E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

উৎসবকে করেছি উন্মত্ততা

এই প্রক্রিয়ায় দেবীপক্ষের অনেক আগে থেকেই একটিমাত্র বচ্ছরকার দিনের ভোরের আনন্দ ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ বেতার অনুষ্ঠানটিকে রোজ রোজ শুনিয়ে মানুষকে পুজোর জন্য প্রস্তুত করা হয়। পাশাপাশি পোশাক-পরিচ্ছদ ও আরও নানা পণ্যের বিজ্ঞাপনেও পুজোর প্রস্তুতি চলতে থাকে।

অনুরাধা রায়

শেষ আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:৩৭

চোরবাগান কী ভাবে ডাকাতের কবলে পড়ল? সে কয়েক দশকের প্রক্রিয়া, যে প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের উৎসবপ্রিয়তার সুযোগ নিয়ে দুর্গাপুজোটা পুরোপুরি দখল করল ব্যবসাদার আর শাসকরা। ‘সাইকোট্রপিক মেকানিজ়ম’ (মানসিক অবস্থা পরিবর্তনকারী পদ্ধতি) হিসেবে এটা তাদের হাতে দারুণ একটা অস্ত্র হয়ে উঠল। আর উৎসবের ভিত্তি যদি হয় ধর্ম, ইদানীং আবার আরওই ভারিক্কি ‘সনাতনী ধর্ম’, তবে তো সাত খুন মাপ।

এই প্রক্রিয়ায় দেবীপক্ষের অনেক আগে থেকেই একটিমাত্র বচ্ছরকার দিনের ভোরের আনন্দ ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ বেতার অনুষ্ঠানটিকে রোজ রোজ শুনিয়ে মানুষকে পুজোর জন্য প্রস্তুত করা হয়। পাশাপাশি পোশাক-পরিচ্ছদ ও আরও নানা পণ্যের বিজ্ঞাপনেও পুজোর প্রস্তুতি চলতে থাকে। ফলে ‘এই শাড়িটা না পরলে অষ্টমীর সন্ধ্যা বৃথা’, ‘এই গ্যাজেটে পুজো উপলক্ষে ৩০% ছাড়, এই বেলা কিনে নিই’। ক্রমে পুজো এগিয়ে আসতে থাকে। শাসকরা নেমে পড়েন উদ্বোধনে। প্যান্ডেল থেকে প্যান্ডেলে মানুষের পাল থুড়ি ঢল। মিডিয়া ক্রমাগত তাকে দৃশ্যমান করে তুলে আর বিবিধ পুরস্কার ঘোষণা করে অনুপ্রেরণা দেয়। এই ভাবে সংখ্যায়, জাঁকজমকে এবং মিডিয়া ও শাসকের পৃষ্ঠপোষকতায় পুজোর বাড়বাড়ন্ত হতে হতে নব্য-উদার পুঁজিবাদও ফুলেফেঁপে ওঠে। লক্ষণীয়, ১৯৯০-এর দশকে পুঁজিবাদের নবীকরণের সময় থেকে দুর্গাপুজোরও বর্তমান পর্যায়ে প্রবেশ এবং আরওই রমরমিয়ে ওঠা। তবে তখন বাংলায় বামপন্থীদের রাজ চলছিল। তাই পুজোয় বইয়ের স্টল দেওয়া ছাড়া শাসক দলের অংশগ্রহণ ছিল না।

অবশ্য, এই পুজো নান্দনিকতার মর্যাদাও পেল। আগ্রহোদ্দীপক সব থিম, অপূর্ব শিল্পকর্ম। সে জন্যই তো ইউনেস্কোর স্বীকৃতি। তবে শুধু নান্দনিকতার কারণে নয়, জ্ঞানবোধির উৎস বলেও থিমগুলির ন্যায্যতা প্রতিপাদনের চেষ্টা চলে। থিম পুজো না হলে আমরা পিরামিড থেকে বুর্জ খলিফা ইত্যাদি স্থাপত্য চিনতাম কী করে? বিদ্যাসাগর থেকে উত্তমকুমার-সহ সব বাঙালি মনীষীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনই বা কী ভাবে করতাম? মোবাইল-মগ্ন আমাদের তো আর বই পড়ার প্রশ্ন নেই, অতএব পুজোই ভরসা! বামপন্থীদের স্টলগুলি বহু বছরই জনাদর হারিয়েছে। এ বারের ‘সনাতনী’ পুজোয় একেবারে বুলডোজ়ার দিয়ে সেগুলি ভেঙেচুরে দেওয়া হল। শুধু বামপন্থী কেন, যে সব বই পুজো করার জন্য নয়, শুধুই পড়ার ও ভাবার জন্য, এই উত্তর-আধুনিক, ‘সনাতন’-আচ্ছন্ন, উত্তুঙ্গ উন্নয়নের যুগে তাদের আর প্রয়োজন নেই। পড়া-ভাবা সব এআই-চালিত, যা আবার ব্যবসাদার ও শাসকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

বাম জমানার অবসানের পর বাংলা দেখল এক শাসক থেকে আর-এক শাসকের হাতে ফিতে-কাটা, উত্তর-পূজা কার্নিভাল থেকে প্রাক-পূজা কার্নিভাল। কিন্তু মূলগত ভাবে অনুমোদন উৎপাদন করছেন ব্যবসাদাররা (হারমান আর চমস্কি-র ভাষায় ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’)। তাই মাসখানেক ধরে প্যান্ডেল বাঁধা হতে থাকে, রাস্তাঘাট ক্রমে যান চলাচলের অযোগ্য। তার পর পুজো এলে ভোরবেলা থেকে মাইক্রোফোনের নিনাদে কান ঝালাপালা। অনেকেই দুর্গাপুজোর সময় বাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। জরুরি পরিষেবা, সে রোগীর চিকিৎসা হলেও, বিঘ্নিত। তবুও প্রতিবাদ নেই। এ তো আর বিজাতীয় শত্রু সম্প্রদায়ের ধর্মের উদ্‌যাপন নয়, এ আমাদের ‘সনাতন’ ধর্ম যে!

তবে ‘সনাতন’-এর আভিধানিক অর্থ (চিরস্থায়ী, অপরিবর্তনীয়) ধরলে দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় ‘সনাতনী’ দিক নিঃসন্দেহে ‘হুতোমি হুজুগ’, যা আজ প্রবল ভাবে স্ফীত, শাসক ও ব্যবসাদারদের মৈত্রীবন্ধনে, মোবাইল ইত্যাদি প্রযুক্তির দৌলতে। কিংবা ধরা যাক, দশমীর দিন ইউনিফর্মের মতো লালপেড়ে সাদা শাড়ি পরে সিঁদুর খেলার ‘স্পেকট্যাকল’-এ, যদিও ছোটবেলায় দেখেছি মা-কাকিমারা এক-এক জন এক-এক রকম শাড়ি পরেই এই আচারটিতে অংশ নিতেন। সদ্য-‘সনাতন’-এর দাপটে সোনা রোদ্দুর, শিউলি, কাশ, স্বজন-সান্নিধ্য, আন্তরিক ভক্তি-ভালবাসার সঙ্গে জড়ানো পুজোর আনন্দ আর ‘সনাতনী’ বলে গণ্য হওয়ার নয়। আনন্দময়ীর আগমনে ধনীর দুয়ারে কাঙালিনি মেয়েকে মলিন মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক কবির বুক মুচড়ে ওঠা; বিদেশি শাসকের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সপাট প্রতিবাদ করে আর এক কবির দেবীর প্রতি অভিমানী উক্তি— “আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?/ স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল!” এ সবও তো ‘সনাতনী’ নয়। বিকশিত ভারতে কাঙালিনি আর কেউ নেই। না চাইতেই শাসকদের হরেক খয়রাতি প্রকল্প। আর শাসক আজ স্বদেশি, ‘সনাতনী’। ফলে তার বিরুদ্ধাচারণের প্রশ্নও নেই।

উৎসব, বিশেষ করে ধর্মীয় উৎসব, মেলা এ দেশের মানুষের রক্তে-মজ্জায়। স্বদেশি আন্দোলনের আবহে রবীন্দ্রনাথ স্বদেশ-আত্মার সামূহিকতার এই অভিব্যক্তিটির উপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বামপন্থীরা কিন্তু কোনও দিনই সুযোগটা নিতে চাননি। মার্ক্সবাদকেই ধর্ম বানিয়ে ফেলার ফলে কোনও বিকল্প উৎসব, সে সেকুলার হোক, বা ধর্মের পুনর্ব্যাখ্যার ভিত্তিতেই হোক, তাঁদের মাথায় আসেনি। মাঝে মাঝে ‘ধর্ম জনগণের আফিম’ আওড়ানো, জীবনযাপনে কিন্তু দিব্যি ধর্মীয় আচারবিচার। ক্ষমতার লক্ষ্যে এক-একটি পুজো কমিটি দখলও চলত। ফল হল এই, ধর্ম ব্যাপারটা দখল করে নিল স্বকথিত ‘সনাতনী’রা। সুকৌশলে ধর্মকে জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রবাদের সঙ্গে মিলিয়ে ধর্মীয় আবেগকে রূপান্তরিত করল রাজনীতিতে। সুতরাং, আজ বামপন্থীদের বইয়ের স্টল ভাঙলে দুঃখপ্রকাশ করে বলতেই হবে, এটাই ছিল তাদের নিয়তি। যে বিপ্লবকে তারা নিয়তি ভাবত, সেটা নয়।

অথচ, ধর্মের অন্য ব্যাখ্যা তো সম্ভব, যা দিয়ে মানুষকে কল্পিত শত্রুগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে উত্তেজিত না করে তার অন্তরের ন্যায়বোধ, প্রতিবাদ উস্কে দেওয়া যায়। বাখতিন যেমন ক্ষমতাকে বিদ্রুপ করার আঙ্গিক হিসেবে পাশ্চাত্যের কার্নিভালকে চিহ্নিত করেছেন, আমাদেরও তো তেমনই ছিল গম্ভীরা, সং ইত্যাদি। অথবা, রামায়ণে তো বাহুবলী রাম ছাড়া নিগৃহীত সীতা ও শম্বুকও রয়েছেন। আছেন দুর্গার পাশাপাশি হুদুড় দুর্গা। বিক্ষিপ্ত ভাবে তাঁদের প্রতি অন্যায়ের কথা তুলেও ধরা হয়েছে; কিন্তু তা প্রতিবাদী গণচরিত্র পায়নি। এগুলি ধর্মের মূলস্রোতে ছিল না ঠিকই, কিন্তু রাম বা হনুমানের পুজোও তো বাংলার ধর্মীয় মূলস্রোতের ঐতিহ্য নয়। তা ছাড়া মার্ক্সবাদের সঙ্গে ধর্মকে একটু মেলাতে পারলে সামূহিক স্তরে নৈতিকতার প্রকল্পের সঙ্গে ব্যক্তিজীবনের নৈতিকতাকে মেলানো যেত, আমাদের দেশে যে ব্যক্তিক নৈতিকতা প্রায়শই ধর্মীয় কল্পনায় আধৃত থাকে। একটি ধর্মীয় চিন্তায় তো অন্য রং ধরানোই যায়। বৈষ্ণবরা কেমন রাধাকৃষ্ণকে মর্তের মানুষ করে তুলে স্বর্গকামনাকে মর্তবাসনায় পরিণত করেছিলেন, যা আবার রবীন্দ্রনাথের মতো ব্রাহ্ম কবিকে অনুপ্রাণিত করেছে— সেটা চমৎকার বুঝিয়েছেন সুদীপ্ত কবিরাজ ‘মার্কসবাদ ও স্বর্গের সন্ধান’ প্রবন্ধে।

১৯৩৭ সালে বিহারের ভয়াবহ ভূমিকম্পকে গান্ধী বলেছিলেন অস্পৃশ্যতার পাপে রুষ্ট ভগবানের শাস্তি। রবীন্দ্রনাথ প্রতিবাদ করেন: এ রকম উক্তি করে কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক নয়। ২০১৬ সালে চোরবাগানের কাছেই একটি নির্মীয়মাণ সেতু ভেঙে পড়ে সাতাশটি প্রাণ চলে গেলে দেশের সর্বোচ্চ শাসক বললেন, এ হল রাজ্যস্তরে অনাচারী শাসকের হাত থেকে পশ্চিমবঙ্গকে বাঁচানোর জন্য ভগবানের বার্তা।

চোরবাগানে তা হলে ভগবান কী বার্তা দিলেন? ‘সনাতনী’ ধর্মবিশ্বাসে নিহিত নেতৃ-বচনকে কি ‘কুসংস্কার’ বলা যাবে কোনও মতেই? না কি সনাতনী ধরনে মৃত্যু পুণ্য-পরিণতি বলেই বিবেচ্য? শুনছি, ’সনাতনী’ ধর্মের অবমাননার কারণে চোরবাগানে পুজোর পূর্ববর্তী সংগঠকদের খুঁটি ভেঙে নতুন খুঁটি পোঁতা হয়েছিল। সে দিনই কি সেই পুজোর সব দর্শনার্থীর জন্য স্বর্গ কিনে নেওয়া হয়েছিল? তাই কি দুর্ঘটনাটির পরেও চতুর্দিকে স্ফূর্তি অব্যাহত?

আর নিতান্ত যদি উনিশটি প্রাণের অকাল-বিনাশকে মর্মান্তিক মনে করি, তা হলে কিন্তু স্বীকার করতেই হবে, ‘এ আমার এ তোমার পাপ’। আমরাই আমাদের পুজোকে ব্যবসাদার ও নেতাদের হাতে তুলে দিয়েছি। উৎসবকে করেছি উন্মত্ততা। সর্বজনীন পুজোয় অনুমোদন করেছি ‘ভিআইপি কালচার’, চোরবাগানের দুর্ঘটনার জন্য যার বড় ভূমিকার কথা শোনা যাচ্ছে। দুর্ঘটনার দায় নিয়ে রাজনৈতিক তরজার মধ্যে এই আত্মসমালোচনাটি চাপা পড়ে যাওয়া ঠিক হবে না।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Durga Puja Stampede CPM Book Stall Demolish Vandalism West Bengal government

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy