বিজ্ঞাপনের চমকদারি নয়। যেখানে বলা হয় বিনামূল্যে জিনিসটি নিন, তার পর তিন মাস পর থেকে মাসিক এত টাকা করে দেবেন, বা এ রকম হাজার রকমের জিনিস বেচার কৌশল। কিন্তু সত্যিই সরকার চাইলে প্রায় কোনও খরচ না করেই পরিবেশ অনেকটাই উন্নত করে ফেলতে পারে।
কিছু বছর আগে বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে শব্দদূষণ নিয়ে একটি সমীক্ষা করেছিলাম। নিম্ন আয়ের পরিবারের ছাত্রদের থেকে শব্দদূষণের একটি বড় অভিযোগ ছিল পাশের ঘরের ঝগড়াঝাঁটি, গাড়ির হর্ন বা পাড়ার মাইক নয়। এই নিত্য দিনের হইচই অন্য শব্দের দূষণকে বোধ হয় সহনীয় করে রাখে। এ দূষণ বন্ধ করা অনেক বড় সামাজিক অর্থনৈতিক বিষয়। কিন্তু আমাদের চার দিক যদি আরও কিছুটা শব্দহীন হয়, তখন আমাদের নিজেদের রোজকার শব্দকল্পদ্রুম হয়তো নিজেরাই হ্রাস করে আনব ধীরে ধীরে। যেমন— কোনও শান্ত পরিবেশে গিয়ে, মন্দির বা গ্রন্থাগারে গিয়ে আমরা নিচু গলায় কথা বলি। আর সেই কাজটিই করে ফেলা যায় অনেকটাই নিখরচায়, রাস্তায় গাড়ির হর্ন বাজানো বন্ধ করে।
ভারতীয় মোটরযান আইন ১৯৮৮-এর (২০১৯-এ সংশোধিত) ১৯৪এফ ধারা অনুযায়ী, অকারণে হর্ন বাজালে প্রথম বার এক হাজার টাকা জরিমানা ও পরবর্তী আইন ভঙ্গে দু’হাজার টাকা জরিমানা। ‘অকারণ’-এর অর্থ যে কোনও বিশেষ বিপদ থেকে সতর্ক করা ছাড়া হর্ন বাজানো। এই আইন সরকার প্রয়োগ করলে শুধু পরিবেশ ভাল হবে না, সরকারের আয়ও হবে। অবশ্যই আইন প্রয়োগের প্রথম শর্ত, তা প্রয়োগের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা করা। আদালতে হর্ন বাজানোর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে হলে এক জন পুলিশ আধিকারিকের সাক্ষ্য প্রয়োজন। এই পুলিশ আধিকারিককে সাহায্য করতে পারে বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। হর্ন বাজানোর বদভ্যাসের খুব ব্যবহার হয় ট্র্যাফিক আলোর মোড়গুলিতে। সেখানে রাস্তার দু’পাশে ছাত্রছাত্রীরা থাকবে পোস্টার নিয়ে, আর পুলিশ আধিকারিককে সাহায্য করবে কে হর্ন বাজাল, তা চিহ্নিত করতে। সকাল বিকাল দু’বেলা এটা এলাকার বিদ্যালয়গুলির বিভিন্ন শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের পালাক্রমে পরিবেশ উন্নয়নের ক্ষেত্র সমীক্ষা (ফিল্ডওয়ার্ক) হিসাবে গণ্য হবে, ছাত্রছাত্রীরা টিফিন আর শংসাপত্র পাবে পুলিশ দফতর থেকে। ট্র্যাফিক আলোর মোড় ছাড়াও রাস্তার একটি বড় শব্দদূষণের উৎস হল, বাস দ্রুত যাওয়ার জন্য ক্রমাগত হর্ন বাজাতে থাকে। এ ভাবে কলকাতা শহরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা বিদ্যালয়গুলি তাদের অঞ্চলে পুলিশের সহায়তায় এই কার্যক্রম শুরু করবে। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে এই অভিজ্ঞতা ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের বাড়ির পাড়ার কোলাহল নিয়েও সচেতন করে তুলবে। কলকাতা শহরে এখন গাড়ি যথেষ্ট ট্র্যাফিক আলোর নিয়ম মেনে চলে, মধ্য রাতে ফাঁকা রাস্তাতেও লাল আলোয় দাঁড়িয়ে যায় গাড়ি। কারণ একটাই, কেউ ট্র্যাফিক আলোর নিয়ম ভঙ্গ করলেই এখন ক্যামেরায় তার ছবি উঠে যায়, জরিমানার নোটিস চলে যায় মোবাইল ফোনে বা অনলাইনে। একই ভাবে হর্ন বাজালে হাজার-দু’হাজার টাকা জরিমানা হতে থাকলে কেউ আর শহরে হর্ন বাজাবে না কিছু দিন পরেই। এ রকম নিখরচায় পরিবেশ উন্নয়ন করতে পারে নতুন সরকার। আর কলকাতায় শব্দ-জব্দ হলে জেলা শহরগুলি নিশ্চয়ই পিছিয়ে থাকবে না। এক বার হর্ন বাজানো বন্ধ হলে সেটাই অভ্যাস হয়ে যাবে, মেট্রো রেলে নোংরা না ফেলার মতো।
শব্দদূষণের আর একটি বিষয়, ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে যথেচ্ছ মাইকের ব্যবহার। বাড়িতে বিয়ে, পুজো, নামকীর্তন, অন্যান্য উৎসবে সারা দিন তারস্বরে মাইক বাজানো চলে নির্দ্বিধায়। কেউ অভিযোগ না করলে স্থানীয় পুলিশের এ বিষয়ে মাথাব্যথার কোনও কারণ থাকে না। পুলিশে তেমন অভিযোগ হয় না, কারণ জানাজানি হলে পড়শির সঙ্গে মনোমালিন্য সুখকর নয়, কারও আবার ‘দাদার জোর’ আছে। কিন্তু সরকার যদি একটি বিশেষ ফোন সংখ্যার ব্যবস্থা করে, যেখানে খবর দিলেও তার উৎস জানানো হবে না, তা হলে অনেক অভিযোগ আসবে। দেশের আইন অনুযায়ী রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত মাইক বাজানো নিষিদ্ধ। বাড়ির অনুষ্ঠানে মাইক বাজালে তার শব্দমান বাইরে ৬৫ ডেসিবেলের বেশি হবে না। অবশ্যই বড় ধর্মীয় উৎসবে এতটা নিয়ন্ত্রণ ঠিক নয়, তাতে উৎসবের অনুভূতিই থাকে না। জাপানের মতো শব্দনিয়ন্ত্রিত দেশেও শিন্টো ধর্মীয় উৎসবে বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে সশব্দ মিছিল এলাকা পরিক্রমা করে, মাইকে উচ্চস্বরে গান বাজে। নববর্ষে পশ্চিমের দেশগুলিতে মধ্যরাতের আকাশছোঁয়া বাজির ফোয়ারায় কম শব্দ হয় না। এ সবই ব্যতিক্রম। আমাদের বড় উৎসবের দিনগুলিতে সকাল ১০টা থেকে ১২টা ও সন্ধ্যা ৬টা থেকে ১০টা মাইক বাজানো যেতেই পারে। রাজনৈতিক পথসভাগুলির শব্দদাপট কম নয়। এ সব সভার সময় সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৯টা এবং অনুষ্ঠান অঞ্চলের বাইরে মাইক লাগানো নিষিদ্ধ করতে হবে। অর্থাৎ, ছোট একটি মঞ্চ বানিয়ে পথসভা, অথচ পঞ্চাশটি মাইক লাগানো হয়েছে কয়েকশো মিটার দূর পর্যন্ত, তা বন্ধ করতে হবে। শব্দদূষণের জরিমানা বেশ অনেক হতে পারে, এক হাজার টাকা থেকে এক লক্ষ টাকা। পুলিশ হাতে ডেসিবেল মিটার নিয়ে ঘোরাঘুরি করে কিছু জরিমানা করলেই শব্দদূষণ কমে যাবে অনেকটাই। এ ভাবে সরকার সক্রিয় হলে আমরা পেতে পারি শব্দ দূষণমুক্ত শান্ত সমাজ। আর এ সবে সরকারের খরচা একেবারেই শূন্য, বরং কিছু আয় হতে পারে।
সম্প্রতি কলকাতা পুরসভা নতুন করে রাস্তাঘাটে নোংরা ফেললে তৎক্ষণাৎ জরিমানা একশো থেকে দু’শো টাকা ঘোষণা করেছে। আগে কলকাতা পুরসভার রাস্তা নোংরা করার জরিমানা ছিল পাঁচশো টাকা থেকে শুরু। ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় আইন পাশ হয় যে, রাস্তায় নোংরা ফেললে জরিমানা হবে পাঁচ হাজার টাকা। এ সব হঠাৎ কিছু হুজুগ ছাড়া কতটা কার্যকর হয়, তা অজানা। কিন্তু পুরসভা জরিমানা করার আগে আমরা কি পুরসভাকেই জরিমানা করতে পারি? ধরুন, আপনি ঝালমুড়ি খেতে খেতে চলেছেন, খাওয়া শেষে ঠোঙাটা ফেলবেন কোথায়? ঠোঙা ফেললেই জরিমানা, অথচ ধারেকাছে কোনও ডাস্টবিন পাওয়া যাবে না। ফলে আপনাকে পকেটে নিয়েই ঘুরতে হবে সেই বর্জ্যকে। এই সমস্যা আরও কয়েক সহস্র কলকাতার মানুষের। সুতরাং, কলকাতার কয়েক সহস্র মানুষকে দূষণ সংক্রান্ত সমস্যায় ফেলার জন্য অবশ্যই আপনি কলকাতা পুরসভার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন। কলকাতা পুরসভার সরকারি হিসাবে, কলকাতার বড় রাস্তার মোট দৈর্ঘ্য ১৮৫০ কিলোমিটার, অপ্রধান পথের দৈর্ঘ্য ২৭৮৬ কিমি। কিছু অপ্রধান পথকে ধরে অন্তত ২৫০০ কিমি পথে আজই ডাস্টবিন বসানো উচিত। প্রতি ১০০ মিটারে একটি ডাস্টবিন ধরে এখনই প্রয়োজন পথের দু’ধারে পঞ্চাশ হাজার ডাস্টবিন। পৃথিবীর সব শহরেই এ রকমই পথে ডাস্টবিন থাকে।
কিন্তু এর জন্য খরচ পুরসভাকে করতে হবে না। আধুনিক প্লাস্টিক ডাস্টবিনের দাম এক সঙ্গে অনেক কিনলে পাঁচশো টাকা মতো। পঞ্চাশটি কোম্পানি এই ডাস্টবিনের জন্য আর্থিক সহায়তা করলে এক-এক জনের খরচ হবে পাঁচ লক্ষ টাকা, আর তার বদলে এক-এক জন এক হাজার ডাস্টবিনের গায়ে বিজ্ঞাপন দিতে পারবেন। এটি অনেক কোম্পানি তাদের কর্পোরেট সামাজিক দায়িত্ব থেকেই করতে পারবে। পুরসভার দায়িত্ব এগুলি নিয়মিত পরিষ্কার রাখা। পুরসভার দায়িত্ব রাস্তা ফুটপাত পরিষ্কার রাখা, সেখানের বর্জ্যই জমা হচ্ছে ডাস্টবিনে, ফলে অতিরিক্ত কোনও কাজ পুরসভাকে করতে হচ্ছে না। সুতরাং, নিখরচায় পরিবেশ উন্নয়ন।
সাধারণ মানুষের কাছে রোজকার জীবনের কিছু বড়সড় পরিবর্তনে সরকারের কাজের সাফল্য অনেকটাই প্রতিভাত হয়। একটি পরিষ্কার, শান্ত শহর, একেবারে নিখরচায় উপহার দিতে পারে সরকার। ফলে অর্থ নয়, সেই বোধের প্রয়োজন সরকারের উপযুক্ত চিন্তক গোষ্ঠীর এবং প্রয়োজন প্রশাসনের সক্রিয় পদক্ষেপ। নিখরচায় পাওয়া এই পরামর্শ পরিবেশ ও সরকারের মুখ উজ্জ্বল করতে পারে বইকি।