জনমানসে বিজ্ঞানের প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে ১৮৭৫ সালে মোট নয়টি বিজ্ঞান-রচনা নিয়ে প্রকাশিত হয় উল্লেখযোগ্য একটি বই, বিজ্ঞানরহস্য। রচনাগুলি প্রথমে ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয় বঙ্গদর্শন পত্রিকায়। তাদের শিরোনাম: ‘আশ্চর্য্য সৌরোৎপাত’, ‘আকাশে কত তারা আছে?’, ‘ধূলা’, ‘গগনপর্য্যটন’, ‘চঞ্চল জগৎ’, ‘কত কাল মনুষ্য?’, ‘জৈবনিক’, ‘পরিমাণ রহস্য’, ‘চন্দ্রলোক’। এই অ-চিরাচরিত গ্রন্থের রচয়িতা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীদের গবেষণালব্ধ জ্ঞান-বিজ্ঞানের লেখা পড়ে ও আত্মস্থ করে বাংলায় সহজবোধ্য ভাষায় উপস্থাপন করেছিলেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল জনমানসে বিজ্ঞান-মানসিকতা ও কৌতূহলের উন্মেষ, সমসময়ের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির কথা সহজবোধ্য ভাষায় পাঠককে পৌঁছে দেওয়া— বিশেষত ছাত্রছাত্রী, শিক্ষিত যুবা, সমাজের নারী-পুরুষদের মধ্যে।
আজও অনেকের কাছে অজানা এ-তথ্য— ‘সাহিত্যসম্রাট’ বঙ্কিমচন্দ্র মাতৃভাষায় সাধারণ মানুষের বোধগম্য বিজ্ঞান-রচনাও লিখেছিলেন। এগুলির অধিকাংশই ছিল সতেরো থেকে উনিশ শতকের ইউরোপীয় বিজ্ঞানচিন্তার আলোয় লেখা: ব্লেজ় পাস্কাল, চার্লস লাইয়েল, জন টিন্ডল, টি এইচ হাক্সলি, নরম্যান লকিয়ার প্রমুখ বিজ্ঞানীর ভাবনা— জীববিজ্ঞান, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব, নৃতত্ত্বের মতো নানা বিষয়ে। লেখাগুলি মূলের সরাসরি অনুবাদ নয়, বরং ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের নিজস্ব ব্যাখ্যা, উপস্থাপনা। সাহিত্য ছাড়াও সমসাময়িক বিজ্ঞান সম্পর্কেও যে তাঁর গভীর আগ্রহ ও মনোযোগ ছিল, তারই প্রমাণ।
বিজ্ঞানরহস্য প্রকাশের একই বছরে বঙ্গদর্শন-এ প্রথম প্রকাশিত হয় বঙ্কিমচন্দ্রের অমর সৃষ্টি ‘বন্দে মাতরম্’। পরে তিনি একে আনন্দমঠ উপন্যাসের অন্তর্ভুক্ত করেন। ‘বন্দে মাতরম্’ পরাধীন ভারতবর্ষে দেশপ্রেম ও স্বাধীনতা সংগ্রামে মানুষকে কেমন উদ্দীপ্ত ও প্রাণিত করেছিল তা জানা সকলেরই। এ কথাও নির্দ্বিধায় বলা যায়, বন্দে মাতরম্ বা বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যকর্মগুলি সম্পর্কে বাঙালির অভিনিবেশ যতটা, ইতিহাস নৃতত্ত্ব সমাজতত্ত্ব ধর্মচিন্তার অঙ্গনে তাঁর চর্চা তত পরিচিত নয়— আর তাঁর বিজ্ঞান বিষয়ক রচনাগুলিই বোধ হয় সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। স্বাভাবিক ভাবেই এই রচনাগুলি ক্রমশ বিস্মৃতির অন্ধকারে চলে গেছে। তবু বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার প্রসারে বিজ্ঞানরহস্য গ্রন্থের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অস্বীকারের উপায় নেই।
অথচ আমরা দেখি, বিশ শতকের শেষ দিকে ১৯৯৪ সালে ভবতোষ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত বঙ্কিমচন্দ্র: এসেজ় ইন পার্সপেক্টিভ গ্রন্থে বঙ্কিমচন্দ্রের জীবন ও কর্মের পুনর্মূল্যায়ন করা হলেও সেখানে বঙ্কিমচন্দ্রের জনপ্রিয় বিজ্ঞান বিষয়ক কোনও রচনা নিয়ে আলোচনা স্থান পায়নি। বিজ্ঞানরহস্য বঙ্কিমচন্দ্রের জীবদ্দশাতেই ১৮৮৪ সালে পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল। তাই এমন ধারণা করা অমূলক হবে না— বইটি নিশ্চিত ভাবেই পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র যে বিজ্ঞানকে কেবল জ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে দেখেননি, তাকে সমাজের মানসিক ও বৌদ্ধিক বিকাশের শক্তিশালী মাধ্যম বলেও মনে করতেন— সে-কথাও নিশ্চিত ভাবে বলা চলে।
ঔপনিবেশিক বাংলায় লেখক-সাহিত্যিকদের মধ্যে জনপ্রিয় বিজ্ঞানচর্চার ধারায় বিশেষ অবদান ছিল অক্ষয়কুমার দত্ত ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের। তাঁদের রচনা শিক্ষিত সমাজে বিজ্ঞানবোধ জাগ্রত করার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সে সময় ভারতে আধুনিক বিজ্ঞান-সংস্কৃতির ঐতিহ্য গড়ে না ওঠার জন্যেই সমাজে যুক্তিবাদী বৈজ্ঞানিক মানসিকতার বদলে অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার, গোঁড়ামি ও বৌদ্ধিক জড়তা গেড়ে বসেছিল, সমাজমনকে দুর্বল করে তুলেছিল। বঙ্কিমচন্দ্র মনে করতেন, বিজ্ঞান শুধু জ্ঞানচর্চার বিষয়মাত্র নয়— জাতীয় পুনর্জাগরণ, সামাজিক অগ্রগতি এবং বৌদ্ধিক মুক্তিরও অন্যতম ভিত্তি। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞান আসলে সংস্কৃতিরই একটি অঙ্গ; বিজ্ঞানচর্চা মানুষকে কুসংস্কারের বন্ধন থেকে মুক্ত করতে পারে, যুক্তি ও বুদ্ধির পথে এগিয়ে দিতে পারে। তাঁর কাছে বিজ্ঞান এমন এক অনুসন্ধান-পদ্ধতি, যা যুক্তি, পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার সমন্বয়ে সত্যকে উদ্ঘাটন করে। পরবর্তী কালে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করে তোলার ধারাটিকে বেগবতী, সমৃদ্ধ করেছেন। উল্লেখ্য যে, ডা. মহেন্দ্রলাল সরকারের উদ্যোগে ঔপনিবেশিক বিজ্ঞান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ভাবে ভারতে আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার কেন্দ্র ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অব সায়েন্স’ স্থাপনের উদ্যোগকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানান বঙ্কিমচন্দ্র, সাহায্যও করেছিলেন সে-কাজে।
বঙ্কিমচন্দ্রের বিজ্ঞান-ভাবনা ও বিজ্ঞান বিষয়ক রচনাগুলি তাই বাংলা নবজাগরণের ইতিহাসে যুক্তিবাদী চিন্তার এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। বিজ্ঞানমনস্কতার প্রবক্তা বঙ্কিমচন্দ্রকেও আজ নতুন করে আবিষ্কার করা প্রয়োজন। ‘বন্দে মাতরম্’ ও আনন্দমঠ-এর স্রষ্টাকে স্মরণ করার পাশাপাশি জরুরি তাঁর বিজ্ঞানরহস্য-কেও নতুন করে আলোচনায় আনা। বঙ্গীয় তথা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বঙ্কিমচন্দ্র যেমন আমাদের ইতিহাসের অংশ, তেমনই যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানমনস্কতার বঙ্কিমচন্দ্রও বাঙালির নবজাগরণের এক অবিসংবাদিত পুরোধা। সেই অনালোচিত বঙ্কিমচন্দ্রের পুনরাবিষ্কার জরুরি।