বিকশিত ভারতের লক্ষ্যে পৌঁছতে বহুস্তরী সমাজের উন্নয়ন অপরিহার্য। কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে নীতিগত পরিসরে সেই প্রক্রিয়ায় চোখে পড়ে নানা অন্তরায়। বর্তমান জনগণনায় সামাজিক সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তিকরণে সেই নীতির প্রশ্নই নতুন করে উঠছে। পরিসংখ্যানের পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক অবস্থান নিরূপণ ও পর্যালোচনায় জনগণনার তথ্যের অবদান দীর্ঘমেয়াদে অনস্বীকার্য। রাষ্ট্রের উন্নয়নমূলক ভাবনায় এ বারের জনগণনা গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত জাতভিত্তিক ধারণা থেকে সামাজিক সংখ্যালঘু শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার সব শাখার পৃথক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে।
নাগরিক অধিকার আন্দোলনের পাশাপাশি প্রতিবন্ধী অধিকার গোষ্ঠীর আন্দোলনের চাপে কিছুটা বাধ্য হয়ে ২০০১-এ প্রথম প্রতিবন্ধকতার জন্য পৃথক ও সম্পূর্ণ গণনার সূচনা। স্বাধীন ভারতে প্রথম পাঁচ দশকে সেই অর্থে ‘সামাজিক দুর্বল সম্প্রদায়’-এর (এই পর্বে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা-সহ একাধিক সরকারি প্রতিবেদনে প্রতিবন্ধকতা সম্বন্ধীয় নীতি নির্ধারণে তাঁরা সেই হিসেবে চিহ্নিত) সমস্ত শাখার এবং ‘ইন্টারসেকশনালিটি’র (বিশেষত তফসিলি জাতি, জনজাতি, ধর্মীয় সংখ্যালঘু পরিবারের) প্রতিবন্ধকতার পৃথক গণনা নিয়ে তেমন পরিকল্পনা দেখা যায় না।
ঔপনিবেশিক শাসকদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভিন্ন। ১৮৬১-র ন্যাশনাল সেন্সাস অর্গানাইজ়েশন শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতাকে পৃথক গণনার উদ্যোগ করে। সেখানে হোমের আবাসিক, যুদ্ধজনিত ও অন্য কারণে সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতাকে পৃথক পরিসরে অন্তর্ভুক্তির প্রয়াস লক্ষিত। ১৮৭২-এর হাউস রেজিস্টার ও পরবর্তী কালে ১৮৮১ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত প্রায় প্রত্যেক জনগণনায় প্রতিবন্ধকতার পৃথক অন্তর্ভুক্তির নজির রয়েছে।
স্বাধীন ভারতের প্রথম পঞ্চাশ বছরে প্রতিবন্ধকতা সংক্রান্ত তথ্যসংগ্রহে ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা দেখা যায়। ১৯৫১-র জনগণনায় তফসিলি জাতি ও জনজাতি গোষ্ঠীর বাইরে অন্যান্য জাতিগত পরিসংখ্যান গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধীদের তথ্য সংগ্রহে অনাগ্রহও লক্ষণীয়। পরিসংখ্যানগত অসঙ্গতি হেতু প্রতিবন্ধকতার অবস্থার পরিবর্তন বা উন্নয়নের ধারণাও নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে এগোয়নি। বিক্ষিপ্ত পরিসরে কল্যাণমূলক কিছু কিছু উদ্যোগের মধ্যে রাষ্ট্রীয় কর্তব্য ছিল সীমাবদ্ধ। গণতন্ত্রে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্বের অনুপস্থিতি, পৃথক পরিসংখ্যানের অভাব এর অন্যতম কারণ হতে পারে। এ-হেন তথ্যগত বিচ্যুতি দূর করতে আসন্ন জনগণনায় নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে প্রতিবন্ধকতার পৃথক অন্তর্ভুক্তি জরুরি। বলার অপেক্ষা রাখে না, সংখ্যার স্পষ্টতার উপরেই প্রতিবন্ধকতার সামগ্রিক উন্নয়ন নির্ভর করে।
প্রতিবন্ধকতার পরিসংখ্যানেও নজরে আসে পদ্ধতিগত ত্রুটি। তথ্য-সংগ্রহ পর্বে সাধারণ ভাবে দৃশ্যত ক্ষতি বা বিনষ্টিজনিত প্রতিবন্ধকতার (চলনজনিত বা অস্থি সংক্রান্ত, বধির বা শ্রবণ প্রতিবন্ধকতা, আংশিক বা পূর্ণ দৃষ্টিহীনতা, মানসিক অসুস্থতা) ব্যাপারে উৎসাহ থাকলেও, আপাত-অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতা (যেমন রক্তজনিত, অটিজ়ম) নিয়ে নীরবতা দেখা যায়। ২০১১-র জনগণনায় প্রধানত আট রকম প্রতিবন্ধকতা স্থান পায়। ২০০১-এ সেখানে যুক্ত করা হয় পাঁচ ধরনের স্থায়ী অসুস্থতা। রাষ্ট্রপুঞ্জের অধিকার সনদকে মান্যতা দিয়ে ২০১৬-য় প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তি অধিকার আইনে ২১ রকম স্থায়ী অসুস্থতা প্রতিবন্ধকতার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আইন পাশের এক দশক পরেও কার্যক্ষেত্রে এরা সমান গুরুত্ব পায় না; শংসাপত্র থেকে সরকারি সুবিধার ক্ষেত্রে বৈষম্য চোখে পড়ে। সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত: আসন্ন জনগণনায় অটিজ়ম-সহ প্রতিবন্ধকতার একাধিক শাখাকে পৃথক পরিসরে অন্তর্ভুক্ত না করার সিদ্ধান্ত। একই জিনিস দেখা গেছে ছাত্রবৃত্তি থেকে ট্রেন-সহ পরিবহণে সুবিধার ক্ষেত্রে। সেখানে আপাত-দৃশ্যমান প্রতিবন্ধকতার বাইরে থাকা বহু প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার রক্ষিত হয় না। ফলে প্রতিবন্ধকতার সঠিক পরিসংখ্যানে ফের অসঙ্গতি দেখা দিতে পারে।
আগের দুই জনগণনার উল্লেখে এটা স্পষ্ট হবে। ২০১১-র জনগণনায় ভারতে প্রতিবন্ধকতার সংখ্যা ২,৬৮,১৪,৯৯৪, মোট জনসংখ্যার ২.২৬ শতাংশ। ২০০১-এর জনগণনায় ছিল ২,১৯,০৬,৭৬৯, মোট জনসংখ্যার ২.১৩ শতাংশ। এই এক দশকে ভারতে সামগ্রিক জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার যেখানে ১৭.৬৪ শতাংশ, সেখানে প্রতিবন্ধকতার হার বৃদ্ধি মাত্র ০.১৩, বিশেষজ্ঞদের মতে যা আশ্চর্যের। ২০০১-এ জনগণনায় যেখানে পাঁচ রকম প্রতিবন্ধকতা যুক্ত করা হয়, সেখানে ২০১১-য় অন্তর্ভুক্ত হয় আট রকম স্থায়ী অসুস্থতা। ফলে প্রদত্ত পরিসংখ্যান নিয়ে সন্দেহ ঘনায়। তা আরও গভীর ও স্পষ্ট হয় ২০১৪-য় বর্তমান শাসক দল বিজেপির নির্বাচনী সঙ্কল্পপত্রে। সেখানে স্পষ্ট ঘোষণা করা হয়, ভারতে আনুমানিক সাত কোটি প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষ আছেন। ২০১৯-এ জাতীয় কংগ্রেসের নির্বাচনী ইস্তাহারে লেখা হয়, ভারতে প্রতিবন্ধকতার সংখ্যা প্রায় চার কোটি। পরিসংখ্যানের এই দোলাচল কে মেটাবে?
এই প্রেক্ষিতে বর্তমান জনগণনায় প্রতিবন্ধকতার প্রকৃত পরিসংখ্যান প্রকাশ কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। ভৌগোলিক ভাবে নির্দিষ্ট অঞ্চলের অধিবাসী না-হওয়ায় সব শাখার প্রতিবন্ধকতা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ দুরূহ। তাই কৌম-পরিসরে উপযুক্ত সচেতনতার পাশাপাশি, অটিজ়ম-সহ ও সব প্রতিবন্ধকতা সম্বন্ধে সঠিক তথ্য দেওয়ার ব্যাপারেও পারিবারিক উৎসাহ জরুরি। তাতে পরিবারের মধ্যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হবে, প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরেও প্রতিবন্ধকতা থেকে সক্ষমতায় উত্তরণে ইতিবাচক বার্তা মিলবে।
ইতিহাস বিভাগ, বাগনান কলেজ