশটিকেই চিরাচরিত অর্থে ‘বেকার’ বা ‘সুযোগহীন’ বলা ভুল হবে। এই নিট-এর ৮৮% মানুষ মূলত গৃহস্থালির কাজে যুক্ত। তা সত্ত্বেও নিট-এর এই বিপুল সংখ্যা এক গভীর সঙ্কটের পরিচায়ক, যা মূলত শিক্ষাব্যবস্থা, কাজের বাজার ও আর্থিক কাঠামোর সমন্বয়হীনতারই ইঙ্গিতবাহী। অর্থনীতিবিদদের মতে, সামগ্রিক বেকারত্বের হার মাপার ক্ষেত্রে এই নিট পদ্ধতিটি অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য, কারণ এটি যুবসমাজের কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হওয়ার বাস্তব চিত্রটি সঠিক ভাবে তুলে ধরতে পারে।
নীতি আয়োগের রিপোর্টের তাৎপর্য বুঝতে হলে দেখতে হবে আর একটি নিট সংক্রান্ত সরকারি রিপোর্ট। কেন্দ্রীয় সরকারের পরিসংখ্যান ও প্রকল্প রূপায়ণ দফতর সারা দেশের জেলাভিত্তিক রিপোর্ট দিয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে ৫৬৬টি জেলার মধ্যে ২৫১টি জেলায় এই ১৫-২৯ বছরের যুবশক্তির ২৫% নিট শ্রেণিভুক্ত, যা উন্নত দেশ হিসাবে গড়ে উঠতে চাওয়া ভারতের অর্থনীতির পক্ষে বিপদসঙ্কেত। বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জেলায় ২৫ শতাংশের বেশি তরুণ নিট শ্রেণিভুক্ত। আলাদা করে উল্লেখ করতে হয় মেয়েদের কথা। দেখা যাচ্ছে, নিটে মেয়েদের সংখ্যা ছেলেদের তুলনায় অনেক বেশি। মজুরিহীন গৃহশ্রম, সামাজিক বিধিনিষেধ ও পিতৃতন্ত্রের প্রভাব স্পষ্ট এই উদ্বেগজনক পরিসংখ্যানে।
নিটের উচ্চ হার কেন ভারতীয় অর্থনীতির সুস্বাস্থ্যের জন্য ভাল নয়, তা উপলব্ধি করতে হলে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ (ডিডি) বা ‘জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ’-র গুরুত্ব বুঝতে হবে। সহজ কথায়, যখন কোনও দেশে জন্মহার কমে যাওয়ার কারণে শিশু ও বৃদ্ধ (নির্ভরশীল) মানুষের তুলনায় কর্মক্ষম (১৫-৬৪ বছর বয়সি) মানুষের সংখ্যা আনুপাতিক হারে সবচেয়ে বেশি হয় এবং এই বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের অবদান রাখে, তখন তাকে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বলে। এই ‘ডিভিডেন্ড’ থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে কর্মক্ষম মানুষদের জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত শিক্ষা, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান।
ভারতের ক্ষেত্রে এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড-কে বুঝতে হলে ১৯৫০ সাল থেকে আমাদের দেশের জনবিন্যাসের পরিবর্তনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটিকে বুঝতে হবে। ১৯৫১ সালের জনগণনা অনুসারে ভারতের লোকসংখ্যা ছিল ৩৬ কোটির বেশি, সংখ্যার বিচারে পৃথিবীর দ্বিতীয় জনবহুল দেশ। প্রথমে ছিল চিন, লোকসংখ্যা ৫৫ কোটির কাছাকাছি। কিন্তু গত ৭৫ বছরে ছবিটা অনেক পাল্টেছে। বিশ্বের সর্বাধিক জনসংখ্যার দেশ এখন ভারত। তবে এই জনসংখ্যা তখনই ফলপ্রসূ হয়, যখন তা উৎপাদনশীলতায় রূপ নেয়— যা একটি দেশকে নিয়ে যেতে পারে বিশ্ব অর্থনীতির শীর্ষে, বদলে দিতে পারে বৈশ্বিক জিডিপির চিত্র। এর একটি বড় প্রমাণ ক্রয়ক্ষমতার সমতা (পিপিপি); এই মাপকাঠিতে ২০১৪ সাল থেকে আমেরিকাকে পিছনে ফেলে চিন বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতি, আর ভারতের অবস্থান তিনে।
এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড ভারতের জন্য কী ভাবে কার্যকর হতে পারে সে বিষয়ে নানান সম্ভাবনার উল্লেখ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। প্রথমত, প্রজনন হার কমে যাওয়ার ফলে পরিবার ও সমাজে নির্ভরশীল শিশুর সংখ্যা হ্রাস পেলে সরকার বস্তুগত মূলধন, কর্মসংস্থান কেন্দ্রিক প্রশিক্ষণে বেশি ব্যয় করতে পারে। দ্বিতীয়ত, এই শিশুরা যখন সঠিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পেয়ে বড় হয়ে কাজের বাজারে প্রবেশ করে তখন দেশের শ্রমশক্তির মান ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। তৃতীয়ত, প্রজনন হার কমার ফলে কাজের বাজারে মহিলাদের অংশগ্রহণ বাড়ে। চতুর্থত, জনগণের সঞ্চয়ের ক্ষমতা বাড়লে অর্থনীতিতে তার সদর্থক প্রভাব পড়ে।
কোনও জাতির ক্ষেত্রে ‘ডিডি’ সাধারণত একবারই আসে। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে ভারতের জন্মহার কমতে শুরু করে। তার পর থেকে ভারতের ‘ডিডি’ শুরু হয়েছে ধরে নিলে বলা যায়, ২০৪০ সালের মধ্যে এই সুবিধা শেষ হয়ে যাবে। এখন আমাদের হাতে আর ১৫ বছর সময় আছে। অন্য দেশের উদাহরণও দেখা দরকার। চিন তাদের ডিডি-র সময়কালে গড় বৃদ্ধি ধরে রেখেছিল ৯-১০% এর মধ্যে এবং ২০১২-১৩ সাল থেকে সেখানে কর্মক্ষম জনসংখ্যা কমতে শুরু করেছে। চিন এখন জাপান ও অনেক ইউরোপীয় দেশের মতোই প্রবীণদের সমাজ। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে কাজে লাগিয়ে প্রথম সারির অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে ভারতের নীতিনির্ধারকদের দেশের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দ্রুত নীতি পরিবর্তন করতে হবে। না হলে এক বিপুল পরিমাণ শ্রমশক্তি নিট শ্রেণিভুক্ত হয়েই থেকে যাবে।