বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইতিহাসে দু’টি বছর বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। ১৯৭৭ সালে জেনিভায় গৃহীত প্রস্তাব, ‘সকলের জন্য স্বাস্থ্য’ আর ১৯৭৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ-এর আহ্বানে কাজ়াখস্তানের আলমা আটায় বিশ্ব স্বাস্থ্য মহাসম্মেলনে গৃহীত সনদের মূল ঘোষণা, ‘সকলের জন্য স্বাস্থ্য-র চাবিকাঠি প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা’। বিশ্বের অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে মাত্র কয়েকটি দেশ এর বাস্তবায়ন ঘটিয়েছে, যেমন চিন।
নির্ভরযোগ্য পরিষেবা যথাসময়ে এবং সুলভে সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে চিন সরকার প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবার ত্রিস্তরীয় পরিকাঠামো নির্মাণ করেছে। কাউন্টি-শহর-গ্রাম, এই তিনটি স্তরে হাসপাতাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। কাউন্টি, বা সর্বোচ্চ (টার্শিয়ারি স্তর) হাসপাতালে থাকে ১০০ থেকে ৫০০ শয্যা। টাউনশিপ বা শহরের (সেকেন্ডারি স্তর) হাসপাতালে ১০০ শয্যার কাছাকাছি। আর গ্রামীণ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে (প্রাথমিক স্তর) কোনও শয্যা নেই। রয়েছে বহির্বিভাগ এবং জনস্বাস্থ্য কার্যালয়। প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী বাহিনীর মধ্যমণি হচ্ছেন জেনারেল প্র্যাকটিশনার বা জিপি। এই জিপি তৈরির সূত্রপাত ১৯৫৫ সাল নাগাদ, ‘বেয়ারফুট’ বা খালি পায়ের ডাক্তার বাহিনী দিয়ে। বিপ্লবোত্তর চিনে প্রথম দু’দশক গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্য পরিষেবা কিছুই ছিল না বললেই চলে। তৎকালীন চিন সরকার ও চিনের কমিউনিস্ট পার্টি কৃষকদের মধ্য থেকে কাউকে কাউকে বেছে নিয়ে কৃষিকাজের কিছুটা সময় বাঁচিয়ে তাঁদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবার প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করে। খালি পায়ে কৃষিকাজ করতে করতেই তাঁরা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণের জন্য চলে যেতেন, তাই গ্রামীণ জনসাধারণ তাঁদের ‘খালি পায়ের ডাক্তার’ বলতেন। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জিপি ব্যবস্থা চালু করা হল ১৯৮০ সাল নাগাদ। তত দিনে এই ডাক্তাররা দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় নতুন ডিগ্রিধারী জিপি-দের প্রায় সমকক্ষ হয়ে উঠলেন এবং সমমর্যাদায় কাজ করতেন।
এর পরবর্তী ধাপে পারিবারিক ডাক্তারের দল তৈরি করা হল। বর্তমানে প্রত্যেকটি এমন দলে রয়েছেন এক জন কাউন্টি স্তরের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, এক জন জিপি, এক জন নার্স ও এক জন জনস্বাস্থ্যকর্মী। এঁদের সঙ্গে প্রত্যেকটি বাড়ির নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে এই যোগাযোগ আরও নিবিড় হয়েছে। সুসংহত ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড পদ্ধতিতে প্রত্যেকটি রোগীর চিকিৎসাসংক্রান্ত ইতিহাস একটি নির্দিষ্ট ফাইলে সংরক্ষিত থাকে। যে কোনও হাসপাতালের ডাক্তার যে কোনও রোগীর অতীত প্রেসক্রিপশন ও পরীক্ষার রিপোর্ট দেখতে পারেন।
চিকিৎসার খরচ রোগীর সাধ্যের মধ্যে রাখতে চিন শুরু করেছিল সমবায় চিকিৎসা প্রকল্প (সিএমএস)। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি থেকে বিভিন্ন প্রদেশে এই ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, যেখানে কৃষি সমবায়ের সদস্যরা বার্ষিক সামান্য কিছু অর্থ দিয়ে সিএমএস-এর তহবিল গড়ে তোলেন। সত্তরের দশক থেকে অর্থনৈতিক সংস্কারের জেরে সিএমএস-এর সংখ্যা কমতে থাকে, গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিষেবা ক্রমেই খারাপ হয়। এক সমীক্ষায় দেখা যায় যে কৃষকদের একটা বড় অংশ অসুস্থতার কারণে দারিদ্রে নিমজ্জিত হচ্ছেন। চিন সরকার ১৯৯৮ সালে শহরবাসীর জন্য, ২০০২ সালে গ্রামবাসীর জন্য চালু করল স্বাস্থ্যবিমা। ২০০৩ সাল থেকে গ্রামবাসীদের জন্য নব সমবায় মেডিক্যাল প্রকল্পও (এনসিএমএস) শুরু হল। ২০১৬ সালে এই দু’টি প্রকল্পকে যুক্ত করে সব নাগরিকের একটিই স্বাস্থ্য বিমা চালু হল (আরবান অ্যান্ড রুরাল রেসিডেন্ট বেসিক মেডিক্যাল ইনশিয়োরেন্স)। উপভোক্তার সংখ্যার নিরিখে এটি বিশ্বের বৃহত্তম স্বাস্থ্য বিমা প্রকল্প। প্রিমিয়ামের এক-তৃতীয়াংশ পরিবার দেয়, দুই-তৃতীয়াংশ দেয় সরকার। বহির্বিভাগ এবং অন্তর্বিভাগ, দুটোই বিমার আওতায় পড়ে। দু’ক্ষেত্রেই খরচের সীমা বাঁধা রয়েছে। অতি-দরিদ্র পরিবারের জন্য পৃথক প্রকল্প রয়েছে, যেখানে পুরো প্রিমিয়াম সরকার দেয়।
চিনে দেখা যাচ্ছে, এক দিকে সরকারি অর্থে চিকিৎসা পরিষেবার পরিকাঠামো উন্নত করা চলছে, অন্য দিকে সব নাগরিককে সরকারি স্বাস্থ্য বিমার আওতায় এনে চিকিৎসার খরচকে সাধ্যের মধ্যে রাখার চেষ্টা চলছে। লক্ষণীয়, চিনের নিজস্ব প্রাচীন চিকিৎসা ব্যবস্থাও (ট্র্যাডিশনাল চাইনিজ় মেডিসিন) সরকারের থেকে যথেষ্ট উৎসাহ পায়। এই ধরনের চিকিৎসার জন্য চিনে মোট শয্যা প্রায় ১৮ লক্ষ। ভারতে আধুনিক পাশ্চাত্য ধারার চিকিৎসা এবং আয়ুর্বেদ প্রভৃতি প্রাচীন পদ্ধতির চিকিৎসা একই সঙ্গে প্রয়োগ করা নিষিদ্ধ, কিন্তু চিনে এই দুই পদ্ধতির চিকিৎসা সম্মিলিত ভাবে রোগীর উপর প্রয়োগ হয়। এটাই জাতীয় নীতি ও নির্দেশ। একে বলা হচ্ছে ‘ইন্টিগ্রেটেড চাইনিজ় অ্যান্ড ওয়েস্টার্ন মেডিসিন’। ওয়েস্ট চায়না হসপিটাল-এর দাবি, এক বিশেষ ধরনের আকুপাংচার পদ্ধতিতে অপারেশনের সময় পূর্ণ অজ্ঞান করার ওষুধ প্রয়োগের পরিমাণ ৭০ শতাংশ কমিয়ে আনা গেছে। অস্ত্রোপচার কিংবা স্ট্রোক-পরবর্তী রোগীদের পুনর্বাসনকে ত্বরান্বিত করতে আকুপাংচার, টুইনা মাসাজ এবং ভেষজ ওষুধের সম্মিলিত চিকিৎসা কার্যকর হয়েছে।
চিন ‘সকলের জন্য স্বাস্থ্য’-এর লক্ষ্যে ভারতের থেকে এগিয়ে। ভারতের থেকে চিনের গড় আয়ু ৬.৩ বছর বেশি। শিশুমৃত্যু, প্রসূতিমৃত্যুর হার চিনের থেকে ভারতে অনেকখানি বেশি। শিশু অপুষ্টির হার চিনে মাত্র ২ শতাংশ। এখনও কি সময় হয়নি স্বাস্থ্যকে জাতীয় স্তরে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে ঘোষণা করার? স্বাস্থ্যের মূল চাবিকাঠি প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, চিন সেই সত্য প্রতিষ্ঠা করেছে।