বইগুলো ফেলে দিয়ো না ভাই! এটাই কি এ বার পুজোর থিম? অপেক্ষা করছি কবে কোন এক গানওয়ালা সুর দেবে এই কয়েকটি শব্দে।
এক জন ক্ষীণকায় বৃদ্ধ বই ছুড়তে থাকা এক যুবকের কাঁধে হাত দিয়ে বলছিলেন ‘বইগুলো ছুড়ে ফেলো না ভাই!’ কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন একটু শিথিল হল যুবকের মুখের পেশি। হয়তো বৃদ্ধের স্পর্শ তার বই বগলে স্কুলে যাওয়ার দিন মনে করিয়ে দিল। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডই। তার পরে আবার সে ছুড়তে লাগল— রাশি রাশি বই এধার ওধার জুড়ে এলোমেলো রাস্তায়। আচ্ছা, ওরা তো ‘সনাতনী’, ছোটবেলায় ওদের ঠাকুমা, দাদু বা দিদিমা কেউ বলেননি বইয়ে সরস্বতী থাকেন?তবে যে বহু নাস্তিককেও বইয়ে পা রাখলে প্রণাম করতে দেখেছি?
বুলডোজ়ার দাঁড়িয়ে ছিল বই-এর স্টল গুঁড়িয়ে দেবে বলে। ঘটনাচক্রে এই কালো রাত্রির সাক্ষী হয়ে পড়েছিলাম সে দিন সপ্তমীর রাতে। সবে খবর এসেছে চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে মারা গেছেন সহনাগরিক। ভারী মন নিয়ে বসে আছি, হঠাৎ খবর পেলাম যাদবপুর ৮বি-র সামনে মস্ত বুলডোজ়ার হাজির হয়েছে পর পর বইয়ের স্টল ভাঙবে বলে।
এত দিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখছি বইয়ের দোকান ভাঙার হুমকি, কিন্তু চোখের সামনে বুলডোজ়ার দিয়ে হাজার হাজার বই গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে, এ-হেন দৃশ্য চোখের সামনে দেখার অভূতপূর্ব সুযোগ হেলায় হারাতে চাইলাম না। তাই কয়েক কিলোমিটারের দীর্ঘ ট্র্যাফিক জ্যাম পেরিয়ে হাজির হয়ে গেলাম যাদবপুর। গলিতে পর পর বই-এর স্টল, মাঝে গেরুয়া পতাকায় মোড়া একটি স্টল, এবং একদম শেষের স্টলটি সিপিআইএম-এর। গোটা এলাকা তত ক্ষণে থমথমে, সামনে বিষণ্ণ মুখে ছাত্রছাত্রী, এলাকার লোক । গলির মুখে বুলডোজ়ার, পুলিশ ভ্যান। চার দিকে জলপাই রঙের জামা পরা কেন্দ্রীয় বাহিনী। মনে হল বিশাল কোনও যুদ্ধের প্রস্তুতি। রাশি রাশি বই আর লাল কাপড়ে মোড়া সেই বই-এর আবাসস্থলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।
সেই রাতে চোরবাগানের গলিতে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। সে দিনও প্রশাসন এবং পুলিশ মনে করেছে বই-ই তাদের আসল শত্রু। বইকে কত গুরুত্বপূর্ণ ভাবলে, এমন দিনে শয়ে শয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে বই-এর দোকান ভাঙার জন্য ব্যস্ত করে রাখতে পারে একটা প্রশাসন?
এক দিক থেকে দেখলে যাদবপুর ‘ভাগ্যবান’, তাই বুলডোজ়ার পুলিশ কেন্দ্রীয় বাহিনী। যারা তা নয় তাদের জন্য পাড়ার গুন্ডারাই যথেষ্ট। বুলডোজ়ারের সামনে সকলে আমরা অপেক্ষমাণ, কখন যুদ্ধ শুরু হয়, ইতিমধ্যে সশব্দে গাড়ি থেকে নামলেন অফিসার-সহ পুলিশ বাহিনী। দেখলাম একতাড়া কাগজ নিয়ে এক দল লোক ছুটেছে পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে, ‘এই তো আমাদের বৈধ কাগজ আছে’, ‘এই তো আমরা কর্পোরেশনকে ট্যাক্স দিয়েছি তার ডকুমেন্ট’, ‘এই তো পুলিশকে থানাকে জানিয়েছি তার কপি’। কোনও কিছই নাকি যথেষ্ট নয়। কর্পোরেশনের লোক,থানার ওসি আজ স্টল ভাঙবেনই, উপর থেকে অর্ডার আছে। ‘ঠিক আছে ভাঙুন, আমরা কিছু বলব না কিন্তু লিখিত নির্দেশ দেখান’, ‘ভাঙার বৈধ অর্ডার দেখান’। না, অর্ডার দেখানোর দরকার নেই, পুলিশ বলছে, এটাই অর্ডার।
বাদানুবাদ চলছে রাত বাড়ছে। একটা সময় কোনও অর্ডার ছাড়াই শুরু হলো ভাঙার মহোৎসব। প্রথমে দূরে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা একটি স্টল দিয়ে শুরু। তার পর এপিডিআর-এর স্টলের উপর হামলা। বই ছত্রখান। মাঝের গেরুয়া কাপড়ে ঢাকা স্টলটি অক্ষত। তার পর এআইএসএ আর সিপিআইএম-এর স্টলের উপর হামলার প্রস্তুতি— সামনে দাঁড়িয়ে অসংখ্য যুবক যুবতী: ‘স্টল ভাঙার আগে আমাদের মারুন স্যর’! কয়েকশো মানুষ, সামনে রয়েছেন মহিলারা, ছাত্রীরা— স্টল আগলে মানব বন্ধন। শুরু হল সিআরপিএফ-এর লাঠিচার্জ। মেয়েরা আহত হচ্ছেন, তবু লড়ছেন না। স্লোগানে স্লোগানে খান খান হয়ে যাচ্ছে রাত্রির নীরবতা।
কতক্ষণ প্রতিরোধ চলেছে, খেয়াল নেই। ধীরে ধীরে আকাশে আলো ফোটার সময় হয়। ভোর ভোর পিছু হটে বাহিনী। ছত্রখান স্টলের ভিতর তখনও দাঁড়িয়ে আছেন মানুষজন— তাঁদের প্রিয় বইগুলোকে আগলে রাখতে। কালো রাত্রির সুকঠিন অর্গল ভাঙতে।