এই বছরের ৩১ জুলাই সারা বিশ্বে একটা ভিডিয়ো ‘ভাইরাল’ হয়েছিল, যেখানে প্রায় ৮০,০০০ তরুণ অভিবাসী মরক্কোর এফনেদেক শহর থেকে সেউটার তারাফাল ও বেনজ়ু সমুদ্রসীমা সাঁতরে পার হয়েছেন। প্রেক্ষিতটা কী? জুন মাসে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের এক আইনি রায় টিকটক-সহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে যাতে বলা হয়, অভিবাসীরা সাঁতরে সেউটায় পৌঁছতে পারলে নাকি তাঁদের আর ফেরত পাঠানো হবে না। ইউরোপে উন্নত জীবনের সুরক্ষা পাওয়ার আশায়, ভূমধ্যসাগরের উত্তাল সমুদ্রে সাঁতরে তীরে ওঠার পরে পদপিষ্ট হয়ে অসংখ্য মানুষ আহত, প্রায় ১০০ জনের মৃত্যু হয়। এই বিরাট সংখ্যার অভিবাসী হঠাৎ আসায়, সেউটার আশ্রয়কেন্দ্রগুলো ধারণক্ষমতার চেয়ে ২৪ গুণ বেশি পূর্ণ হয়ে যায়। স্থানীয় প্রশাসন জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে, স্পেনের সেনা ও কোস্টগার্ড উদ্ধার অভিযান চালিয়ে, সমুদ্রসীমানায় প্রাচীর তৈরি করে। দ্বিপাক্ষিক সমঝোতায় প্রায় ৭০,০০০ জনকে ফেরত পাঠালে, মরক্কো পুলিশ সীমান্তে কাঁদানে গ্যাস ও ওয়াটার ক্যানন ব্যবহার করে ভিড় নিয়ন্ত্রণ করে, অসহায় মানুষগুলোকে আশ্রয় দেয়। এই মর্মান্তিক ঘটনা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্তে সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং প্রাণঘাতী অনুপ্রবেশ।
এ দিকে প্রতি বছরের মতো এ বারও ২০ জুন ‘বিশ্ব শরণার্থী দিবস’ পালন করা হয়েছে। শরণার্থীদের সাহস ও সহনশীলতাকে সম্মান জানাতে রাষ্ট্রপুঞ্জ এই দিনকে মর্যাদার সঙ্গে পালন করে। তার উপরে, এ বছর ছিল ১৯৫১ সালের ঐতিহাসিক ‘রিফিউজি কনভেনশন’-এর ৭৫ বছর পূর্তি। এ বারের বিশ্ব শরণার্থী দিবসের থিম নির্ধারণ করা হয়েছিল, ‘আনটিল এভরিওয়ান ইজ় সেফ’। যার নির্যাস হল, ‘যত ক্ষণ না পর্যন্ত পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষের জীবন নিরাপদ হচ্ছে, তত ক্ষণ সত্যি আমরা কেউ পুরোপুরি নিরাপদ নই।’
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে, আশ্রয়প্রার্থী মানুষদের ন্যূনতম মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নে ১৯৫১ সালের প্রথম রিফিউজি কনভেনশনে, তাঁদের দাবি-দাওয়া জানানো হয়। ১৯৬৭ সালে উদ্বাস্তু ও রাষ্ট্রহীন মানুষদের ত্রাণ, সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থার জন্য প্রোটোকল স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৫১ সালের ‘রিফিউজি কনভেনশন’কে যদি বাস্তুচ্যুত মানুষের মূল স্রোতে ফেরার ক্ষেত্রে ধ্রুবক বা পথ নির্দেশিকা হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, তা হলে প্রশ্ন থেকে যায় দীর্ঘ ৭৫ বছর পরে, কেমন আছেন শিকড়ছেঁড়া মানুষগুলো? রাষ্ট্রপুঞ্জের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা, ইউএনএইচসিআর-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ব জুড়ে এখন শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ১৬ লাখ। আরও কয়েক কোটি মানুষ নিজেদের দেশের ভিতরে যাযাবরের জীবন কাটাচ্ছেন। বিশ্বে মোট শরণার্থীর ৭০ শতাংশ ইউক্রেন, সিরিয়া, আফগানিস্তান, সুদান, ভেনেজ়ুয়েলা ও প্যালেস্টাইনের গাজ়া উপত্যকা থেকে উৎখাত হয়েছেন। প্রায় ৬৫% শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে কলম্বিয়া, তুরস্ক, উগান্ডা, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো দেশ।
