এই কলকাতাতেই তাঁর শেষ একক চিত্রপ্রদর্শনী, এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে, দেবভাষা বই ও শিল্পের আবাসে। বিষয়-শিরোনাম ছিল ‘সুন্দরী’, পরিচয়লেখতে তার ঠিক নীচেই লেখা ছিল, “মধুর, তোমার শেষ যে না পাই...” “ও বিউটি, আই অ্যাম লস্ট ইন দি ইনফিনিচিউড অব ইয়োর গ্রেস।” ছবিগুলো আঁকা সম্প্রতিকালে, ২০২৫-এর সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে, ঠিক যে সময়টা থেকেই শিল্পী যোগেন চৌধুরীর হাসপাতাল যাওয়াও শুরু হয়েছিল ঘন ঘন। খুব ঘনিষ্ঠ বৃত্তবাসীরা ছাড়া এই একটি বছর পরিচিতজনেরা তাঁকে দেখতে পাননি সে ভাবে। অথচ যোগেন চৌধুরী তাঁর মারণ ব্যাধি বা রোগযন্ত্রণা নিয়ে কখনও বলতেনও না কিছু। শুধু বলতেন, ‘সময়টা ভাল যাচ্ছে না’।
ব্যক্তিগত অসুস্থতার সময়টিকে শুধু আড়াল করেই নয়, সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিক করে তুলে সেই সময়েই সৃষ্টি ও সুন্দরের অর্চনা— এ-ই নিশ্চিত ভাবে যোগেন চৌধুরীর জীবন ও শিল্পের দর্শন। যিনি মনে করতেন, বহতা সময়ের চিত্রকলাকে যেমন আর কোনও তত্ত্বে বা বাঁধা গতে আটকে রাখা চলছে না, সেই ভাবেই দেখা দরকার ভারতের শিল্পকেও— ভারত কোনও একক বা স্থির সত্তা নয়, ভারতীয়ত্বের ধারণাকেও কোনও চিরন্তন চক্রে আবদ্ধ করা চলে না: অজন্তা-ইলোরা যেমন ভারতীয়, মোগল মিনিয়েচার চিত্রও তেমনই, কালীঘাটের পটও ঠিক ততটাই।
১৯৩৯-এ, পূর্ববঙ্গের ফরিদপুরে জন্ম তাঁর। দেশভাগের পরে তাঁর পরিবার চলে আসে কলকাতায়, এ শহরেরই সরকারি আর্ট কলেজে তাঁর শিল্পশিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ, ১৯৬০-এ স্নাতক। এই সময়ের মধ্যেই তিনি নানা প্রদর্শনীতে পেয়েছিলেন একগুচ্ছ পুরস্কার ও পদক, জলরং ও তেলরং ছবি এঁকে। ষাটের দশকের মাঝামাঝি ফরাসি সরকারের বৃত্তি নিয়ে পাড়ি দেন প্যারিসের একোল ন্যাশনাল সুপেরিয়র দে বো-আর্টস-এ, বছর কয়েক ছিলেন সেখানে। এই সময়টায়, ফ্রান্স ছাড়াও ঘুরে দেখেছেন ইংল্যান্ড জার্মানি ইটালি স্পেন হল্যান্ড বেলজিয়াম অস্ট্রিয়া— শিল্প-ইতিহাস সমৃদ্ধ এক-একটি দেশ। দেশে ফিরে এই প্রশ্ন ভাবাতে থাকে তাঁকে— ইউরোপে দেখা প্রাচীন বা আধুনিক শিল্পকলাকে আত্মস্থ করেই কি সৃষ্টি হবে ‘আধুনিক ভারতীয় শিল্পকলা’র পথ, ‘না আমাদের রাস্তা অন্য কিছু?’ কী আঁকছি কেন আঁকছি লেখাটির জন্মবীজও এখানেই, ফিরে পড়লে বোঝা যাবে তাঁর সুদীর্ঘ শিল্পজীবনের বহুস্তরী ও বহুমুখী যাত্রাপথটি। ধারাবাহিক ভাবে বেরোয় দেশ পত্রিকায়, ১৯৯৪-এ।
হাওড়া জেলা স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন, চেন্নাইয়ে উইভার্স সার্ভিস সেন্টারে চাকরি করেছেন আর্ট ডিজ়াইনার হিসেবে, দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভবনের সংগ্রহশালায় ‘কিপার অব আর্ট’ পদে কাজ করেছেন দেড় দশক। ১৯৮৭ সালে চলে আসেন তাঁর প্রিয় শান্তিনিকেতনে, কলাভবনের অধ্যাপনায়। সেখান থেকেই অবসর। কিন্তু ছবি আঁকায় আর সেই সঙ্গে লেখালিখি থেকে অবসর নেওয়ার প্রশ্নই ছিল না, তা চলেছে জীবনভর। সংসদীয় রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন কিছুকাল, তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে রাজ্যসভার সংসদ হিসেবে। জীবনের শেষপর্বে কলকাতায় তৈরি করেছেন ‘চারুবাসনা, যোগেন চৌধুরী সেন্টার ফর আর্টস’। সাধারণ মানুষ সাহিত্য সঙ্গীত নাটক সিনেমার রসাস্বাদন করেন যে ভাবে, ভিজ্যুয়াল আর্টস-এর ‘অ্যাপ্রিসিয়েশন’ ততটা করেন না, ওঁর আক্ষেপ ছিল। সেই দূরত্ব ঘোচাবে এই শিল্পকেন্দ্রটি; সেখানে চিত্তপ্রসাদ বা সুনয়নী দেবীর নামাঙ্কিত গ্যালারিতে প্রবীণ-নবীন শিল্পীদের কাজের প্রদর্শন হবে, মানুষ আসবেন, দেখবেন, কথা বলবেন, ভাবনার বিনিময় হবে— এই লক্ষ্যে।
লেখকেরা লেখকদের জন্যই ভাবেন, গায়কেরা গায়কদের জন্য; কিন্তু চিত্রকলার বোঝার এলেম নেই তাই শিল্পীদের জন্য কেউ ভাববে না, এ ভাবনা ওঁর কাছে দুঃসহ ছিল। আত্মজনেরা জানেন, শিল্প ও শিল্পীর উন্নতি ও প্রগতির জন্য সাংগঠনিক কাজেকর্মে তাঁর কোনও ‘না’ ছিল না— তা সে সম্ভাবনাময় কোনও শিল্পীর প্রথম চিত্রপ্রদর্শনীর ভাবনা গুছিয়ে দেওয়া হোক, বা সত্তর দশকে ‘ক্যালকাটা পেন্টারস’ শিল্পী-গোষ্ঠীর অগ্রগমনে সহায়তা, কিংবা সাম্প্রতিক কালে বেঙ্গল বিয়েনাল-এর মতো বিরাট ব্যাপারের সংঘটন। ষাটের দশক থেকে শুরু করে এ শহরে ও দেশে-বিদেশে কত একক ও দলগত প্রদর্শনীতে তাঁর ছবি স্থান পেল, নিউ ইয়র্ক বা লন্ডনের শিল্প-নিলামে কর্তৃপক্ষ তাঁর উপদেশনা চাইলেন, এই সব নিয়েও ভাবিত ছিলেন না তিনি— ভাবতেন শিল্পের দর্শন ও শিল্পীর জীবন নিয়ে একত্রে, একসূত্রে।
ছবি আঁকার পাশাপাশি, এই ভাবনা থেকেই তিনি লিখে গিয়েছেন শিল্পীদের নিয়েও। সেই তালিকায় যেমন আছেন রবীন্দ্রনাথ, তেমনই চিত্তপ্রসাদ, কমলকুমার মজুমদার, সোমনাথ হোর, গণেশ হালুই, গণেশ পাইন, মকবুল ফিদা হুসেনও। নিছক লেখার জন্য লেখা নয়, ছবিকে ও শিল্পীদের গভীর ভাবে জানতে চাওয়ার এষণা থেকে লেখা। জোর দিয়েছেন শিল্পচর্চায় ‘ইভ্যালুয়েশন-এর পাশাপাশি ‘ডকুমেন্টেশন’কেও: “আজকে যাঁরা ছবি আঁকছেন, তাঁদের বলব, নিজের কাজের পাশাপাশি, সমসময়ের যাত্রীরা কোন পথে চলেছেন, কেন আর কোনখানে তাঁদের তাৎপর্যপূর্ণ মনে হচ্ছে, সে কথাটিও নথিবদ্ধ করে রাখুন; তাতে এটা বড়ো সময়ের ইতিহাস বেঁচে থাকে।”
যোগেন চৌধুরীর প্রথম একক চিত্রপ্রদর্শনী নিয়ে লিখেছিলেন কমলকুমার মজুমদার। এ যদি বা কারও কারও জানা, খুব কম লোকেই জানেন, কবিতা লিখতেন যোগেন চৌধুরী। হৃদয় ট্রেন বেজে ওঠে, তাঁর প্রথম কবিতাবইয়ের প্রকাশকের নাম শক্তি চট্টোপাধ্যায়! পরে পরে বেরোয় যোগেন চৌধুরীর কবিতা, মায়াবৃত্ত। এক চিত্রকরের নিভৃত কবিমনের উচ্চারণ সেখানে, “এখন সৌন্দর্য অনেক মনের মধ্যে তীব্র এবং ঘনীভূত/ তাছাড়া, ধুলোময়লায় জীবন এখন প্রচুর মলিন হয়ে আছে।”