E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

বাড়ি পেয়েছেন, কাজ পাননি

সরকারি সূত্রে ওয়েনাড়ের বিপর্যয়ে নিহতের সংখ্যা ছিল ৪২০, আহত ৩৯৭, নিখোঁজ ৪৭, গৃহহীন হয়েছিলেন প্রায় ১০ হাজার মানুষ। সম্পত্তির ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১২০০ কোটি টাকা, ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় ৯ লক্ষ ৩০ হাজার বর্গফুট এলাকা।

স্নেহাশিস সুর

শেষ আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৭:৩৯

অগস্ট মাসের শেষে নেপালের ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ছবি টিভির পর্দায় দেখতে দেখতে মনে পড়ে যাচ্ছিল কেরলের ওয়েনাড়ের কথা। বছর দুই আগে এক ভোররাতে সেখানে এমনই অতর্কিতে নেমে এসেছিল ভয়ঙ্কর কাদা-ধস, জলস্রোত। সে বারেও বহু মানুষ প্রাণ হারান। আরও অনেক মানুষ নিঃস্ব হয়ে যান। আতঙ্ক-শোকে বিধ্বস্ত সেই মানুষগুলি এখন কেমন আছেন, সে প্রশ্নটা নাড়া দিয়ে গেল মনকে। সাংবাদিকের ক্যামেরা সরে যাওয়ার পরে, প্রাথমিক সহানুভূতি, সহায়তার পর আর কি কেউ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার গ্রামবাসীদের মনে রাখে? কেমন আছে এখন ওয়েনাড়, আর তার সেই মানুষজন, বিপর্যয়ের দু’বছর পরে?

উত্তর কেরলে পাহাড়ের কোলে এক মনোরম পর্যটন ক্ষেত্র ওয়েনাড়; চা আর কফি গাছে ভরা। এখানেই ৩১ জুলাই ২০২৪ নেমে আসে কেরলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়। রাত ২টো ১৫ মিনিট নাগাদ চেলিয়ার নদীর শাখানদী পুন্নপূজা যেখান থেকে শুরু হচ্ছে, সেখানে মেপাডি পঞ্চায়েতের অন্তর্গত পুঞ্জিরিমাট্টম এবং মুন্ডাক্কাই গ্রামের কাছে একটা ভূমিধস নামে। তাতে ওই নদী জল, কাদা, পাথরকে সঙ্গে নিয়ে হড়পা বানের মতো তীব্র স্রোতে ধেয়ে এসে রাত আড়াইটে নাগাদ আচমকা ভাসিয়ে নিয়ে যায় ওই দুটো গ্রামকে। তার পর ভোর ৪টে ১০ মিনিট নাগাদ চূড়ামালা গ্রামের কাছে আর একটি ভূমিধস নামে, এবং তারই হড়পা বানের প্রবল স্রোতে পুরো চূড়ামালা গ্রামটাকে ধুয়ে নিয়ে যায়। জল, কাদা, পাথরের যে স্তূপ প্রবল বেগে গড়িয়ে এসেছিল, তার গতির তীব্রতা ছিল প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৯০ ফুট। এই গ্রামগুলিকে মূল জনপদের সঙ্গে যুক্ত করার একমাত্র সেতুটি জলের তোড়ে ভেঙে যায়। ফলে মুন্ডাক্কাই এবং আট্টামালা গ্রামের অধিবাসীরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।

সরকারি সূত্রে ওয়েনাড়ের বিপর্যয়ে নিহতের সংখ্যা ছিল ৪২০, আহত ৩৯৭, নিখোঁজ ৪৭, গৃহহীন হয়েছিলেন প্রায় ১০ হাজার মানুষ। সম্পত্তির ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১২০০ কোটি টাকা, ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় ৯ লক্ষ ৩০ হাজার বর্গফুট এলাকা। বিপর্যস্ত গ্রামগুলি যেখানে ছিল সেখানে এখনও ধসের কাদা, পাথর পড়ে রয়েছে। স্বস্তির কথা এই যে, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য দুটো পুনর্বাসন কলোনি হয়েছে। একটি করে দিয়েছে রাজ্য সরকার, অন্যটি নির্মাণ করেছে ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন অব মুসলিম লিগ (আইইউএমএল), যা একটি রাজনৈতিক দল। লটারি করে ঠিক হয়, গৃহহীন মানুষেরা কে কোন কলোনিতে যাবেন। সম্প্রতি ওয়েনাড়ে গিয়ে পুনর্বাসনের কাজ পর্যবেক্ষণের সুযোগ হয়েছিল। দেখা গেল, কালপেট্টা অঞ্চলে এলস্টোন এস্টেটের সরকারি কলোনিটিতে তৈরি বাড়িগুলি দু’-কামরার। আইইউএমএল-এর তৈরি কলোনিটি একটু দূরে, বাড়িগুলি তিন কামরার। এখানকার বাড়িগুলি যে কেবল কোনও বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষই পেয়েছেন, তা কিন্তু নয়। যাঁরা ওই কলোনিতে যেতে ইচ্ছুক, তাঁদের মধ্যে লটারি করে বাড়ি দেওয়া হয়েছে। দু’টি কলোনিতেই বাড়িগুলি সুনির্মিত, সুন্দর। দেখা গেল, অনেক পরিবার হারিয়ে যাওয়া স্বজনের ছবি টাঙিয়ে নতুন করে গৃহস্থালি পেতেছেন নতুন জায়গায়। কিন্তু সমস্যা জীবিকা নিয়ে। যাঁরা পুরনো গ্রামে খেতমজুরি, দিনমজুরি করতেন, প্রধানত তাঁদেরই হচ্ছে সমস্যা। ঝাঁ চকচকে কলোনির ভিতরে, বা তার কাছাকাছি সে রকম কোনও কাজ নেই। পুনর্বাসনের পর কাজের অভাবই নিম্নবিত্ত পরিবারগুলির সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে।

বিপর্যয়ের দু’বছর পরে গৃহহীনরা বাড়ি পেয়েছেন। তবে তা নিয়ে কারও ক্ষোভ নেই। এত দিন তাঁরা থাকার জন্য প্রতি মাসে পেতেন বাড়ি ভাড়া, রেশন। পেয়েছেন এককালীন অর্থসাহায্য। তা ছাড়া মৃত এবং আহতদের ক্ষতিপূরণ তো ছিলই। নতুন বাড়িতে আসবাবপত্র কেনার টাকাও পেয়েছেন। লক্ষণীয়, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রধানকে বিপর্যয়ের পর পরিচয়পত্র হিসেবে দেওয়া হয়েছিল একটি স্মার্ট কার্ড। তার কিউআর কোড-এ পাওয়া যেত পরিবারের সকলের নাম, রেশনের পরিমাণ, কত দিন অবধি রেশন তুলেছেন, কোন ধরনের আর্থিক সাহায্য কবে প্রাপ্য। কী সহায়তা কবে পেয়েছেন, তা-ও জানা যায়। পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে এত সুচারু ব্যবস্থা কিন্তু দেশে-বিদেশে বিরল, জানালেন জাপানের কিয়ো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং বিপর্যয় মোকাবিলার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ রাজীব শ’।

নতুন বাড়িতে আপনজনের মালা-দেওয়া ছবির সামনে দাঁড়িয়ে অনেকে আক্ষেপ করছিলেন, “আমরা একটু আগে বুঝতে পারলে এদের হারাতে হত না।” যদিও ওয়েনাড়ে তখন পর পর কয়েক দিন বৃষ্টি হচ্ছিল, তবুও এত বড় দুর্ঘটনার পূর্বাভাস দেওয়া হয়নি। পুনর্বাসিত পরিবারের এক জন প্রবীণ মানুষ জানালেন যে, দূর থেকে পাথর-জলের স্রোতের একটা শব্দ শুনতে পেয়েই তাঁর কী রকম মনে হয় যে, আর গ্রামে থাকা যাবে না। তাই প্রাণে বেঁচেছেন। এখন ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট কোঝিকোড়-এর ‘ইন্ডিয়া জাপান সেন্টার অন ক্লাইমেট অ্যান্ড কালচার’ এই এলাকার বিদ্যালয়গুলিতে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে চালাচ্ছে এক অভিনব প্রকল্প। কচিকাঁচারা তাদের দাদু-দিদার কাছ থেকে বিপর্যয় মোকাবিলার স্থানীয় ভাবে প্রচলিত ধারণাগুলো সংগ্রহ করছে, যাতে সেগুলিকে ভবিষ্যতে বিপর্যয়ের আগাম সতর্কতা জারির কাজে লাগানো যায়। আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি পুরনো জ্ঞান, অভিজ্ঞতা নিয়ে চর্চার একটি ধারা হয়তো সহায়ক হয়ে উঠতে পারে।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Wayanad Landslide Natural Disaster Wayanad

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy