কানপুরের বিকাশ দুবে ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার প্রভাস মণ্ডলের মধ্যে কোনও তুলনা চলে কি? প্রভাব-প্রতিপত্তি, অপরাধ জগতের বিস্তার কিংবা সামাজিক অবস্থান— কোনও নিরিখেই নয়। বিকাশ দুবে উত্তরপ্রদেশের অপরাধ-রাজনীতির এমন এক চরিত্র, যিনি পুলিশ-প্রশাসন ও রাজনীতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলে কার্যত সমান্তরাল ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিলেন। অন্য দিকে, দক্ষিণ ২৪ পরগনার নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডল স্থানীয় স্তরের এক অপরাধ-অভিযুক্ত। তবু দু’জনকে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে একটি শব্দ— ‘এনকাউন্টার’।
উত্তরপ্রদেশ পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১০ জুলাই মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনী থেকে ধরা বিকাশ দুবেকে কানপুরে আনার পথে পুলিশি কনভয়ের একটি গাড়ি উল্টে যায়। বৃষ্টির মধ্যে তিনি এক পুলিশকর্মীর আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন, পুলিশের গুলিতে তাঁর মৃত্যু হয়। এ রাজ্যে ২০২৬ সালের ৮ জুলাই গভীর রাতে প্রভাস মণ্ডলের মৃত্যুর সরকারি বয়ানের সঙ্গে ছ’বছর আগের সেই বয়ানের আশ্চর্য রকম মিল। পুলিশের দাবি, ঘটনাস্থলের পুনর্নির্মাণ চলাকালীন তিনি এক পুলিশকর্মীর রিভলভার ছিনিয়ে গুলি চালান, পাল্টা গুলিতে তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনার তদন্ত করছে সিআইডি, ফরেনসিক পরীক্ষাও চলছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো অনুচিত। কিন্তু, কিছু প্রশ্ন তোলা যায় নিশ্চিত ভাবেই।
সম্প্রতি এক ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পেয়েছিল পঞ্জাবের মানবাধিকার কর্মী যশোবন্ত সিংহ কালরা-র জীবন অবলম্বনে সতলুজ ছবিটি। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই অবশ্য সেটিকে সরিয়ে নেওয়া হয়। নব্বইয়ের দশকে পঞ্জাবে ঝোড়ো খলিস্তানি আন্দোলনের সময়ে পুলিশি ‘সক্রিয়তা’ এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে তাদের ভয়াবহ হিংসার মধ্যে মানবাধিকারের সলতে জ্বালিয়ে রাখার যে কাজ কালরা করে চলেছিলেন, তাতে রীতিমতো অস্বস্তিতে পড়ে পঞ্জাবের তৎকালীন কংগ্রেস সরকার। ১৯৯৫-এর ৬ সেপ্টেম্বর তাঁর অমৃতসরের বাড়ি থেকে যশোবন্তকে অপহরণ করা হয়। তাঁর আর সন্ধান মেলেনি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সিবিআই তদন্তে যশোবন্তের সেই কাজ মান্যতা পায়। সাজা হয় বেশ কয়েক জন পুলিশকর্মীর। তিন বছর পরে, ১৯৯৮-এ এক স্পেশাল পুলিশ অফিসার সিবিআইয়ের কাছে স্বীকার করেন, হেফাজতে অত্যাচারের পরে কালরার দেহ শতদ্রু নদীর কাছে খালে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
প্রভাস মণ্ডলের মৃত্যুর পর পশ্চিমবঙ্গে চতুর্দিকে ধন্য ধন্য রব। জোর গলায় বলা হচ্ছে, প্রভাসের মা ও স্ত্রী যেখানে বলছেন, ‘যা হয়েছে ঠিক হয়েছে’; যেখানে ওই নাবালিকার বাড়ির লোকজন বলছেন যে, তাঁরা খুশি— সেখানে অন্য কারও কথার আর কোনও গুরুত্ব নেই। সমাজমাধ্যমে বলা হচ্ছে, এ রকম বিচারই প্রয়োজন, না হলে সমাজে ধর্ষণ ও খুনের মতো ঘটনা বেড়ে চলবে। সত্য যে, আমাদের দেশের বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ রয়েছে। তবে, এর পরেও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার কথা সরকারকে মনে করাতে হবে। মনে করাতে হবে এনকাউন্টারে মৃত্যু নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নির্দেশিকার কথাও। প্রশ্ন কোনও ‘অপরাধী’র প্রতি সমবেদনার নয়, প্রশ্ন গণতান্ত্রিক কাঠামো টিকিয়ে রাখা নিয়ে। বিচারব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করার যে প্রবণতা এই সমাজে মান্যতা পাচ্ছে, প্রশ্ন তা নিয়ে। হাতে-গরম বিচারের যে কথা সাধারণ মানুষ বলে থাকি, সেই একই কথা বা একই মনোভাব কোনও নির্বাচিত সরকার বলতে বা দেখাতে পারে?
প্রভাসের ‘এনকাউন্টার’ বিষয়ক ভাষ্যে অনেক রকম ফাঁকফোকর থাকার অভিযোগ ইতিমধ্যেই উঠেছে। অভিযুক্তকে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণ পর্বে বিধি না-মানার প্রসঙ্গও উঠছে। নিশুতি রাতে কেন কাদা-জলে ডোবা জমিতে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করতে হল? গোটা প্রক্রিয়া কি ভিডিয়োতে ধরা আছে? এখানে সাধারণ দু’জন সাক্ষী কোথায়? পুলিশের কোমরে বা বেল্টের সঙ্গে কি রিভলভার বাঁধা ছিল না? বেশ কয়েক জন পুলিশকর্মীর সামনে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নিয়ে প্রভাস গুলি চালাল কী ভাবে? ময়না তদন্তের যে রিপোর্ট নানা সূত্রে সামনে এসেছে তাতে জানা যাচ্ছে, খুব কাছ থেকে গুলি করা হতে পারে প্রভাসকে। তাঁর দেহ ফুঁড়ে যে ভাবে বুলেট বেরিয়ে গিয়েছে তাতে অনুমান, কোনও উঁচু অবস্থান থেকে তাঁকে গুলি করা হয়েছে। আশা করা যায়, সিআইডি তদন্ত এ বিষয়েও আলোকপাত করবে।
এনকাউন্টার প্রসঙ্গে ২০১৭ সালে ক্ষমতায় এসেই উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ বলেছিলেন, “অগর অপরাধ করেঙ্গে তো ঠোক দিয়ে যায়েঙ্গে।” সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, যোগীর মুখ্যমন্ত্রিত্ব কালে ২০২৬-এর মে মাস পর্যন্ত উত্তরপ্রদেশে মোট ১৭ হাজার ৪৩টি এনকাউন্টারের ঘটনায় সে রাজ্যের ২৮৯ জন কুখ্যাত অপরাধীকে নিকাশ করা হয়েছে। জখম হয়েছে ১১,৮৩৪ জন দুষ্কৃতী। এই সময়কালে গ্রেফতার করা হয়েছে ৩৪,২৫৩ জন অভিযুক্তকে। হিমন্তবিশ্ব শর্মার শাসনাধীন অসমের পরিসংখ্যানও দুশ্চিন্তার। ২০২৫-এর মার্চে অসম বিধানসভায় পেশ করা সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১-এর মে মাসে হিমন্তবিশ্ব মুখ্যমন্ত্রী পদে বসার পর থেকে ২০২৫-এর ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ২৫৬টি পুলিশি অভিযানে ৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত ২২০।
মানবাধিকার সংগঠন পিপল’স ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ় (পিইউসিএল) বনাম মহারাষ্ট্র সরকারের হেফাজতে মৃত্যুসংক্রান্ত মামলায় ২০১৪-র সেপ্টেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আর এম লোঢা এবং বিচারপতি আর এফ নরিম্যানের ডিভিশন বেঞ্চ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ১৯৯৫-এর নির্দেশিকাকে মান্যতা দিয়ে বলে, আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি চালিয়েছে, শুধু এ কথা বললে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। সংশ্লিষ্ট কর্মীর বিরুদ্ধে খুনের মামলা রুজু করে অন্য সংস্থাকে দিয়ে তদন্ত করিয়ে সত্য নির্ধারণ করতে হবে। ঘটনার সত্যাসত্য বিচারের আগে পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশকর্মীদের কোনও পুরস্কার দেওয়া যাবে না, পদোন্নতিও করা যাবে না। সংঘর্ষে মৃত্যুর ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য বেশ কয়েকটি নির্দেশিকাও বেঁধে দেয় সুপ্রিম কোর্ট।
২০২১-এর ৪ ডিসেম্বর নাগাল্যান্ডের সেনাবাহিনীর প্যারা স্পেশাল ফোর্সের গুলিতে ১৩ জন নিরীহ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। নির্দেশ সত্ত্বেও গাড়ি না থামানোয় তাঁদের জঙ্গি ভেবে সেনা গুলি চালায় বলে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছিলেন, “এই ঘটনায় আমরা দুঃখিত। কিন্তু...।” দুঃখের সঙ্গে শাসকের এই ‘কিন্তু’ বড়ই ব্যঞ্জনাময়! মণিপুরেও ভুয়ো সংঘর্ষের ১৫২৮টি ঘটনার কথা উল্লেখ করে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় এক্সট্রা-জুডিশিয়াল এগজ়িকিউশন ভিক্টিম ফ্যামিলিজ় অ্যাসোসিয়েশন, মণিপুর।
সত্তরের দশকে পুলিশি এনকাউন্টারের নামে নকশালপন্থীদের হত্যা সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন কংগ্রেস সরকার মান্যতা দিয়েছিল। তার পরে এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটল। সঙ্গত কারণেই এখনই বলা যাবে না যে, এখানে এনকাউন্টার-রাজ শুরু হল। তবে, রাজ্যের শাসক দলের নেতা-মন্ত্রীরা জোর গলায় এনকাউন্টারের পক্ষে সওয়াল করছেন। জনসমর্থন পাওয়ার জন্য এই পথ নিশ্চয়ই লোভনীয়। সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে, গণতান্ত্রিক পথে সুবিচারের রাস্তা দীর্ঘ ও কঠিন।
ভয়ঙ্কর অপরাধে অভিযুক্ত কেউ এনকাউন্টারে মারা গেলে শাসক দল সমেত অনেকেই বলেন, এ সব দেখে বাকিরা ভয় পাবে, তারা আর অপরাধ করার সাহস পাবে না। কিন্তু কয়েকটি এনকাউন্টারের নমুনা দেখে বাকিরা যদি ভয় পেত, তা হলে উত্তরপ্রদেশ বা অসমে এতগুলি এনকাউন্টারের প্রয়োজন পড়ল কেন? গণতান্ত্রিক কাঠামোকে কার্যত অগ্রাহ্য করে হাতে-গরম ‘বিচার’ পাইয়ে দেওয়াটা কি সর্বজনীনতায় পৌঁছে যাচ্ছে? তা হলে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা শাসক দলকে সতর্ক করবে কে?