E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

মুহূর্তমধ্যে বিপর্যয়

২০১৩ থেকে ২০২৬— তেরো বছরের ব্যবধান। কেদারনাথের দুর্যোগ এবং কয়েক হাজার মানুষের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া দেখিয়ে দিয়েছিল হিমবাহজাত হ্রদ ফেটে বন্যা কতখানি মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা থেকে কতটুকু শিক্ষা নিয়েছে ভারত সরকার?

পৌলমী দাস চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৫:৩৪
কর্দমরুদ্ধ: ড্রোন ছবিতে হড়পা বানের পর নেপালের বসতি, কাদার স্রোতে আবৃত, ২৯ অগস্ট।

কর্দমরুদ্ধ: ড্রোন ছবিতে হড়পা বানের পর নেপালের বসতি, কাদার স্রোতে আবৃত, ২৯ অগস্ট। ছবি: রয়টার্স।

কিছু লেখা লিখতে বসে মনে হয়, এমন লেখার মুহূর্ত না এলেই বোধ হয় ভাল হত। নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়টি সেই গোত্রেই পড়ে। গত কয়েক দিনে প্রযুক্তির চোখে যে অবিশ্বাস্য ধ্বংসলীলা ধরা পড়েছে নেপাল-চিন সীমান্ত লাগোয়া এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে, বার বার সংবাদমাধ্যমে, সমাজমাধ্যমে তা দেখে আতঙ্কের সঙ্গে এক প্রবল অ-নিরাপত্তার অনুভূতিও জাগে। অভিবাসন দফতরটির কাছাকাছি জড়ো হয়েছিলেন যাঁরা, আর কয়েক মুহূর্ত পরেই কেউ যাবেন স্বপ্নের ভ্রমণ-পথটিতে, কেউ চেনা আশ্রয়ের দিকে পা বাড়াবেন, কেউ দৈনন্দিন কাজে মন দেবেন— হঠাৎ এক বিশাল ঢেউয়ে তাঁরা সকলে স্রেফ ‘নেই’ হয়ে গেলেন। এই বাস্তবকে বিশ্বাস করা কঠিন। তাই শুধুমাত্র মৃত-নিখোঁজের সংখ্যা দিয়ে এই ঘটনাকে বিচার করা চলে না। এক সাধারণ ঝকঝকে দিনেও যে কোনও মুহূর্তে একটা আস্ত নদী হুড়মুড়িয়ে নেমে আসতে পারে মাথার উপর, এই আতঙ্ক বহু দিন তাড়িয়ে বেড়াবে পাহাড়ের মানুষকে, আমাদের মতো পাহাড়কে যাঁরা ভালবেসে প্রতি বছর সেখানে ছুটে যান, তাঁদেরও। কেননা, কেবল নেপাল নয়, এই একই বিপদ মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই রাজ্যের উত্তরাংশটিও। কিছু কাল আগের উত্তর সিকিম, প্রায় প্রতি বছর উত্তরাখণ্ড, হিমাচল যে মাত্রায় দুর্যোগের প্রত্যক্ষদর্শী হয়েছে, এবং হচ্ছেও, আমাদের অত্যন্ত প্রিয় দার্জিলিং, কালিম্পঙের পাহাড়, ডুয়ার্সও তার হাত থেকে বেশি দিন রেহাই পাবে না।

২০১৩ থেকে ২০২৬— তেরো বছরের ব্যবধান। কেদারনাথের দুর্যোগ এবং কয়েক হাজার মানুষের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া দেখিয়ে দিয়েছিল হিমবাহজাত হ্রদ ফেটে বন্যা কতখানি মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা থেকে কতটুকু শিক্ষা নিয়েছে ভারত সরকার? এখন যাঁরা নেপালের বন্যায় পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিচ্ছেন, তাঁরা কি আদৌ জানেন এ দেশের হিমালয় সংলগ্ন অঞ্চলগুলি কী ভয়ঙ্কর বিপদ মাথায় নিয়ে প্রতি মুহূর্তে বাঁচছে? ২০১৩ সালের ১৬ এবং ১৭ জুনের প্রবল বৃষ্টিপাত এবং চোরাবারি হিমবাহের একাংশের গলে যাওয়া হিমবাহজাত হ্রদটিকে ফাটিয়ে দেয়। সেই বিপুল পরিমাণ জল নেমে যোগ দিয়েছিল বৃষ্টিতে ফুলেফেঁপে ওঠা মন্দাকিনীতে। এর মর্মান্তিক পরিণতিটি সকলের জানা। অভিযোগ উঠেছিল, ভূপ্রকৃতিগত ভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল ওই অঞ্চলে কেদারনাথ মন্দিরকে ঘিরে যে অপরিকল্পিত ভাবে পর্যটনকেন্দ্র ফুলেফেঁপে উঠেছিল, এই অসংখ্য প্রাণহানি তার প্রত্যক্ষ ফল।

কিন্তু তার পরবর্তী বছরগুলিতে নতুন করে সেজে ওঠা মন্দির চত্বরকে প্রস্তুত করা হল আরও বেশি পর্যটক ধারণের জন্য। ভৃপ্রকৃতিগত ভাবে স্পর্শকাতর অঞ্চল জুড়ে রাস্তা নির্মাণ, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, হেলিকপ্টার টুরিজ়ম, বহুতল গাড়ি পার্কিং-এর ব্যবস্থা— কোনটিই বা বাদ থেকেছে? ভূবিজ্ঞানীদের একাংশ স্পষ্টই জানিয়েছেন, কেদারনাথের এই নব রূপ স্পষ্টতই এই অঞ্চলকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। ফের এক বার হিমবাহজাত হ্রদ উপচে বন্যার সৃষ্টি হলে তার অভিঘাত আগের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। এবং সেই সম্ভাবনাও যথেষ্ট। পরিবেশবিজ্ঞানী রবি চোপড়া জানিয়েছিলেন, হিমবাহ ভেঙে চোরাবারি তালের চার পাশে নতুন হ্রদের জন্ম হতেই পারে। ফলে অনুরূপ বিপর্যয় কষ্টকল্পনা নয়। রবি চোপড়া স্বয়ং চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন চার ধাম পরিযোজনা কমিটিতে। ২০১৩ সালের কেদারনাথ বিপর্যয়ে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভূমিকা খতিয়ে দেখেছিলেন তিনি। ২০২২ সালে তিনি চার ধাম কমিটি-র চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দেন। কারণ, কমিটির প্রস্তাবনাগুলিতে সরকার কর্ণপাত করেনি।

গত বছর এই অগস্টেই উত্তরকাশীর ধারালী প্রায় মুছে গিয়েছিল এক প্রবল হড়পা বানে। জল, পাথর আর কাদার সেই ভয়ঙ্কর স্রোতের কারণ কিন্তু মেঘভাঙা বৃষ্টি ছিল না। ঠিক যেমন সাম্প্রতিক নেপালের হড়পা বানের পিছনেও রেকর্ড পরিমাণ বৃ্ষ্টির হদিস মেলেনি। ২০২১ সালের চামোলীতে ঋষিগঙ্গা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি যে ভয়াল বন্যায় প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল তার কারণ হিসাবে উঠে এসেছিল হিমবাহের এক বিশাল অংশ ভেঙে পড়া। বস্তুত ঋষিগঙ্গার হড়পা বান হিমালয় বিপর্যয় বিষয়ে প্রচলিত ধারণার গোড়ায় সজোরে আঘাত করে। প্রমাণ করে দেয়, এই বিরাট মাপের আকস্মিক বন্যার উৎপত্তির জন্য শুধুমাত্র মেঘভাঙা বৃষ্টি দায়ী না-ও হতে পারে। বরফ-পাথরের বিশাল চাঙড় খসে পড়া, তার সঙ্গে মাটি-পাথরের ধ্বংসাবশেষ বয়ে এনে কোনও পাহাড়ি নদীর স্রোতকে আটকে সাময়িক ভাবে এক হ্রদের সৃষ্টি, এবং শেষ পর্যন্ত বহতা নদীর স্রোতের ধাক্কায় ভঙ্গুর সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে সমস্ত জল, পাথর, বরফ, কাদামাটি-সমেত তীব্র বেগে নীচে নেমে আসা— ঠিক এই পথে নেপালের হড়পা বান নেমে এসেছিল।

হিমালয়ের নদীগুলিতে এমন প্রাকৃতিক জলাধার তৈরি এবং ভেঙে পড়ার ঘটনা নতুন নয়। নতুন, এর তীব্রতা, সংখ্যা, এবং ধ্বংসক্ষমতা বৃদ্ধি। তার একটা কারণ যদি বিশ্ব উষ্ণায়ন হয়, অন্যটি অবশ্যই নির্বিচার উন্নয়ন যজ্ঞ। ধারালী বিপর্যয়ের পর পাহাড়ি নদীর একদম পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা জনবসতির বিপদের কথাটি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। অথচ, উত্তরাখণ্ডের ‘ফ্লাড প্লেন জ়োনিং অ্যাক্ট, ২০১২’ অনুসারে পাহাড়ি নদীর ১০০ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে কোনও ধরনের নির্মাণকাজ নিষিদ্ধ। রাজ্য সরকারকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, নদীগুলির সমীক্ষা করে সেই মতো স্থায়ী সীমানা চিহ্নিত করা। সেই সব নিয়ম কতটুকু মানা হয়েছে? নেপালেও স্যাটেলাইট চিত্রে ধরা পড়েছে নেপাল-চিন সীমান্তবর্তী অভিবাসন দফতর সংলগ্ন অঞ্চলটির বিপর্যয়-পূর্ব এবং বিপর্যয়-পরবর্তী ছবি। তাতে স্পষ্ট বোঝা যায়, নদীখাতের উপরেই নির্মিত হয়েছিল কংক্রিটের কাঠামো, সেতু, গাড়ি পার্কিং-এর জায়গা। শুধু অনুমান করা যায়নি, ক্ষীণকায়া নদী কতখানি ফুঁসে উঠে এক মুহূর্তে সব কিছু তছনছ করে দিতে পারে। উষ্ণায়নের বিশ্বে এ বার এই ‘অ-কল্পনীয়’কেই কল্পনায় আনার কাজটি করতে হবে। নতুন করে ভাবতে হবে, নদীকে সসম্মানে তার জায়গা ছেড়ে দেওয়ার কথা। বিভিন্ন ভিডিয়োতে স্পষ্ট, নদীর প্রবল স্রোত বয়েছে তার নির্দিষ্ট খাত দিয়েই। শুধু মুছে দিয়েছে তার গলা টিপে ধরতে চাওয়া সভ্যতার চিহ্নগুলিকে।

একুশ বছরের ব্যবধানে দু’বার উত্তর সিকিম ভ্রমণের অভিজ্ঞতার সূত্রে বলতে পারি, সুতোয় ঝুলছে এই সমগ্র অঞ্চলের ভবিষ্যৎ। অতি জনপ্রিয় লাচুং এবং লাচেন-এ পাহাড়ি নদী ক্রমবর্ধমান শহরের চাপে সঙ্কীর্ণতর হয়ে উঠেছে। উত্তর সিকিমের পরিকাঠামো এখনও যথেষ্ট নড়বড়ে, তার উপর অঞ্চলটি ভূমিকম্পপ্রবণও। ইতিমধ্যেই বহু বার বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে এই এলাকা। ২০২৩ সালে সিকিমের সাউথ লোনাক হ্রদের দেওয়াল ভেঙে উত্তর সিকিম এবং পশ্চিমবঙ্গের একাংশে বহু প্রাণহানি, চুংথাঙের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিস্তর ক্ষতি হয়েছিল। কিন্তু তার পরও প্রশাসন থেকে পর্যটক— চোখ খোলেনি কারও। প্রতি বছর পর্যটকদের ঢল নামে এই পথেই।

পরিসংখ্যান বলে, শুধু সিকিমে অন্তত ২৫টি হিমবাহজাত হ্রদ অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। এর কোনও একটি বেসামাল হলে ধ্বংস শুধুমাত্র সিকিমের সীমানাতেই আবদ্ধ থাকবে না, নেমে আসবে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ভাগের বিস্তীর্ণ এলাকায়। লোনাক বিপর্যয়ের পর ভারতের হিমবাহজাত হ্রদগুলির বিপদ সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং তদনুযায়ী ব্যবস্থা করার জন্য একটি সমন্বয়কারী কমিটি স্থাপন করা হয়েছিল। তারই সূত্রে সিকিমের এক পর্যবেক্ষণকারী দলের সমীক্ষায় ধরা পড়ে, অতি বিপজ্জনক তালিকাভুক্ত এক হিমবাহজাত হ্রদের মাথার উপর ঝুলছে এক কিলোমিটার লম্বা হিমবাহ। কোনও কারণে তার অংশবিশেষ হ্রদে ভেঙে পড়লে পরিণাম কী দাঁড়াবে, সহজে অনুমেয়। ঘটনা হল, এ জাতীয় বিপর্যয় এত দ্রুত ঘটে যে, সতর্ক করার সময়টুকুও পাওয়া যায় না। নেপালে সরকারি সতর্কবার্তা যত ক্ষণে মানুষের কাছে পৌঁছেছিল, তত ক্ষণে অনেক জায়গাই জলের তলায় তলিয়ে গিয়েছে। সুতরাং, পদক্ষেপ ঘটনা ঘটার বহু আগেই করতে হবে।

সম্ভাব্য বিপর্যয়-পথ নির্ধারণ, সেখান থেকে মানুষদের নিরাপদে সরিয়ে আনা, এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা— রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক দিক দিয়ে মোটেই সহজ কাজ নয়। কিন্তু এই জটিল কাজও অতি দ্রুত সম্পন্ন করা যে কত জরুরি, নেপালের মৃত্যুমিছিল তা জানিয়ে দিয়েছে।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Flash flood Nepal West Bengal government Central Government Environmental awareness

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy