E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

মানুষ না কি পরীক্ষার যন্ত্র

এক সময়ের প্রাণবন্ত ক্লাসরুম আজ ফাঁকা। এই রাজ্যে স্কুলে স্কুলে শিক্ষকহীনতা যেমন চূড়ান্ত বাস্তব, তেমনই পড়ুয়া না পেয়ে শিক্ষকদের মধ্যে অক্ষম আফসোসও বাস্তব ঘটনা।

মধুমিতা দত্ত

শেষ আপডেট: ২০ অগস্ট ২০২৬ ০৫:৪৪

এখনও বেশ মনে পড়ে, স্কুল যাওয়ার হাজারো আনন্দ। সেই সব আনন্দ-স্মৃতি আমরা কমবেশি আজীবন বয়ে চলি। কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে মাধ্যমিক স্তরের পরীক্ষায় পাশের পরে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীর একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে স্কুলে গিয়ে ক্লাস করার অনীহা প্রায় মহামারির আকার ধারণ করে নিয়েছে। এই সব ছাত্রছাত্রী স্কুলের নিয়মিত ক্লাসে না গিয়ে হাজিরা দিচ্ছে বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে। কিছু স্কুল হাজিরার কড়াকড়ি করে পড়ুয়াদের স্কুলে ফেরানোর চেষ্টা করলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেই হাল ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

এখন এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন এক লব্জ— ‘ডামি স্কুল’। যেখানে নাম নথিভুক্ত করে পড়ুয়ারা উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পরীক্ষা দিতে পারে, কিন্তু স্কুলে যায় না। বাকি পুরো সময়ই তারা বন্দি থাকছে ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার কোচিং সেন্টারে। রাজস্থানের কোটা, দিল্লি থেকে শুরু হওয়া এই প্রবণতা এখন পশ্চিমবঙ্গকেও গ্রাস করেছে। কলকাতার উপকণ্ঠ থেকে শুরু করে শিলিগুড়ি, দুর্গাপুর বা আসানসোল— সর্বত্রই ডামি স্কুল আর কোচিং সেন্টারের আঁতাঁত মূলধারার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে কোণঠাসা করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ।

এই প্রবণতার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে চূড়ান্ত প্রতিযোগিতামুখী ব্যবস্থা আর অভিভাবকদের উৎকণ্ঠা। যে কোনও মূল্যে সন্তানকে ডাক্তারি বা এঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রবেশিকায় সফল হতেই হবে। সন্তানকে ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ার বানাতেই হবে। দৌড়তে গিয়ে আমরা ভুলেই যাচ্ছি স্কুলের আসল ভূমিকা। স্কুল তো শুধুই সিলেবাস শেষ করার বা নম্বর তোলার কারখানা নয়। সহপাঠীদের সঙ্গে মেলামেশা, খেলাধুলা, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে কিশোর বয়সের সামাজিক ও চারিত্রিক গঠন হয়।

এই রাজ্যের বাস্তব চিত্রটি বেশ করুণ। রাজ্য জুড়েই একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির বিজ্ঞানের পড়ুয়াদের স্কুলে ফেরানো এখন একটা চ্যালেঞ্জ। স্কুল শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, স্কুলে স্কুলে সব পড়ুয়ার জন্য বায়োমেট্রিক হাজিরার ব্যবস্থা করা হবে। সর্বভারতীয় বোর্ডগুলিও হাজিরার কড়াকড়ির কথা বার বারই জানাচ্ছে। কাউন্সিল ফর দ্য ইন্ডিয়ান স্কুল সার্টিফিকেট এগজ়ামিনেশন (সিআইএসসিই)-এর চেয়ারম্যান মাস কয়েক আগে কলকাতায় এসে জানিয়ে গিয়েছেন, ডামি স্কুলের বিরুদ্ধে তাঁরা আরও কঠোর হচ্ছেন। কিন্তু অভিযোগ, অনেক প্রতিষ্ঠানই কোচিং সেন্টারের সঙ্গে অসাধু সমঝোতায় লিপ্ত। স্কুলের রেজিস্টারে ভূতুড়ে উপস্থিতি দেখিয়ে ক্লাস খালি করে দেওয়া হচ্ছে।

ফলে এক সময়ের প্রাণবন্ত ক্লাসরুম আজ ফাঁকা। এই রাজ্যে স্কুলে স্কুলে শিক্ষকহীনতা যেমন চূড়ান্ত বাস্তব, তেমনই পড়ুয়া না পেয়ে শিক্ষকদের মধ্যে অক্ষম আফসোসও বাস্তব ঘটনা। আর অভিভাবকরাও এখন সন্তানের সামগ্রিক বিকাশের চেয়ে কেবল একটি সর্বভারতীয় র‌্যাঙ্ক পাওয়াকেই প্রধান সাফল্য বলে মনে করছেন। ফলে কৈশোরের স্বাভাবিক সারল্য এবং মূল্যবোধ গঠনের পাঠ আজ প্রতিযোগিতার দৌড়ে হাঁপিয়ে উঠছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল কিশোর বয়সের মানসিক স্বাস্থ্য। এই বয়সে স্কুলের স্বাভাবিক, মুক্ত পরিবেশ ছেড়ে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত প্রতিযোগিতার পিছনে ছুটে চলার ফল কি ভাল হতে পারে? একাকিত্ব, অবসাদ, আত্মকেন্দ্রিকতা বাড়ছে। অনেকের ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত চরম পথ বেছে নেওয়ার মতো ঘটনা তো ঘটেই চলেছে। কোটা বা বিভিন্ন শহরের পরিসংখ্যান আমাদের সেই সতর্কবার্তা দেয়। ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার তীব্র স্পৃহা, আর তার জন্য ভাল র‌্যাঙ্কের জন্য এই দৌড়।

অথচ, এই সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলিতে সফল যে সকলে হতে পারে, তাও নয়। তখন চেপে ধরে চরম হতাশা। অনেকে এর পর একাধিক বার এই পরীক্ষা দিয়ে যায়। বছরের পর বছর ড্রপ দিয়ে প্রস্তুতি চালিয়ে শেষ পর্যন্ত এমন জায়গায় পৌঁছয়, যেখানে ভাল জেনারেল কলেজে ভর্তির সুযোগও আর থাকে না। স্কুল যাওয়ার মধুর স্মৃতি এদের মাঝ পথেই মুছে যায়। স্কুলের শিক্ষাকে এড়িয়ে যাওয়ার এই প্রবণতা মনে হয় অবিলম্বে বন্ধ করার সময় এসেছে। সিবিএসই-সহ অন্য সর্বভারতীয় বোর্ডগুলি কড়া পদক্ষেপের কথা বলেছে ঠিকই, যদিও তা কত দূর কার্যকর হবে, জানা নেই। আমাদের রাজ্যের শিক্ষা দফতরকেও কঠোর অবস্থান নিতে হবে। নিয়মিত সারপ্রাইজ় ভিজ়িট ও প্রশাসনিক নজরদারি দরকার।

তবে নজরদারি দিয়ে কি সবটা হয়! উদ্দেশ্য তো স্রেফ পরীক্ষা দেওয়ার যন্ত্র তৈরি করা নয়, সংবেদনশীল মানুষ তৈরি করা। স্কুলের ক্লাসরুম যদি খালিই পড়ে থাকে, তবে কাগজ-কলমে হয়তো ডিগ্রি মিলবে, কিন্তু শিক্ষার প্রকৃত মান ও মানবিক বোধটুকু হারিয়ে যাবে। তাই শুধু কড়া নজরদারি নয়, বরং আমাদের সমাজ ও অভিভাবকদের মানসিকতার পরিবর্তন আনা সবচেয়ে জরুরি কাজ। শিক্ষার্থীদের উপর এই প্রাণঘাতী চাপ বন্ধ হোক। অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Exam Education system

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy