পিএইচ ডি তো হয়ে গেল স্যর, এ বার কী করব? চাকরি হবে? কবে হবে! কত জনকে আর নেবে! শুনেছি, বোর্ডে সুপারভাইজ়র না থাকলে…” সময় পেরিয়ে যায়। বয়সও। আর, এই সব শব্দেরা। হা-হুতাশ, মনখারাপ। সান্ত্বনা ভাষাহীন, সমাধান অধরা। এরা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বদলে বদলে যায় বিষয় আর মুখ। বড় পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। খবর হয়। পাশাপাশি ঘটে যায় কত ছোট ছোট হিসাব-নিকাশের খেলা; কত দুঃখ রোজ জমা হয় ক্লাসরুমে, করিডরে, পরীক্ষার খাতায়, ইন্টারভিউয়ে— কে আর খবর রাখে তার! পরিকল্পিত কৌশল, সংগঠিত প্রহসনের বিরুদ্ধে একার কী করার থাকে, কী ভাবে সে প্রমাণ দেবে!
প্রত্যেক প্রজন্মের কিছু নিজস্ব আনন্দ, দুঃখ আছে। কিন্তু সব সময়ের মনখারাপ ঠিক এক নয়। সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি, এমনকি প্রযুক্তির সঙ্গেও যুক্ত তা। আজকের শিক্ষার্থী এমন এক সময়ে বেড়ে উঠছে, যেখানে পৃথিবী আগের যে কোনও সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সংযুক্ত, সম্ভাবনাময়। একই সঙ্গে এই সময়ই আবার উদ্বেগ, নিঃসঙ্গতা, অবসাদ, অনিশ্চয়তার যুগ। এখন সে শুধু পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে লড়াই করে না, তাকে লড়তে হয় সমাজমাধ্যম নির্মিত নানা মিথ ও মিথ্যার সঙ্গে; দ্রুত পাল্টে যাওয়া বিশ্বের অনিশ্চয়তার সঙ্গে। তার এই অ-ভূতপূর্ব মনখারাপে কে এসে বসবে পাশে!
সাধারণ ভাবে মনে হয়, মনখারাপ ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু তারও আছে সামাজিক ইতিহাস। এক জন ছাত্র কেন মনখারাপ করে? শুধু পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়ার জন্য? প্রেমে ব্যর্থ হলে? বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়ায়? আরও অনেক কারণ। সফল হওয়ার, অন্যকে ছেড়ে এগিয়ে যাওয়ার দর্শন মানবিক নয় বড়, প্রতিযোগিতাকেন্দ্রিক তা— শিক্ষার্থীর পরিচয় তার ব্যক্তিসত্তা থেকে সরে যায় পরীক্ষার ফল, সিভি, সার্টিফিকেট, সামাজিক স্বীকৃতির দিকে। তার পরেও সংশয়ে দুলতে থাকে আসন্ন আগামী। কোথায় সে রাষ্ট্রিক নিরাপত্তা! কুযুক্তি, না-যুক্তি, অপযুক্তি নিয়ে ব্যতিব্যস্ত এই সময়ে রোপিত হয় মনখারাপের চারা। বুঝে ওঠার আগেই পেরিয়ে যায় সম্ভাবনাময় অনেকগুলি বসন্ত।
শিক্ষা পুরোপুরি বাজারের নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে পড়লে আরও সমস্যা। তখন প্রশ্নগুলো বদলে যায়: এই বিষয় পড়ে চাকরি হবে? কত বেতন? সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, সঙ্গীত, শিল্পশিক্ষার মতো বিষয় শিক্ষার্থীর কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হতে থাকে। সাফল্যের সমাজ (মাধ্যম)-নির্ধারিত নির্মাণ তথা ফাঁদ পাতা চারিদিকে, শেখার আনন্দের চেয়ে শিক্ষার্থী অনেক বেশি পায় পিছিয়ে পড়ার ভয়। দিশাহারা সে: কোনটা ঠিক পথ, কোন পথে মিলবে স্বপ্নের দেখা!
এখন চার পাশে তথ্যের বিস্ফোরণ, তবু তা জ্ঞানের নিশ্চয়তা দেয় না। অতিরিক্ত তথ্য মনকে অস্থির করে— একটি ভিডিয়ো শেষ না হতেই আর একটি, একটা খবরের পর আর একটা। নোটিফিকেশনের পর নোটিফিকেশনে মনোযোগের ভাঙন— ছাপ ফেলে চিন্তা, কল্পনা, আত্মবিশ্লেষণে। গভীর পাঠের পরিবর্তে দ্রুত স্ক্রলিং, চিন্তার জায়গায় প্রতিক্রিয়া, ধৈর্যের বদলে তাৎক্ষণিকতা। আগের চেয়ে অনেক বেশি সংযুক্ত, তবু আগের তুলনায় আরও বেশি একা। একাকিত্বের আকাশে বজ্রগর্ভ মেঘ জমে। এ-বছর বজ্রপাতের হার বড় বেশি!
মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মনখারাপ মানুষের এক স্বাভাবিক আবেগ। দর্শনের দৃষ্টিতে মনখারাপ নিয়ে আসে গভীর সত্য, নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শেখায়। সে দিক থেকে দেখলে, আমি কেন পড়ছি, আমি কী হতে চাই, সফলতা বলতে আমিকী বুঝি, আমার জীবনের অর্থ কোথায়— এই প্রশ্নগুলো এক জন শিক্ষার্থীকে পরিণত করে তোলারও ক্ষমতা ধরে। তাই প্রয়োজন মনখারাপকে বোঝা, তার ভাষা শোনা।
সাহিত্য, দর্শন, সঙ্গীত ও বিজ্ঞানের বহু অনুসন্ধানের পিছনে ছিল গভীর অস্থিরতা ও বিষণ্ণতার অভিজ্ঞতা— ইতিহাস সাক্ষী। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যদি শিক্ষার্থীকে সেই সৃষ্টিধর্মী অস্থিরতা দিতে পারত, তবে আমাদের শিক্ষার্থীরাও অনুভব করতে পারত— বেদনা মানুষের চিরন্তন অভিজ্ঞতা, তাকে সৃজনেও রূপান্তরিত করা যায়। সে বুঝত, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, নজরুল, রিলকে, দস্তয়েভস্কির রচনায় অন্তর্গত অন্ধকার কী করে উজ্জ্বলতম সৃষ্টিরও উৎস হয়ে উঠেছে। ছোট-আমি, কাঁচা-আমি থেকে জীবন ও জগতের বৃহত্ত্বের দিকে, পরিপক্বতার দিকে শিক্ষার্থীদের চালিত ও পরিচালিত করাই তো উদ্দেশ্য ছিল। তার বদলে আমরা তাদের ক্রমাগত শিখিয়ে ও বুঝিয়ে যাচ্ছি পৃথিবীটা জটিল-কুটিল, মানুষ মানবিক নয়, চালাকির সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে পরিশ্রমের হার অবশ্যম্ভাবী, ভালবাসাও ক্ষণস্থায়ী।
আর একটি শিক্ষক দিবস চলে এল, চলে গেল। রয়ে গেল আত্মবিনাশী এক মনখারাপ। সেই স্বর: এর পর কী করব? বাবা অবসর নিয়েছেন, মা অসুস্থ… বাবা নেই, বোনের বিয়ে… এতদিন পড়াশোনা করে… বাড়িতে বিয়ের চাপ… অনেক বয়স হয়ে গেল… আর তো কিছু পারিও না…। এই মনখারাপের সামনে নিরর্থক বোধ হয় চেনা ক্লাসরুম, অপারগতার গ্লানিতে মাথা হেঁট হয়ে আসে। কিছু বলার নেই, করার নেই!
বাংলা বিভাগ, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়