E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

যুদ্ধের আঁচ যখন খেলার মাঠে

ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেনের মধ্যে দ্বন্দ্বের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ ও জটিল। আর্জেন্টিনার দাবি, ১৮১৬ সালে স্পেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর উত্তরাধিকার সূত্রে তারা এই দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা পায়। কিন্তু ১৮৩৩ সালে ব্রিটেন এই দ্বীপগুলির উপরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

সৌরজিৎ দাস

শেষ আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৪:১৮

খেলা আর রাজনীতির সম্পর্কটি আপাতভাবে দূরের হলেও আসলে বড়ই কাছের— আন্তর্জাতিক ফুটবলের মাঠে তা বার বার ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বিশেষত এ বারের ফুটবল বিশ্বকাপে যখন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনাল ম্যাচের পরে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের মাঠে ‘ফকল্যান্ডস’ বা ‘মালভিনাস’ দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে ব্যানারটি দেখানো হল, বিষয়টা আরও স্পষ্ট হল। ফিফা এই ঘটনার জন্য আর্জেন্টিনাকে পরে জরিমানা করলেও, দক্ষিণ অতলান্তিকের এক টুকরো জমি নিয়ে দুই দেশের মধ্যেকার ঐতিহাসিক ক্ষতকে নতুন করে উস্কে দিল ওই ব্যানার।

ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেনের মধ্যে দ্বন্দ্বের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ ও জটিল। আর্জেন্টিনার দাবি, ১৮১৬ সালে স্পেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর উত্তরাধিকার সূত্রে তারা এই দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা পায়। কিন্তু ১৮৩৩ সালে ব্রিটেন এই দ্বীপগুলির উপরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। সেখানে ব্রিটিশ বসতি গড়ে তোলে। এই দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈতিক টানাপড়েন এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের রূপ নেয় ১৯৮২ সালে। তৎকালীন আর্জেন্টিনার সামরিক জুন্টা শাসক জেনারেল লিয়োপোল্ডো গালতিয়েরি দেশের অভ্যন্তরে চরম অর্থনৈতিক সঙ্কট ও জনগণের অসন্তোষ থেকে দৃষ্টি ঘোরাতে ওই বছর এপ্রিলের গোড়ায় আকস্মিক ভাবে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আক্রমণ ও দখল করেন। আর্জেন্টিনার এই পদক্ষেপের জবাবে তখনকার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নেন। তিনি দ্রুত ব্রিটিশ নৌ ও বিমানবাহিনীর একটি টাস্কফোর্স সেখানে পাঠান। ৭৪ দিন ধরে চলে যুদ্ধ। দু’তরফে ক্ষয়ক্ষতিও হয় প্রচুর। সংঘর্ষে অন্তত ৬৪৯ জন আর্জেন্টিনীয় এবং ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা নিহত হন। অবশেষে, জুনের মাঝামাঝি আর্জেন্টিনার আত্মসমর্পণে যুদ্ধ থামে এবং ব্রিটেন দ্বীপটি আবার নিজের দখলে নেয়। তবে এই হার আর্জেন্টিনার জাতীয়তাবাদী চেতনায় বড় একটি আঘাত ছিল।

ফকল্যান্ড যুদ্ধের যে মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত তৈরি হয়েছিল, ফুটবল মাঠে তাকে প্রথম বড় ধাক্কা দেয় ১৯৮৬-র মেক্সিকো বিশ্বকাপে মারাদোনার নেওয়া সেই ‘ঐশ্বরিক প্রতিশোধ’। ওই বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর হওয়া সেই ম্যাচটি কেবল একটি ফুটবল খেলা ছিল না, ছিল আর্জেন্টিনার জন্য এক জাতীয় মর্যাদার লড়াই। সেই ম্যাচে দিয়েগো মারাদোনার করা দু’টি গোল ফুটবল ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। প্রথম গোলটি ছিল বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ বা ঈশ্বরের হাতের গোল। আর দ্বিতীয়টি ছিল মাঝমাঠ থেকে একাই পাঁচ জনকে কাটিয়ে করা ‘শতাব্দীর সেরা গোল’।

মারাদোনা পরবর্তী কালে তাঁর আত্মজীবনীতে বলেন, “যদিও আমরা ম্যাচের আগে বলতাম ফুটবল ও যুদ্ধের কোনও সম্পর্ক নেই, আমরা জানতাম ফকল্যান্ডে অনেক আর্জেন্টাইন তরুণ মারা গেছে, যাদের পাখির মতো মারা হয়েছিল। তাই ওই ম্যাচটি ছিল আমাদের কাছে প্রতিশোধ নেওয়ার জায়গা।” ফুটবলের সেই ঐতিহাসিক জয় আর্জেন্টিনার সাধারণ মানুষের কাছে ফকল্যান্ডের সামরিক পরাজয়ের উপরে এক ধরনের প্রলেপ লাগিয়েছিল। এ বার সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার সময় ফিরে এল সেই পুরনো আবেগ।

দক্ষিণ অতলান্তিক মহাসাগরের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের গুরুত্ব খুব বেশি। প্রথমত, দ্বীপপুঞ্জের চার পাশের সমুদ্রসীমায় বিশাল খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত আবিষ্কৃত হয়েছে। এই জ্বালানি সম্পদের উপরে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সঙ্কটের বাজারে যে কোনও দেশের জন্য কৌশলগত ভাবে অত্যন্ত লাভজনক। দ্বিতীয়ত, আন্টার্কটিকা মহাদেশের প্রবেশদ্বার হিসেবে এর ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্টার্কটিকার ভবিষ্যৎ খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান এবং দক্ষিণ অতলান্তিক মহাসাগরে নৌ-আধিপত্য বজায় রাখতে ব্রিটেনের জন্য ফকল্যান্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ঘাঁটি।

অন্য দিকে, আর্জেন্টিনার বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মালভিনাস বা ফকল্যান্ডের উপরে দাবি পুনরুজ্জীবিত করা একটি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হাতিয়ার। দেশের যে সরকারই থাকুক না কেন, জনগণের জাতীয়তাবাদী আবেগকে একতাবদ্ধ করতে ফকল্যান্ডের দাবিকে সামনে নিয়ে আসা তাদের জন্য সহজ পথ। আর্জেন্টিনার দাবি, ফকল্যান্ড তাদের ভূখণ্ডেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ যা ঔপনিবেশিক শক্তির দ্বারা দখল হয়ে আছে। তারা রাষ্ট্রপুঞ্জের রেজ়লিউশন মেনে ব্রিটেনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান চায়। অন্য দিকে, ব্রিটেন সমানেই ফকল্যান্ডের বাসিন্দাদের ‘আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার’ তুলে ধরে। ২০১৩ সালে দ্বীপপুঞ্জে অনুষ্ঠিত একটি গণভোটে ৯৯.৮ শতাংশ বাসিন্দা ‘ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি’ হিসেবে ব্রিটেনের অধীনেই থাকার পক্ষে ভোট দেন। ব্রিটেনের বক্তব্য হল, যতক্ষণ না দ্বীপের বাসিন্দারা নিজেরা অন্য কোনও সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, ফকল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব নিয়ে আর্জেন্টিনার সঙ্গে আলোচনা সম্ভব নয়। আর্জেন্টিনার দাবি, এই বাসিন্দারা মূলত ব্রিটিশ অভিবাসী, তাই এই যুক্তি আন্তর্জাতিক আইনে খাটে না।

ফিফার জরিমানা সাময়িক ভাবে খেলার মাঠে রাজনৈতিক স্লোগান বন্ধ করতে পারে, কিন্তু এই ঐতিহাসিক ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবকে তা মুছে দিতে পারে কি? বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে যখন ইউক্রেন সঙ্কট বা দক্ষিণ চিন সাগরের মতো আঞ্চলিক লড়াইগুলি তীব্র হচ্ছে, তখন ফকল্যান্ডের মতো অমীমাংসিত ক্ষত যে কোনও সময় নতুন ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার জন্ম দিতে পারে। এই ধরনের সমস্যায় স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধান হলে, তবেই ফুটবলের সবুজ মাঠ থেকে একটি একটি করে ছায়াযুদ্ধ শেষ হতে পারে।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Argentina England Falklands war

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy