জেন-জ়ি আন্দোলনকে কি বলা যায় স্বতঃস্ফূর্ততার মানদণ্ডে লেটার মার্কস পাওয়া? চেনা রাজনীতির ছকের বাইরে গিয়েই গড়ে উঠল এই আন্দোলন, যার মূল দাবি সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা নিট-এর দুর্নীতির বিরুদ্ধে হলেও ওই আন্দোলনে যোগ দেওয়া জেন-জ়ি’দের বেনজির উপস্থিতি নতুন প্রজন্মের সামাজিক অসন্তোষকেও তুলে ধরেছে। গোটা দেশ জুড়েই যখন শিক্ষার বাজারদর বেড়ে চলেছে, তখন শিক্ষিত বেকারের কাজের অভাব আন্দোলনে ঘৃতাহুতি দিয়েছে। রাষ্ট্রের একাংশের বিদ্রুপ নতুন প্রজন্মের আত্মমর্যাদায় যে ঘা দিয়েছিল, তাতে অভাবিত এক আন্দোলন দুর্নীতির পাঁকে লেপ্টে থাকা সমাজে মোক্ষম ঝাঁকুনি দিয়েছে।
নতুন শিক্ষানীতি অনুযায়ী, ‘এক দেশ এক পরীক্ষা’ কার্যকর করার লক্ষ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষার জন্য কাঙ্ক্ষিত পরিকাঠামো গড়ে না তোলা গেলে গোটা পরীক্ষার স্বচ্ছতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। বার বার তা প্রমাণিত হচ্ছে বিভিন্ন রাজ্যে, এমনকি জাতীয় পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থা (এনটিএ)-র তত্ত্বাবধানে থাকা কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগুলিতেও।
দেশ জুড়ে এখন যে পেশার বাজারদর যত বেশি, তার প্রতিযোগিতা তত কঠিন। আরও কঠিন অর্থের বাধা টপকে সেই মেধাযুদ্ধে শামিল হওয়া। নিট-এর কিংবা এঞ্জিনিয়ারিং-এর জয়েন্ট এন্ট্রান্স-এর মতো অভিন্ন জাতীয় প্রবেশিকাতে যোগ দেওয়া পড়ুয়াদের স্কুলবোর্ডগুলি কিন্তু ভিন্ন। ফলে অভিন্ন প্রবেশিকায় যোগ দিতে গেলে প্রয়োজন হচ্ছে বিশেষ কোচিং-এর। পুঁজিনির্ভর ওই কোচিং-এ মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত পরিবারের মেধাবী পড়ুয়াদের দল প্রথম রাউন্ডেই ছিটকে যায়। অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার ধারদেনা করেও সন্তানদের ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার করার জন্য ওই কোচিং-এর দ্বারস্থ হয়। তখন স্কুলের লেখাপড়া ছেড়ে পড়ুয়া থেকে পরিবার— প্রত্যেকের ধ্যান-জ্ঞান হয়ে ওঠে প্রবেশিকার র্যাঙ্ক কার্ডের নম্বর। এ ভাবেই মেধানির্ভর শিক্ষা ক্রমশ পাল্টে যায় পুঁজিনির্ভর শিক্ষায়। কোচিং সেন্টারগুলি এখন হয়ে উঠেছে সেই মহার্ঘ প্রবেশিকার সাফল্যের ভরকেন্দ্র। দুর্নীতির ঘুঘু বাসা বাঁধছে সেই ভরকেন্দ্র ঘিরেই। দেশের আনাচেকানাচে কোটি কোটি টাকার কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে চলেছে কোচিং-এর নামে রমরমা ব্যবসা। এই সংস্থাগুলির বাণিজ্যিক সাফল্য-ব্যর্থতার খতিয়ান সরকারের আতশকাচের তলায় এলেই প্রশ্ন ফাঁসের বহু রহস্যের কিনারা করা যায়। অথচ, সেটাই অধরা থেকে যাচ্ছে।
উচ্চ আয়ের পেশার প্রবেশিকার প্রশাসনিক ব্যবস্থা যত কেন্দ্রীভূত হয়, সেখানে তত বেশি দুর্নীতির ভয় থাকে। দুর্নীতির বিষ দূর করতে হলে প্রশাসনের কঠোরতম নজরদারি জরুরি। যোগ্য এবং দক্ষ ব্যক্তিদের সেই সংস্থার মাথায় নিয়োগ করতে হবে, যেখানে আনুগত্য নয়, প্রয়োজন পেশাদারিত্ব। অন্যথায়, প্রতিটি প্রশ্ন ফাঁসের পর তৈরি হবে একের পর এক তদন্ত কমিটি, যাদের সুপারিশ হিমঘরে পড়ে থাকবে আগামী বিপর্যয় ঘটা অবধি। ইতিমধ্যে ২০২৪-এর প্রশ্ন ফাঁসের পর গঠিত রাধাকৃষ্ণন কমিটির শতাধিক সুপারিশ এখনও বাক্সবন্দি হয়ে পড়ে রয়েছে। সেই সুপারিশগুলির অন্যতম ছিল পেন-পেনসিল দিয়ে ‘ওএমআর শিট’ ব্যবহারের পরিবর্তে দেশ জুড়ে অনলাইন কম্পিউটার-নির্ভর পরীক্ষার আয়োজন করা। কিন্তু ডিজিটাল ইন্ডিয়ার পরিধিতে ‘নিট’-এর মতো ২৩ লক্ষ পড়ুয়ার পরীক্ষা একই দিনে নেওয়া কার্যত অসম্ভব।
এই পুঁজিনির্ভর টি-২০ মডেলে একমাত্র প্রবেশিকার নম্বরের ভিত্তিতে পড়ুয়াদের চূড়ান্ত ভর্তির মেধাতালিকা তৈরি হওয়ার কারণেও চাহিদা-জোগানের অর্থনীতিতে দুর্নীতির কালো টাকার অনুপ্রবেশ ঘটছে। ফলে ‘সিঙ্গল উইন্ডো’ ব্যবস্থায় প্রশ্ন ফাঁস হলেও মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার হাত ঘুরে সেই প্রশ্ন বিক্রি হচ্ছে। আবার প্রশ্ন ফাঁসের পর সেগুলির উপভোক্তাদের বিরুদ্ধে কোনও আইনি ব্যবস্থা করা হয়নি বলেও এই বাজার প্রসারিত হচ্ছে। এই মুহূর্তে দেশে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট মেডিক্যাল কোর্স-এ ৮২৩টি কলেজে মোট আসন ১,৩৬,৯৩৯, যার মধ্যে ৪৪১টি সরকারি কলেজে আসন ৬৩,২৯৬ (৪৬%)। আর বাকি ৩৮২টি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে মোট আসন ৭৩,৬৪৩ (৫৪%), যে সব কলেজে লেখাপড়ার খরচ কয়েক কোটি টাকা। প্রবেশিকার খরচ, সঙ্গে বেসরকারি কলেজের কোর্স-ফি মিলিয়ে এমন বিপুল বিনিয়োগ এখন মেডিক্যাল শিক্ষার অঙ্গ হয়ে উঠছে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে কেবল পুঁজিনির্ভর মেধাতালিকার পাশাপাশি বোর্ড-নির্ভর স্কুলশিক্ষার মেধাকেও ডাক্তারি কিংবা এঞ্জিনিয়ারিং প্রবেশিকার বিচার্য বিষয় করার কথা ওঠে। কেন্দ্রীয় স্তরে এক উচ্চপর্যায়ের কমিটির কাছে জাতীয় অভিন্ন প্রবেশিকার ৫০% নম্বর এবং পড়ুয়াদের দ্বাদশ শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষার থেকে ৫০% নম্বর যুক্ত করে নিট কিংবা এঞ্জিনিয়ারিং জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষার চূড়ান্ত মেধাতালিকার প্রস্তাব বিবেচনাধীন। এমন প্রস্তাব কার্যকর করতে গেলে রাজ্য বোর্ডগুলির পরীক্ষার নম্বরের মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য ‘নরমালাইজ়েশন’-এর মতো গাণিতিক প্রক্রিয়ার প্রয়োগ জরুরি। পাশাপাশি জরুরি, নিট পরীক্ষা বছরে অন্তত দু’বার নেওয়া, যাতে পড়ুয়াদের মানসিক চাপের বহর কমতে পারে।
এ দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষিতে উচ্চশিক্ষার প্রবেশিকার তাৎক্ষণিক দক্ষতার সঙ্গে পড়ুয়ার সার্বিক মেধা, দক্ষতা এবং সক্ষমতার মেলবন্ধনের স্বার্থে বোর্ড নম্বরের গুরুত্ব বিশেষ জরুরি। অন্যথায়, স্কুলবোর্ডগুলির প্রাপ্ত নম্বরের গুরুত্ব উচ্চশিক্ষায় কমে যাওয়ায় স্কুলের লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে পড়ুয়ারা। যৌথ নম্বরের ভিত্তিতে চূড়ান্ত মেধাতালিকা তৈরি হলে এ দেশের মতো যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সাফল্য-ব্যর্থতার মাপকাঠি হয়ে উঠতে পারে সেই মেধাতালিকা। পুঁজি-নির্ভর প্রবেশিকার দক্ষতার সাফল্যের সঙ্গে পড়ুয়ার সার্বিক মেধার ভারসাম্যের ভিত্তি হতে পারে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির বিকল্প ফর্মুলা।
নির্মাণবিদ্যা, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়