এ যেন গোটা দেশকে একসূত্রে বেঁধেছে। কেউ মুগ্ধ তার দুধসাদা মিষ্টি শাঁসে, কেউ ভালবাসে তার সুস্বাদু জল, কেউ জড়িয়ে তার খোলজাত হস্তশিল্পের মায়ায়। বাংলার নাড়ু ডাব-চিংড়ি মালাইকারি থেকে দক্ষিণী ইডলি-উত্তপমের সঙ্গী বেঙ্গাই চাটনি— নারকেল সবখানে। ‘মাথার তেল’ই হোক বা মঙ্গলাচরণের উপচার— উত্তর হোক বা দক্ষিণ ভারত, সর্বত্র তার আদর। উপকূলীয় সংস্কৃতির পরিসর ছাড়িয়ে নানা ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি অলঙ্ঘ্য। কী ভাবে একটি ফল এই বিরাট দেশের জনজীবনে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল, ভাবলে অবাক হতে হয়। বছরভর অফুরন্ত ফলন, তাই বছরভর ভারতীয় জীবন যাপনের বহুবিধ প্রয়োজনে সে অপরিহার্য। একার জোরেই দৃশ্যমান করে তুলেছে বহুস্তরী ভারতীয় সংস্কৃতিকে।
বিনোদনে, বিশ্রামে, গ্রামীণ গৃহনির্মাণে তার বড় ভূমিকা। গ্রীষ্মে সে তৃষ্ণা মিটিয়েছে, সমুদ্রতীরে একা মানুষের আশা-হতাশায় সঙ্গী হয়েছে। নারকেলের খোলের হুঁকোয় বদল এসেছে, কিন্তু তার খোল দিয়ে তৈরি একতারা বা রাবণহাত্তার সুর আজও রয়েছে ভারতজীবনে। দেশজ রান্নার পরম্পরায় নারকেল এক আশ্চর্য উপাদান: সচ্ছল রান্নাঘরে হোক বা সম্মিলিত বাঁচার উনুনে কোরানো নারকেল, নারকেল বাটা, নারকেলের দুধ, তেলের জুড়ি নেই।
মালয়ালম ভাষায় কেরলম শব্দের আক্ষরিক অর্থ নারকেলের দেশ। ওনামে জনপ্রিয় আভিয়াল তৈরি হয় কোরা নারকেল ও খাঁটি নারকেল তেল দিয়ে। চালের গুঁড়ো-নারকেলের দুধ দিয়ে তৈরি পালাপাম সুস্বাদু। মালাবার অঞ্চলের মিষ্টি পদ উনাকায়া তৈরি হয় কলা ও নারকেলের পুর দিয়ে। কোব্বারি আন্নাম অন্ধ্র-স্টাইলের সুস্বাদু নারকেল-ভাত; মহারাষ্ট্রের নারালি ভাত তৈরি হয় চাল, নারকেল, গুড় দিয়ে। বাংলার নানা পিঠে ও মুখরোচক খাবারে নারকেলের বহুবিধ ব্যবহার তো জানে বাঙালিমাত্রেই।
পোস্ট এনভায়রনমেন্টালিজ়ম গ্রন্থে পরিবেশবিদ জন ইয়ং সংস্কৃতির ব্যাখ্যায় বলেছিলেন, তার পরিধির মধ্যে যেমন জীবনযাপন, ধর্মবিশ্বাস, মূল্যবোধ অন্তর্লীন, তেমনই তার সঙ্গে জোড়ে শিল্প, প্রযুক্তি, বিজ্ঞানও। এই সূত্রে দেখলে ভারতের ‘নারকেল সংস্কৃতি’ বিস্ময় জাগায়। ফলটি স্বয়ংসম্পূর্ণ— হাই-ক্যালরি শাঁস আছে, জল আছে, ছোবড়া কাজে লাগে নিত্যব্যবহারে, তার খোল উস্কে দেয় বিচিত্র শিল্পকল্পনা।
বহু দেশের অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত এই ‘ট্রি অব লাইফ’কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ২১টি রাষ্ট্রের সংগঠন ‘আন্তর্জাতিক কোকোনাট কমিউনিটি’। ২০০৯ থেকে প্রতি বছর ২ সেপ্টেম্বর ‘বিশ্ব নারকেল দিবস’ পালিত হচ্ছে। এ বছরও পালিত হল তা। বিশ্বের মোট উৎপাদনের সিংহভাগ আসে এশিয়ার পাঁচ দেশ থেকে: ফিলিপিনস, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া ও ভারত। ভারত সরকারের কোকোনাট ডেভলপমেন্ট বোর্ড-এর তথ্যমতে, ৩০ মিলিয়ন মানুষের কর্মসংস্থান নারকেল উৎপাদন-নির্ভর। বিশ্বে নারকেল উৎপাদনকারী দেশগুলির মধ্যে ভারত প্রথম, নারকেল চাষের জমির পরিমাণের নিরিখে তৃতীয়। বিশ্বের মোট উৎপাদনের ২২.৪৪% আসে ভারত থেকে। কৃষি ও কৃষক কল্যাণ দফতরের, হর্টিকালচার স্ট্যাটিস্টিক্স ইউনিট-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ভারতে প্রায় ১৩৯.৭ লক্ষ টন নারকেল উৎপাদন হয়েছে। হেক্টর-প্রতি গড় উৎপাদন ৬.৩৬ টন।
কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি গ্রামীণ জীবিকা, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক উদ্যান পালন অর্থনীতিতে নারকেল চাষের বড় অবদান রয়েছে। এ বছর জানুয়ারিতে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, দেশের মধ্যে কেরল নারকেল চাষে প্রথম, তামিলনাড়ু উৎপাদনে শীর্ষে। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে নারকেল ও তজ্জাত পণ্য রফতানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪,৩৪৯.০৩ কোটি টাকা। ২০০১-০২ অর্থবর্ষে রফতানির পরিমাণ ছিল মাত্র ২৫.৩ কোটি টাকা। বিশ্ববাজারে ভার্জিন নারকেল তেল, নারকেলের দুধ, জল ও বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা ক্রমে বাড়ছে। নারকেল শিল্প গ্লোবাল ভ্যালু চেন-এ শক্তিশালী হচ্ছে। জীবাণু-বিয়োজ্য উপাদান হিসেবে ভারতের গ্রামীণ গৃহস্থালির জ্বালানি, ঝাড়ু, দরমা থেকে কুটির শিল্প ও হস্তশিল্পেরও অন্যতম উপাদান নারকেলের প্রতিটি অংশ। ছোবড়া থেকে হচ্ছে দড়ি, ম্যাট, গদি, বালিশ ইত্যাদি। কোকোনাট পিট বাগানচর্চার জনপ্রিয় উপাদান। ১৮৬০-পরবর্তী কালে সাবান শিল্পে বিপ্লব আনেন উইলিয়াম হেসকেথ লিভার, সাবান তৈরিতে নারকেল তেল নতুন বিকল্পের সন্ধান দেয়।
নারকেল কি ভারতীয় ফল? শুকনো নারকেলের নিজস্ব ‘লাইফ জ্যাকেট’-এর সূত্রে মনে করা হত সে সমুদ্রের জলে ভেসেছে, তীরে ভেসে এসেছে। তার জন্মরহস্য ভেদে নামেন উদ্ভিদ-বিবর্তন বিশেষজ্ঞ কেনেথ অলসেন, তাঁর গবেষক-দল ২০১১-য় নারকেলের ডিএনএ-রহস্য উন্মোচন করেন। বিশ্ব জুড়ে ১৩০০-রও বেশি নারকেলের ডিএনএ পরীক্ষা করে তাঁরা দেখেন, নারকেল চাষের উৎপত্তি স্বাধীন ভাবে মূলত দু’টি আলাদা অঞ্চলে হয়— প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল (ফিলিপিনস মালয়েশিয়া ইন্দোনেশিয়া) ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল (ভারত শ্রীলঙ্কা মলদ্বীপ)। নারকেলের জিনগত গঠন বিশ্লেষণে প্রাচীন সামুদ্রিক বাণিজ্যপথগুলোর সন্ধান মেলে। কলম্বাস-পরবর্তী যুগে ইউরোপীয়দের মাধ্যমে নারকেল কী ভাবে নতুন বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল, গবেষণায় উঠে আসে তা।
এত দরকারি ফল ও গাছ, তবু নগরায়ণের চাপে শহরাঞ্চলে কমছে নারকেল গাছের সংখ্যা। মুছছে নারকেলপাতার গান। জীবনে-সংস্কৃতিতে জড়িয়ে থাকা ফলটির গুরুত্ব বুঝলে হয়তো আমরা সচেতন হতাম আরও।