আজ আমরা যখন কৃত্রিম মেধার সাহায্যে লিখছি, ছবি তৈরি করছি, তথ্য খুঁজছি, বা আরও দ্রুত ডিজিটাল পরিষেবা ব্যবহার করছি, তখন তার জন্য প্রয়োজনীয় জল, বিদ্যুৎ, জমি ও পরিবেশগত খরচ বহন করছে কারা? প্রযুক্তিগত উন্নতির সুবিধা পাচ্ছে এক দল মানুষ, আর তার পরিবেশগত মূল্য দিতে বাধ্য হচ্ছে অন্য এক দল— এই আশঙ্কাই আজ বিশ্বের নানা প্রান্তে ডেটা সেন্টার নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে।
কৃত্রিম মেধা নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনায় এই ডেটা সেন্টারের প্রসঙ্গটি প্রায় অনুল্লিখিত থেকে যায়। বাইরে থেকে এগুলো বিশাল গুদামের মতো দেখালেও ভিতরে থাকে শত শত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার, ডেটা স্টোরেজ ডিভাইস, নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থা এবং আরও নানা ধরনের ইলেকট্রনিক যন্ত্র। কৃত্রিম মেধা, ইমেল, সমাজমাধ্যম-সহ অসংখ্য ডিজিটাল পরিষেবা সচল রাখতে এই কেন্দ্রগুলিকে দিন-রাত নিরবচ্ছিন্ন ভাবে চালু রাখতে হয়। এই ডেটা সেন্টারগুলি সম্বন্ধে বৈশ্বিক সংশয় ও আপত্তির পরিমাণ ক্রমশ বাড়ছে। এবং, সেই আপত্তির কারণ প্রযুক্তিবিরোধী মনোভাব নয়, বরং যে সব দেশে কৃত্রিম মেধার ব্যবহার সবচেয়ে বেশি, সেখানেই তার পরিবেশগত ও সামাজিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সমীক্ষা সংস্থা গ্যালপ-এর এক রিপোর্ট জানাল, আমেরিকার ৭১% মানুষ নিজেদের এলাকায় নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরোধী। তাঁদের আশঙ্কা, কৃত্রিম মেধা যে সুবিধা এনে দেবে, তা স্থানীয় মানুষের উপরে চাপিয়ে দেওয়া সম্ভাব্য দুর্ভোগের তুলনায় যথেষ্ট নয়।
ডেটা সেন্টারকে ঘিরে বিপদের আশঙ্কা কেন? প্রথম কারণ, জল। কৃত্রিম মেধা পরিচালনার জন্য তৈরি ডেটা সেন্টার বিপুল পরিমাণ তাপ উৎপাদন করে। সেই তাপ প্রশমিত করতে প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ জলের। আয়তন অনুসারে এক-একটি ডেটা সেন্টারের দৈনিক জলের চাহিদা ন’লক্ষ লিটার থেকে দেড় কোটি লিটার পর্যন্ত হতে পারে— অনেক ক্ষেত্রে একটি মাঝারি শহরের দৈনিক ব্যবহারের সমান। এই জল মূলত ভূগর্ভস্থ জলাধার থেকেই তোলা হয়। ফলে আশপাশের অঞ্চলে দ্রুত জলস্তর নেমে যাওয়া এবং জলসঙ্কট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
দ্বিতীয় কারণ, বিদ্যুৎ। ডেটা সেন্টারের আকার অনুযায়ী দশ মেগাওয়াট থেকে প্রায় এক গিগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুতের প্রয়োজন হতে পারে। স্থানীয় বিদ্যুৎ পরিকাঠামোর উপরে তার চাপ পড়ে। কোথাও বিদ্যুতের ঘাটতি, কোথাও উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজন, কোথাও আবার নতুন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সঞ্চালন ব্যবস্থা তৈরি করতে হয়। এর খরচও শেষ পর্যন্ত সমাজকেই বহন করতে হয়। উপরন্তু, বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই এই বিপুল বিদ্যুতের বড় অংশ এখনও কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ থেকেই আসে। ফলে ডেটা সেন্টারের কার্বন ফুটপ্রিন্টও ক্রমশ বাড়ছে।
সাধারণত কোনও বৃহৎ শিল্পপ্রকল্পের ফলে স্থানীয় মানুষ পরিবেশগত অসুবিধা মেনে নেন এই আশায় যে, সেখানে কর্মসংস্থান হবে। কিন্তু ডেটা সেন্টারের ক্ষেত্রে সে সম্ভাবনাও ক্ষীণ। বহু হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগে তৈরি একটি কেন্দ্র অনেক ক্ষেত্রেই মাত্র ত্রিশ-চল্লিশ জন স্থায়ী কর্মী নিয়োগ করে। অর্থাৎ জল, বিদ্যুৎ ও জমির ব্যবহার স্থানীয়; কিন্তু তার অর্থনৈতিক সুফল স্থানীয় মানুষের হাতে তেমন পৌঁছয় না। স্থানীয় মানুষ জল হারাবেন, বিদ্যুতের উপরে চাপ বাড়বে, কৃষিজমি হারাবে উৎপাদনক্ষমতা, অথচ উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থানও তৈরি হবে না— এই সমীকরণই আজ ডেটা সেন্টারকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
পৃথিবী যখন জলবায়ু পরিবর্তনের অভূতপূর্ব সঙ্কটের মুখে দাঁড়িয়ে, তখন এমন একটি প্রযুক্তি, যার অবকাঠামো আরও বেশি বিদ্যুৎ, আরও বেশি জল এবং আরও বেশি প্রাকৃতিক সম্পদ দাবি করে— তখন তার লাভ-ক্ষতির হিসাব শুধু প্রযুক্তিগত উন্নতির অঙ্কে মাপা চলে না, পরিবেশগত হিসাবকেও সমান গুরুত্ব দিতেই হবে। শিল্পবিপ্লবের পর পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই প্রায় দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। জলবায়ুর পরিবর্তন কৃষি, জলসম্পদ এবং মানুষের বসবাসযোগ্যতার উপরে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে ডেটা সেন্টারের দ্রুত বিস্তার সেই সঙ্কটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
এই কারণেই বিশ্বের বহু দেশে ডেটা সেন্টারের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রতিরোধ গড়ে উঠছে। আন্দোলনের মূল বক্তব্য— ‘নট ইন মাই ব্যাকইয়ার্ড’। আমার উঠোনে নয়। আমেরিকায় এই বিতর্ক এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছে যে, ডেমোক্র্যাট পার্টির সেনেটর আলেকজ়ান্দ্রিয়া ওকাসিয়ো-কোর্তেজ় নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের উপরে স্থগিতাদেশের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, কর্মসংস্থান, মানবাধিকার এবং পরিবেশের উপরে এর পূর্ণ প্রভাব সম্পর্কে স্বচ্ছ মূল্যায়ন না হওয়া পর্যন্ত নতুন অনুমোদন দেওয়া উচিত নয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও একই ধরনের দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। গুগল, মেটা, আমাজ়নের মতো বৃহৎ প্রযুক্তি সংস্থার ডেটা সেন্টারের বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষ জমি, জল ও বিদ্যুতের অধিকারের প্রশ্নে সংগঠিত হচ্ছেন।
অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, যে প্রকল্পগুলি উন্নত দেশগুলিতে ক্রমশ প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়ে, তার অনেকগুলিই পরে উন্নয়নশীল দুনিয়ায় স্থানান্তরিত হয়। ভারতও সেই প্রবণতার বাইরে নয়। কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা করেছে, বৃহৎ প্রযুক্তি সংস্থাগুলি যদি দেশে ডেটা সেন্টার স্থাপন করে, তবে দীর্ঘমেয়াদি কর ছাড়-সহ বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা দেওয়া হবে। আদানি ও রিলায়েন্সের মতো ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে গুগল-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইতিমধ্যেই বৃহৎ বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। যে দেশে এখনও প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরাপদ পানীয় জল বা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা যায়নি, সেখানে জল-নিবিড় এবং বিদ্যুৎ-নিবিড় এই শিল্পকে এত উদার প্রণোদনা দেওয়ার যুক্তি কী?
বিশাখাপত্তনমের কাছে গুগল-আদানির যৌথ প্রকল্প এই বিতর্ককে আরও স্পষ্ট করে। সেখানে শত শত একর উর্বর কৃষিজমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, বাজারদরের কমে জমি দেওয়া হয়েছে, কর ছাড় রয়েছে, বিদ্যুৎ ও জলের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি ভর্তুকির ব্যবস্থা হয়েছে। এই ভর্তুকির অর্থ শেষ পর্যন্ত আসবে সাধারণ মানুষের দেওয়া কর থেকেই। অর্থাৎ প্রকল্পের ব্যয়ের একটা বড় অংশ সমাজ বহন করবে, কিন্তু তার সুবিধা মূলত বৃহৎ প্রযুক্তি সংস্থা ও তাদের গ্রাহকদের হাতে কেন্দ্রীভূত হবে।
অবশ্য প্রতিরোধও শুরু হয়েছে। বিশাখাপত্তনম, নবী মুম্বই, বেঙ্গালুরু, উত্তরপ্রদেশের তুসিয়ানা— একাধিক জায়গায় জমি অধিগ্রহণ, জলসঙ্কট এবং স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে স্থানীয় মানুষ প্রশ্ন তুলছেন। তবে এখনও পর্যন্ত সেই আন্দোলন পশ্চিমের মতো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি। তার কারণ অন্তত দু’টি। প্রথমত, ভারতে জমির মালিকের অধিকার তুলনামূলক ভাবে দুর্বল। রাষ্ট্র ‘বৃহত্তর জনস্বার্থ’-এর যুক্তিতে অনেক সহজেই জমি অধিগ্রহণ করতে পারে। দ্বিতীয়ত, মূলধারার সংবাদমাধ্যমে এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রশ্ন খুব কমই আলোচনায় আসে। রাজনৈতিক সংঘাতের দৈনন্দিন আবর্তে ডেটা সেন্টারের মতো বিষয় প্রায় অদৃশ্য থেকে যায়। ফলে জনমতও তৈরি হয় না।
‘উন্নয়নের মূল্য’ কে চোকাবে, এই প্রশ্নটি চিরন্তন। যদি জল, বিদ্যুৎ, জমি ও পরিবেশের সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে এমন একটি প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো গড়ে ওঠে, যার সুবিধা তুলনামূলক ভাবে অল্পসংখ্যক মানুষ ভোগ করেন, আর তার মূল্য দেয় গোটা সমাজ, তবেসেই নীতি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। ভারতের মতো দেশে এই প্রশ্ন নিয়ে গভীরতর উদ্বেগের কারণ করেছে। উন্নত দুনিয়ায় জনপ্রতিরোধের ধাক্কায় এই বিপুলায়তন ডেটা সেন্টারগুলি উন্নয়নশীল দুনিয়ায় ঠিকানা খুঁজবে। দেশের পরিচালকরা যদি জনস্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেনএই বাণিজ্যিক স্বার্থকে, তবে এই ‘উন্নতি’র বিসদৃশ বোঝা বইতে হবে ভারতের মতো দেশের সাধারণ মানুষকে। সচেতনতার তাই বিকল্প নেই।