অনশনের একুশ দিনের মাথায় সোনম ওয়াংচুককে দিল্লি পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়ে দিল্লির সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছিল। তার পরেই দিল্লির যন্তর মন্তরে যে ভিড়টা উপচে পড়ল, তাঁদের গড় বয়স কুড়ি থেকে পঁচিশ বছর। বেশির ভাগই দিল্লির বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, গবেষক। বারো বছর আগে নরেন্দ্র মোদী প্রথম বার দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। সে সময় এই তরুণ-তরুণীরা আট থেকে তেরো বছর বয়সি। অর্থাৎ, তাঁরা কেউই ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ভোট দেননি। অনেকে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রথম বার ভোট দিয়েছেন। নিট-এর প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলনে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির অনেক পড়ুয়াও যোগ দিয়েছিলেন। তাঁদের বয়স আঠারো ছুঁই-ছুঁই। তাঁরা ২০২৯ সালে প্রথম বার লোকসভা নির্বাচনে ভোট দেবেন।
২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় থেকে নরেন্দ্র মোদী বিজেপির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সম্পদ। তাঁর অতিমানবীয় ভাবমূর্তি বিজেপির তুরুপের তাস। তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ভোট শুরুর আগেই অর্ধেক বাজিমাতের হাতিয়ার। কিন্তু যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির ৩৬ দিনের আন্দোলনে এই জেন জ়ি-র হাতের পোস্টার, ব্যানারে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে যে কটাক্ষ, সমালোচনা ও ক্ষোভ ফুটে উঠল, তা দেশের রাজধানীর বুকে এ-যাবৎ দেখা যায়নি।
বিজেপি ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে শরিকদের সমর্থনে সরকার গঠন করেছে। আগামী লোকসভা নির্বাচনে এই জেন-জ়ি’র ভোট হারানোর ভয়ে নরেন্দ্র মোদীর সরকারে একটি অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটল। যা গত ২৪ বছরে হয়নি। গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মোদীর ১২ বছরের বেশি ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১২ বছর— এই পুরো সময়ে, রাজ্যে হোক বা কেন্দ্রে, তাঁর মন্ত্রিসভা থেকে কোনও মন্ত্রী রাজনৈতিক বা জনগণের চাপের মুখে ইস্তফা দেননি। ধর্মেন্দ্র প্রধান প্রথম।
দেশের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, নরেন্দ্র মোদীকে মাথা নত করতে বাধ্য করা জেন-জ়ি’র এই আন্দোলনের রাজনৈতিক ফলাফল কী হবে? বিরোধীরা কি এর সুফল পাবেন? না কি অরাজনৈতিক আন্দোলনে সাড়া দিয়ে নরেন্দ্র মোদী তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীদের অপ্রাসঙ্গিক করে দেবেন? নিজের পায়ের তলার রাজনৈতিক জমি আরও শক্তপোক্ত করে ফেলবেন?বিজেপি শিবির মানছে, এই ঘটনা মোদীর ভাবমূর্তিতে বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে। তবে এর ফলে রাজনৈতিক ক্ষতি হবে না বলেই বিজেপির বিশ্বাস। কারণ রাহুল গান্ধী বা ইন্ডিয়া জোটের নেতৃত্বে যন্তর মন্তরের আন্দোলন হয়নি। বরং কংগ্রেস ককরোচ জনতা পার্টির থেকে দূরত্ব রেখেই চলেছে। রাহুলের মত ছিল, মোদী সরকারের বিরুদ্ধে জমে ওঠা ক্ষোভ ভোটের বাক্সে গিয়ে পড়া দরকার। ভোটের আগেই সড়কের আন্দোলনে অসন্তোষের হাওয়া বেরিয়ে গেলে বিজেপিরই লাভ।
আবার সমাজবাদী পার্টি, বাম দলের নেতারা যন্তর মন্তরের মঞ্চে গিয়েছেন। কারণ তাঁদের মনে হয়েছে, এতে বিরোধী শক্তিরই বহর বাড়বে। যদিও বিরোধী শিবির তরুণদের আন্দোলনের লাগাম নিজের হাতে তুলে নিতে পারেনি। রাহুল গান্ধীর বদলে যদি ককরোচ জনতা পার্টি বা তরুণ প্রজন্মের নামগোত্রহীন ভিড়ের হাতে সরকার বিরোধিতার রাশ থাকে, তা হলে বিজেপিরই সুবিধা। বিজেপি দেখাতে পারে, তরুণ প্রজন্ম মোদী সরকারের সামনে দাবি তুলেছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী তাতে সাড়া দিয়েছেন। এর মধ্যে কংগ্রেস বা বিরোধীদের কোনও প্রাসঙ্গিকতাই নেই।
এর উল্টো যুক্তি হল, ২০১২ সালে দিল্লিতে নির্ভয়া-র গণধর্ষণের বিরুদ্ধেও এমন তরুণ প্রজন্মের নামগোত্রহীন ভিড়ই আন্দোলনে নেমেছিল। তার আগে ২০১১ সালের অণ্ণা হজারে, অরবিন্দ কেজরীওয়ালদের দুর্নীতি-বিরোধী আন্দোলন দেশের মধ্যবিত্ত মানুষের মধ্যে সাড়া ফেলেছিল। ইউপিএ সরকারের জমানায় এই দুই আন্দোলনেরই সুফল তুলেছিল বিজেপি। তার সুফল কুড়িয়েই নরেন্দ্র মোদী ২০১৪-য় প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। পরবর্তী কালে দুর্নীতি-বিরোধী আন্দোলন থেকে আম আদমি পার্টির জন্ম হওয়াতেও বিজেপির সুবিধা হয়েছিল। জেন-জ়ি’র আন্দোলন থেকেও কংগ্রেস একই রাজনৈতিক সুফলের আশা করছে। তরুণ প্রজন্ম, এমনকি স্কুলের গণ্ডি না পেরোনো প্রজন্মও যে ভোটের হাওয়া ঘুরিয়ে দিতে পারে, তার সাম্প্রতিক উদাহরণ তামিলনাড়ুর ভোট। সেখানে তরুণরা ডিএমকে-র বদলে ‘তলপতি’ বিজয়ের দলকে ভোট দিয়েছে। স্কুলের কিশোর-কিশোরীরা বাবা-মাকে বিজয়কে ভোট দিতে চাপ দিয়েছে।
ভোট-ব্যাঙ্ক হারানোর ভয়ে নরেন্দ্র মোদী এই প্রথম পিছু হটলেন, এমন নয়। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার এক বছরের মধ্যে জমি অধিগ্রহণ আইনের সংশোধন করতে চেয়েও তাঁকে পিছু হটতে হয়েছিল। শিল্পপতিদের স্বার্থে তাঁর ‘স্যুট-বুট কি সরকার’ কাজ করছে, গোড়াতেই এমন ধারণা তৈরি হোক, তা মোদী চাননি। দিল্লির সীমানায় এক বছর ধরে কৃষক আন্দোলনের পরে উত্তরপ্রদেশের ভোট এসে পড়ায় কৃষি আইন প্রত্যাহার করেছেন। নরেন্দ্র মোদীর জনপ্রিয়তা অক্ষুণ্ণ রাখতে এর আগেও বহু মন্ত্রীকে বিদায় নিতে হয়েছে। যেমন কোভিডের পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদ থেকে হর্ষ বর্ধন ও স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী অশ্বিনী চৌবে, দু’জনকেই সরানো হয়েছিল। শ্লীলতাহানির অভিযোগের পরে এম জে আকবরকে সরানো হয়েছে। তবে সে সব ক্ষেত্রে কাকে, কখন সরানো হবে, তা মোদী নিজে ঠিক করেছেন। রাজনৈতিক চাপের ফলে নয়।
বস্তুত, মোদী সরকারের ঘোষিত নীতিই ছিল, মন্ত্রীরা ইস্তফা দেবেন না। ইউপিএ জমানায় কেন্দ্রে ও রাজ্যে কংগ্রেসের বহু মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। শিবরাজ পাটিল, নটবর সিংহ, অশ্বিনী কুমার, বিলাসরাও দেশমুখ, অশোক চহ্বাণ, শশী তারুর, বীরভদ্র সিংহ, পবন বনসল, তালিকা দীর্ঘ। বিজেপির এত দিন মত ছিল, এত নেতা-মন্ত্রী বলিপ্রদত্ত হলেও কংগ্রেসের লাভ হয়নি। বরঞ্চ বিরোধীদেরই রাজনৈতিক শক্তি বেড়েছে। এখন সেই ঘোষিত অবস্থান থেকে সরে যাওয়ায় মোদী সরকারের রাজনৈতিক দুর্বলতাই ফুটে উঠেছে। বিজেপির একটা বড় অংশ মনে করছে, দেরি না করে আগেই ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অন্য মন্ত্রকে সরিয়ে দেওয়া যেত। বা সোনম ওয়াংচুক অনশনে বসার পরেই ককরোচ জনতা পার্টির সঙ্গে দৌত্য শুরু করা যেত।
তা না করার পিছনে একটি প্রধান কারণ, নরেন্দ্র মোদী সরকারের আত্মবিশ্বাস। যাকে বিরোধীরা অহংবোধ বলেন। দ্বিতীয় কারণ তৃতীয় মোদী সরকারে অমিত শাহের ক্রমবর্ধমান দাপট। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ২৪০টি আসনে আটকে গিয়ে হোঁচট খেয়েছিল। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে অমিত শাহ হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, দিল্লি, বিহার এবং শেষে পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে বিজেপিকে জয় এনে দিয়েছেন। তার পরে একের পর এক বিরোধী দলে ভাঙন ধরিয়ে অমিত শাহ ও তাঁর অনুগামী ভূপেন্দ্র যাদবের মতো নেতারা সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার লক্ষ্য পূরণে ব্যস্ত ছিলেন। যাতে মর্জিমাফিক সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করানো যায়। রাজনৈতিক বিরোধীরাই যখন কোণঠাসা, তখন নেট-দুনিয়ায় তৈরি একটি অরাজনৈতিক আন্দোলন স্বাভাবিক ভাবেই অমিত শাহের কাছে গুরুত্ব পায়নি। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল লাদাখে সোনম ওয়াংচুকের অনশন, আন্দোলন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে অমিত শাহ আগেও সামলেছেন। তাই সেই অনশনও তাঁকে চিন্তায় ফেলেনি। কোনও ক্ষেত্রেই হিসেব মেলেনি।
গত ১২ বছরে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন হলেই একটি পাল্টা প্রচার হয়েছে। তা হল, এর পিছনে বিদেশি মদত রয়েছে। সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলনের সময় পাকিস্তানি মদতের অভিযোগ উঠেছে। কৃষক আন্দোলনের পিছনে খলিস্তানি জুজু দেখানো হয়েছে। এ বার সোনম ওয়াংচুক অনশনে বসার পরেও ওয়টস্যাপে বার্তা ছড়িয়েছে, মোদী সরকার এনজিও-দের জন্য বিদেশি অনুদানে রাশ টানতেই ক্ষুব্ধ সোনম অনশন করছেন। যেন সোনম ধরে নিয়েছিলেন, তিনি অভিমান করে দু’দিন ভাত না খেলেই মোদী সরকার বিদেশি অনুদানে ছাড়পত্র দিয়ে দেবে!
আশার কথা হল, যন্তর মন্তরে ভিড় জমানো জেন-জ়ি ওয়টস্যাপ পড়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়নি। কোনও আজব যুক্তিতে বিশ্বাস করেননি। ‘অন্ধভক্ত’ না হয়ে নিজের বিচারবুদ্ধি কাজে লাগিয়েছেন। অতিভক্তি যদি চোরের লক্ষণ হয়, তা হলে অন্ধভক্তি নিশ্চিত ভাবেই মূর্খতার লক্ষণ।