অন্য রাজ্যের বুলডোজ়ারের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের একটা তফাত আছে। গত দু’মাসে যত বুলডোজ়ার চলেছে, তার বেশির ভাগটাই হয়েছে দখলদারদের উচ্ছেদ করতে। এই দখলদারি তো আইন মেনে হয়নি। কাজেই কেউ বলতে পারেন, পশ্চিমবঙ্গে বুলডোজ়ার ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠা করছে। এ কথাও তো ঠিক যে, আগের জমানায় রাজ্যে যে দলগুলি ক্ষমতাসীন ছিল, তারা কেউ নিঃস্বার্থ ভাবে এই দখলদারি চলতে দেয়নি। ফুটপাত দখল করতে দিয়ে সেখান থেকে নিয়মিত তোলা আদায় করেছে; খালপাড়ে ঘর বাঁধার বিনিময়ে যখনই ডাক পড়েছে, যেতে হয়েছে মিছিলে। এই লেনদেনের সম্পর্ক নিয়ে রাখঢাকও করেনি কেউ।
তবে পাশাপাশি একটা অন্য কথাও আছে। এই যে একটা মস্ত দেশ, বা একটা রাজ্য— অজস্র আইনকানুন, কাগজপত্র, বাধানিষেধ নিয়ে তার যে প্রবল এক অস্তিত্ব— তার সামনে সাধারণ মানুষকে কেমন পর্বতের পাদপ্রান্তে পিঁপড়ের সারি বলে মনে হয়। ‘সাধারণ মানুষ’ মানে, নিজের শিক্ষা, চাকরি অথবা সামাজিক সংযোগের জোরে যার হাত সেই প্রবল রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষমতার নিম্নতম ধাপেও পৌঁছয় না। রাষ্ট্রের সঙ্গে তার আইনকানুনের ভাষায় এঁদের কথাবার্তা চালিয়ে যাওয়া মুশকিল।
অথচ, সে সংলাপটুকু না থাকলেও নয়। এই সাধারণ মানুষরাই রাষ্ট্রের উপরে সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। শুধু ভর্তুকি বা ভাতা পাওয়ার ক্ষেত্রে নয়, তার বাইরেও। তাঁদের বেঁচে থাকার জন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে একটা বিশেষ সম্পর্ক দরকার— ‘অন্য দিকে তাকানো’র সম্পর্ক। উচ্ছেদ হওয়া স্টেশন চত্বরের বা ফুটপাতের দোকানিদের কথাই যদি ধরি, তা হলে তো বলতেই হবে, সে জায়গায় বসতে না পারলে তাঁদের জীবিকাও চলত না। ফলে, তাঁরা স্টেশন চত্বরে ‘বেআইনি’ ভাবে ব্যবসা করতে বসছেন; অথবা ঘর বেঁধেছেন খালপাড়ের দখল করা একচিলতে জমিতে— রাষ্ট্রযন্ত্র এটা দেখেও দেখবে না, এই হল রাষ্ট্রের সঙ্গে সেই সাধারণ মানুষের মৌলিক বোঝাপড়া। উচ্চমধ্যবিত্তেরও এমন বোঝাপড়ার দরকার হয়— বাড়ির সামনের রাস্তা বা ফুটপাতে দিনের পর দিন গাড়ি রাখাটাও একই রকম ‘অবৈধ’, এবং রাষ্ট্রের দেখেও না-দেখার উপরে একই রকম নির্ভরশীল। তবে, রাষ্ট্র এসে গরিব মানুষকে উচ্ছেদ করলে উচ্চমধ্যবিত্তের অকৃত্রিম উল্লাসে বোঝা যায়, নিজেদের দখলদারিকে তারা ‘অধিকার’ ভাবে, আর গরিবের দখলদারিকে ‘অন্যায়’।
এই যে রাষ্ট্র সাধারণত অনেক কিছুই দেখেও দেখে না, এটা যে রাষ্ট্রের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য নয়, পশ্চিমবঙ্গের গরিব মানুষ ইতিমধ্যেই তা টের পাচ্ছেন। এই ব্যবস্থা রাজনীতির। যখন যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব রাষ্ট্রব্যবস্থা চালান, তাঁরা যদি মনে করেন যে, এই সাধারণ মানুষগুলোকে আইনকানুন-নথিপত্রের বাইরে এই জায়গাটুকু ছেড়ে দেবেন, তা হলে রাষ্ট্র অন্য দিকে চোখ ফিরিয়ে থাকে। আর, তাঁরা যদি মনে করেন যে, এতগুলো মানুষের জীবিকার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আরও কিছু আছে, তা হলে পুলিশ-পুরসভা বুলডোজ়ার নিয়ে হাজির হয়। কারও অবস্থানই নিঃস্বার্থ নয়। কিন্তু, কোন দলের স্বার্থের সঙ্গে সাধারণ মানুষের কতখানি যোগ?
বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে, যেখানে কর্মসংস্থানের প্রায় নব্বই শতাংশই অসংগঠিত ক্ষেত্রে; এবং, সেই অসংগঠিত ক্ষেত্রে ব্যবসাই হোক অথবা চাকরি, সেখানে নিযুক্ত মানুষের সিংহভাগই নিতান্ত গরিব, ক্ষমতাহীন সাধারণ মানুষ। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের সামনে যাদের পিঁপড়ের সারি বলে ভ্রম হয়। ভারতের অন্য অনেক রাজ্যেই এমন মানুষ আছেন, কিন্তু, যে বৈশিষ্ট্যটি পশ্চিমবঙ্গকে অন্যান্য রাজ্যের চেয়ে আলাদা করেছে, তা এই রকম— বিভিন্ন কারণে এ রাজ্যে ধর্ম, জাত বা ভাষার ভিত্তিতে সামাজিক স্বার্থগোষ্ঠী এখনও তেমন ভাবে গড়ে ওঠেনি। পশ্চিমবঙ্গের সমাজ এখনও দলীয় রাজনীতির অক্ষেই বিভাজিত— এখানে আনুগত্য প্রকাশ করার প্রধান রাস্তা রাজনৈতিক সমর্থন, ফলে রাষ্ট্রের সঙ্গে বোঝাপড়ার জন্য দলীয় রাজনীতির উপরে নির্ভরশীলতা অনেক রাজ্যের চেয়েই বেশি।
সব রকম আইনকানুন মেনে, নিয়মিত আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা করে, রাষ্ট্রের ঘরে আয়কর দিয়ে বা নিদেনপক্ষে ট্যাক্স রিটার্ন ফাইল করে ব্যবসা করা এঁদের পক্ষে কঠিন। এঁদের মধ্যে কেউ হয়তো ঘরেই মশলা গুঁড়ো করে শহরতলির মুদিখানায় ‘সাপ্লাই’ দেন— সে ব্যবসার পাকা রসিদ নেই, জিএসটি নেই। স্বভাবতই, সেই ছোট মুদিখানারও নেই। কেউ হয়তো শিঙাড়া বেচেন লোকাল ট্রেনে— যে পরিসরের উপরে তাঁর আইনসঙ্গত কোনও দখল নেই। রাষ্ট্র জানে, এ ভাবে ব্যবসা চলছে। রাজনীতিও জানে। সে জীবিকা চালাতে দেওয়ার জন্য রাজনীতি বিলক্ষণ নিজের খাজনা আদায় করে নেয়। কিন্তু, সেই সাধারণ লোকও জানেন, একটা নতুন টোটো নিয়ে স্ট্যান্ডে দাঁড়াতে হলে এইটুকু করতে হবে— রাষ্ট্রের সঙ্গে এটাই তাঁর বোঝাপড়া। রাজ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতা হাত পাল্টেছে, কিন্তু এই বাস্তব বদলায়নি। জনসংখ্যার একটা বড় অংশের বেঁচে থাকার জন্য এই রাজনৈতিক আশ্রয় এখনও চাই।
রাজনীতি নিশ্চয়ই নিজেদের মতো লাভের হিসাব কষে— তার পরই রাষ্ট্রের চোখ সরিয়ে নেয় এমন ‘বেআইনি’ কারবারের দিক থেকে। কিন্তু, কেউ একটু অন্য রকমও ভাবতে পারেন। এই যে সর্বার্থে ক্ষমতাহীন মানুষগুলো পড়ে রইলেন সংগঠিত ক্ষেত্রের বাইরে, সবাই কি নিজের দোষেই পতিত হয়েছেন সেই অক্ষমতায়? রাষ্ট্রও কি তাঁদের ব্যর্থতার সমান অংশীদার নয়? সবাইকে উন্নতি করার সমান সুযোগ দিতে না পারার ব্যর্থতার দায় কি রাষ্ট্রের নয়? অতএব, তাঁদের বেঁচে থাকার এই পরিসরটুকু দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে, এমনও দাবি করতে পারেন কেউ। সে দাবি পুরোপুরি মানলে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল খাজনা না নিয়েই জায়গা ছেড়ে দিত এই মানুষগুলিকে। কিন্তু, সে আলাদা তর্ক। তবে, মধ্যবিত্তের ‘আইনি মূল্যবোধ’ যাকে ‘বেআইনি’ বলে জ্ঞান করে, তার মধ্যেও নিহিত থাকতে পারে বণ্টনের ন্যায্যতার একটি সূত্র— সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাজনীতির বোঝাপড়ায়, রাষ্ট্রের আইনকানুনকে পাশ কাটিয়ে গড়ে ওঠা অর্থনীতি।
অস্বীকার করার উপায় নেই যে, তৃণমূল কংগ্রেস বিশেষত তার শাসনকালের শেষ পর্বে এই বোঝাপড়াটা ভেঙেছিল। খাজনার পরিমাণ পৌঁছেছিল সহ্যসীমার বাইরে; সময় সময় সে টাকা দিয়েও নিষ্কৃতি ছিল না। তার ফল তৃণমূল ভোটযন্ত্রে পেয়েছে। কিন্তু, তাতে এই বোঝাপড়ার গুরুত্ব হারিয়ে গিয়েছে কি? মনে রাখা যায় যে, বাম আমল পেরিয়ে তৃণমূলের শাসন প্রতিষ্ঠার সময় এই বোঝাপড়ার একটা প্রায়-মসৃণ হস্তান্তর হয়েছিল। সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক আনুগত্য দল বদলেছিল, আর তার বিনিময়ে ধারাবাহিক থেকেছিল দেখেও না-দেখার বোঝাপড়া। গত দু’মাসে যত হকার-উচ্ছেদ হয়েছে, যত বুলডোজ়ারের চাকা গড়িয়েছে পশ্চিমবঙ্গের পথে, তাতে মনে হওয়া অসম্ভব নয় যে, এই বোঝাপড়ার দিন ফুরোল।
বাম ফ্রন্ট বা তৃণমূলের কাছে এই বোঝাপড়া যতখানি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, বিজেপির কাছেও যে ততখানিই হবে, তা নয়। বরং, বিভিন্ন বিজেপি-শাসিত রাজ্যের ছবি দেখলে মনে হয়, তলার স্তর থেকে তৈরি হয়ে ওঠা রাজনৈতিক অর্থনীতির চেয়ে উপর থেকে নেমে আসা ‘উন্নয়ন’-এ তাদের ভরসা বেশি। কেন, তা এক ভিন্ন আলোচনা। কিন্তু, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক জমিতে বিজেপি এর আগে কখনও নিয়ন্ত্রক ভূমিকায় থাকেনি। জনসংখ্যার এত বড় একটা অংশের সমর্থন যেখানে খুব সহজেই আদায় করা সম্ভব, সেখানে কি বিজেপি তার বর্তমান বুলডোজ়ারের নীতিতে অটল থাকবে?
সম্ভাবনা তিনটি। এক, বিজেপি এই পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি থেকে দূরেই থাকবে; নির্ভর করবে উপর থেকে নামা ‘উন্নয়ন’-এর মডেলে। তার ফল কত জনের কাছে পৌঁছবে, কত দিনে, তত দিন তাঁরা বাঁচবেন কী করে, এই প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা। দ্বিতীয় সম্ভাবনা, পশ্চিমবঙ্গ হাঁটবে অন্যান্য পরিচয়ভিত্তিক পৃষ্ঠপোষকতার পথে— তা হতে পারে জাতিভিত্তিক, বা ধর্মভিত্তিক। আর তৃতীয় সম্ভাবনা হল, বিজেপিও ‘বোঝাপড়ার অর্থনীতি’র মধ্যে ঢুকে পড়বে। হয়তো বাদ পড়বেন কিছু নির্দিষ্ট পরিচয়ের মানুষ, কিন্তু বাকিদের জন্য পুরনো ব্যবস্থা ফের কায়েম হবে। এর মধ্যে কোনটা ঘটবে— বিজেপি একই সঙ্গে একাধিক বিকল্পের পথে হাঁটবে কি না, তা ভবিষ্যৎ জানে। পরিণতি কী হবে, সে প্রশ্ন অবশ্য ভবিষ্যতের ভরসায় ফেলে রাখলে মুশকিল।