বিশ্ব জুড়ে শরণার্থী পরিস্থিতি এখন জটিল এবং বহুমুখী। ইউরোপে ২০২২ সাল থেকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে প্রায় ৫৯ লক্ষ ইউক্রেনীয় নাগরিক জার্মানি, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র, ইউকে, স্পেন, ইটালি ও রোমানিয়াতে আশ্রয় নিয়েছেন, অভ্যন্তরীণ ভাবে বাস্তুচ্যুত প্রায় ৩৭ লক্ষ মানুষ। ইউক্রেন সরকারের নিয়মানুযায়ী ১৮ থেকে ৬০ বছরের পুরুষদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা থাকায়, মোট শরণার্থীর ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ নারী ও শিশু। ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের মধ্যে প্রায় ৫৭% ইউরোপে কাজ পেয়েছেন। কিন্তু ভাষার সীমাবদ্ধতা ও ডিগ্রির প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির অভাবে, উচ্চশিক্ষিত হয়ে তাঁরা নিচু স্তরে কাজ করছেন। দক্ষিণ আমেরিকায়, ২০১৪ সাল থেকে তেলের উপর নির্ভরশীল ভেনেজ়ুয়েলার অর্থনীতি, সরকারি দমন-পীড়ন, রাজনৈতিক সহিংসতা, মূল্যস্ফীতির ফলে, প্রায় ৮০ লাখ মানুষ ভেনেজ়ুয়েলা ছেড়ে কলম্বিয়া, পেরু, ব্রাজ়িল, ইকোয়েডর, চিলি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়েছেন। ‘গোদের উপর বিষফোড়া’র মতো যোগ হয়েছে, ২০২৬ সালের দুটো ভূমিকম্প। কয়েক হাজার মানুষ ভেনেজ়ুয়েলায় অভ্যন্তরীণ ভাবে বাস্তুচ্যুত হয়ে বেঁচে আছেন।
আফ্রিকা মহাদেশের সুদান এবং কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র রক্তক্ষয়ী শরণার্থী সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৩ সালে সুদানের সামরিক আর আধাসামরিক বাহিনী ‘র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস’-এর মধ্যে গৃহযুদ্ধের ফলে সুদানের ভিতরে ৯০ লক্ষ মানুষ অভ্যন্তরীণ ভাবে বাস্তুচ্যুত। প্রাণ বাঁচাতে চাড, দক্ষিণ সুদান, মিশর, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক এবং ইথিয়োপিয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষ। সুদানের দারফুর ও খার্তুম অঞ্চলে প্রায় ২ কোটি মানুষ দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতিতে বেঁচে আছেন। কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে গত ৩০ বছর ধরে খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ও জাতিগত দ্বন্দ্ব নিয়ে সশস্ত্র সংঘাত চলছে। কঙ্গোর ভিতরে প্রায় ৫৮ লক্ষ মানুষ অস্থায়ী ক্যাম্প বা জঙ্গলে, এবং প্রায় ১২ লক্ষ নাগরিক উগান্ডা, বুরুন্ডি, রুয়ান্ডা, তানজ়ানিয়া এবং জ়াম্বিয়ার ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন। কঙ্গোর সঙ্কট— বিশ্বের সবচেয়ে উপেক্ষিত বাস্তুচ্যুতি সঙ্কটের তালিকায় শীর্ষে।
পশ্চিম এশিয়ায়, ২০১১ সাল থেকে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের ফলে মোট জনসংখ্যার অর্ধেক (প্রায় ৬৪ লক্ষ) তুরস্ক, লেবানন ও জর্ডন, জার্মানি ও সুইডেন-সহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছেন। সিরিয়ায় অভ্যন্তরীণ ভাবে বাস্তুচ্যুত প্রায় ৬৮ লক্ষ মানুষ। অনেক বছর আশ্রয়ে থাকার কারণে, তুরস্ক ও লেবানন-সহ অনেক দেশে সিরিয়ার শরণার্থীদের উপরে স্থানীয়দের ক্ষোভ ও রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে, তাঁদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে। গাজ়ার পশ্চিম তীর, জর্ডন, লেবানন এবং সিরিয়ার ৫৮টি শরণার্থী ক্যাম্পে প্রায় ৬০ লক্ষ প্যালেস্টাইনের শরণার্থী আছেন। গত আড়াই বছরে ইজ়রায়েলি সামরিক অভিযানে গাজ়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৫-৯০ শতাংশ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। শরণার্থীরা জল, খাবার এবং চিকিৎসার অভাবে ধুঁকছেন, সেখানে ‘দুর্ভিক্ষ-পরিস্থিতি’ চলছে। গাজ়ায় মানবিক সহায়তা আটকে, ‘ক্ষুধাকে যুদ্ধের হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত যুদ্ধাপরাধের তদন্ত করছে। এই সঙ্কট আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতার এক বড় পরীক্ষা বটে।
দক্ষিণ এশিয়ার উদ্বাস্তু পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ২০১৭ সাল থেকে মায়ানমার থেকে আসা ৭.৫ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ। বাংলাদেশের কক্সবাজারের ভাসানচরে থাকা রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রপুঞ্জ ‘বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত সংখ্যালঘু গোষ্ঠী’র তকমা দিয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী পাকিস্তানে, ২ লক্ষাধিক সৌদি আরবে, ১.৫ লাখ মালয়েশিয়ায় ও ৪০ হাজার ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। ১৯৮২ সালে মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার পরে, বাংলাদেশ-সহ কোনও দেশ তাঁদের আন্তর্জাতিক আইনি সুরক্ষা বা বৈধ শরণার্থীর মর্যাদা দেয়নি। আফগান শরণার্থীদের অবস্থাও তথৈবচ। গত চার দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েট আগ্রাসন, গৃহযুদ্ধ, আমেরিকার যুদ্ধ ও ২০২১ সালে তালিবানদের ক্ষমতা দখলের ফলে, বিশ্ব জুড়ে আফগান শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ৬৪ লক্ষ, দেশের ভিতরে বাস্তুচ্যুত প্রায় ৪০ লক্ষ। আফগান উদ্বাস্তুদের ৯৫ শতাংশকে আশ্রয় দিয়েছিল প্রতিবেশী দেশ ইরান ও পাকিস্তান। অনিবন্ধিত আফগানদের এখন তারা গণহারে ফেরত পাঠাচ্ছে তাঁদের দেশে, যেখানে তাঁদের জীবনধারণের ন্যূনতম ব্যবস্থাটুকু নেই।
ভারত আন্তর্জাতিক শরণার্থী কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি, ভারতে কোনও ‘জাতীয় শরণার্থী আইন’ নেই, নীতি নির্ধারণে কেন্দ্রীয় সরকার ও সুপ্রিম কোর্ট মূল ভুমিকা নেয়। কিছু মাস আগে ভারত-বাংলাদেশের মাঝের ‘নো-ম্যানস ল্যান্ড’-এ দুই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতি ও তার প্রয়োগের নির্দেশনামা আসতে দেরি হলে, সাধারণ পরিবারগুলো ঠিক কতটা ভোগান্তির শিকার হয়েছিল, তার ছবি আমরা দেখেছি।
শরণার্থী-সঙ্কট আসলে শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটা কোটি কোটি মানুষের ঘর হারানোর হাহাকার, আর একই সঙ্গে বেঁচে থাকার এক অদম্য মানবিক লড়াইয়ের গল্প বলে। কবি আহসান হাবীব লিখেছিলেন, ‘আমার শরীরে লেগে আছে এই স্নিগ্ধ মাটির সুবাস...’। নিজের চেনা মাটি আর বাড়ির চাবির গোছা ফেলে, যখন শুধু পরনের কাপড়টুকু সম্বল করে জলস্থলপাহাড় ডিঙিয়ে সীমান্ত পার হতে হয়, তার চেয়ে বড় যন্ত্রণার আর কী হতে পারে?
ইতিহাস বিভাগ, ডায়মন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়