নতুন কিছু বলা হলেই আমাদের সাধারণ প্রতিক্রিয়া— ও সব সাহেবসুবোদের দেশে চলে, এখানে চলবে না। আজকাল সাহেবসুবোদের দেশ খুব সুদূর কোনও ব্যাপার নয়। চাকরিবাকরি, বেড়ানো থেকে প্রবাসী ছেলেমেয়ের কাছে ঘুরে আসা আমেরিকা ইউরোপ, নিদেনপক্ষে তাইল্যান্ড মালয়েশিয়া ঘোরা লোকের সংখ্যা অনেক। সব অর্থনৈতিক গোত্রের লোকেরাই এর মধ্যে আছেন। নতুন কর্মকাণ্ড, সে সব ইউরোপ আমেরিকায় চলে, এ দেশে তা হয় না। কিন্তু সব ক্ষেত্রে যে এ ব্যাপারটা আর খাটছে না, সেটা ওই বিদেশফেরত মানুষেরাই বলে থাকেন আর পর্যটক বিদেশিরাও এ দেশের আধুনিক কর্মকাণ্ড দেখে বেশ কিছুটা অবাক হন বইকি। চাঁদের অন্ধকার পৃষ্ঠে মহাকাশযান অবতরণ বা বিশ্বের বৃহত্তম তৈল শোধনাগার ইত্যাদি ভারতীয় সাফল্য কাগজে বা টিভিতে দেখাজানার ব্যাপার হতে পারে, কিন্তু যখন চোখের সামনে দেখেন যে ক্ষুদ্রতম আধারে পাঁচ টাকার চা খেয়ে সাধারণ মানুষ দাম মেটাচ্ছেন মোবাইল ফোনে, তখন বিশ্বাস হয় সরকারি ইচ্ছা ও বেসরকারি উদ্যোগের মিলিত প্রয়াসে এ দেশেও তৃণমূল স্তরে আধুনিক কর্মকাণ্ড সফল হয়ে উঠতে পারে। এই ব্যাপারটা ওই সাহেবসুবোদের দেশেও এখনও এ রকম ব্যাপক উপলব্ধ নয়।
এই সাফল্যের জন্য কোনও সচেতনতার মিছিল করতে হয়নি, কোনও এনজিও-কে দারুণ সব ফটো দিয়ে প্রচারপুস্তিকা বানিয়ে বিদেশি ফান্ড জোগাড় করতে হয়নি। স্রেফ সরকারি দৃঢ় ইচ্ছা আর তার প্রয়োগ এ রকম অনেক কাজই করে ফেলতে পারে।
আজ থেকে চার দশক আগে কলকাতায় চালু হল মেট্রো রেল। তার পর আরও দুই দশক ছিল বাম ফ্রন্টের কলকাতা। কলকাতা তখন এক পূতিগন্ধময় নগর, সারা শহরটাই যেন জন-শৌচালয়। শহরে পথচারীদের জন্য নোংরা ফেলার ডাস্টবিন কোনও কালেই ছিল না, এখনও নেই। এ রকম একটা শহরে মেট্রো রেলে স্টেশন হল একেবারে চকচকে এক অন্য পৃথিবী। হাজার হাজার লোক যাতায়াত করছে, অথচ প্ল্যাটফর্মে কোথাও একটি কাগজের টুকরো পড়ে নেই, নেই দেওয়ালে পানের পিক। কী করে সম্ভব! বাস থেকে নেমে বাসের টিকিটটা এখনও পিছনের পকেটে কচকচ করছে, কিন্তু ফেলা যাচ্ছে না। হাজারটা বাজে কাগজ বুকপকেটে গিজগিজ করছে, কিন্তু ফেলা যাচ্ছে না। ফেলতে হবে রাস্তায় মেট্রো থেকে বেরিয়েই।
এই পরিচ্ছন্নতা সম্ভব হয়েছিল এবং আজও হয়ে চলেছে একটাই কারণে। কারণ, মেট্রো কর্তৃপক্ষ মেট্রো চত্বর সব সময় পরিষ্কার রাখছেন। আর এটাই বাস্তব যে, নিয়মিত পরিষ্কার স্থানে কেউ আর নোংরা ফেলে না। কোনও সচেতনতা অভিযানের দরকার হয়নি, দরকার ছিল কেবল মেট্রো কর্তৃপক্ষের নিরলস পরিষ্কার রাখার কাজ।
অনেক সচেতনতা মিছিল হয়েছে বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে, পরিবেশ সপ্তাহ পালন হয়েছে, কিন্তু উচ্চশিক্ষিত বাবা-মা সন্তানকে দোকানে চকলেট কিনে দিলেন, ছেলে তার মোড়কটি অক্লেশে রাস্তাতেই ফেলে দিল। বাবা-মা নির্বিকারে মেট্রো ধরতে চললেন। অথচ, এঁরাই বড় টিভিতে বিশ্বকাপ ফুটবলে দেখেছেন খেলার পর জাপানি দর্শকেরা খেলা শেষে তাঁদের অংশের স্টেডিয়ামের কাগজ, পানীয়ের কাপ-ক্যান, সব নিজেরাই পরিষ্কার করে দিচ্ছেন। ঘরে বসে সপরিবারে এ সব দেখে হাততালি দিয়েছেন, বলেছেন, ও সব জাপানে হয়।
আমাদের কোনও বিদ্যালয়ের ছাত্রকে পরিবেশ সমস্যা নিয়ে বলতে বললে সে বিশ্ব উষ্ণায়ন বুঝিয়ে দিল। কিন্তু পাড়ার পুকুরের কথা বলতে পারল না। এমনকি তার স্কুলের মাঠের কোণে জমে থাকা বর্জ্য কাগজ, প্যাকেট, বোতলের স্তূপের কথাও তার মাথায় এল না। কোনও সচেতনতা অভিযান এ সব বলে না। বাবা-মায়েরাও নন। জাপানিরা কিন্তু এই অভ্যাস বিশ্বকাপ ফুটবল সংস্থার কোনও সচেতনতা প্রয়াস থেকে শেখেননি। শিখেছেন একেবারে শিশু বয়সে বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ পরিষ্কারের অভ্যাস থেকে। আমাদেরও সেখান থেকেই শুরু করতে হবে। ইন্টারনেট বিপ্লবে আমরা প্রথম সারিতে, গরিব মানুষের সরকারি টাকা তাঁর ব্যাঙ্কের খাতায় পৌঁছে যায় ইন্টারনেটের মাধ্যমে, তবে আমাদের বিদ্যালয়গুলির জাপানি হতে বাধা কোথায়?
জাপানের বিদ্যালয়গুলিতে পরিবেশের পাঠ শুরু হয় একেবারে হাতে-কলমে। সেখানের বিদ্যালয়ে একেবারে ছোট থেকেই প্রতি দিন বিদ্যালয় পরিষ্কারে অংশগ্রহণ করতে হয়। রোজ ১৫ মিনিট থেকে আধ ঘণ্টা এই কাজটি চলে ক্লাসের শুরুতেই। বিদ্যালয়ের ক্লাস ঘর, সিঁড়ি, বারান্দা, গ্রন্থাগার, বিদ্যালয়ের প্রবেশ দ্বার, উদ্যান— এক কথায় সব কিছুই। একটু বড় হলেই ছাত্রছাত্রীদের পরিষ্কার করতে হয় শৌচালয়। এ সব করার জন্য উপযুক্ত সরঞ্জাম দেন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ সবে যে শুধু বিদ্যালয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে তা-ই নয়, শিশুকাল থেকেই তারা শেখে যে, নিজের চার পাশ পরিষ্কার রাখতে হয়, বিশেষত যে বর্জ্য অনেকটাই নিজেরা সৃষ্টি করেছে। ফলে, তারা বিশ্ব উষ্ণায়ন শেখার আগেই নিজের পরিবেশ, স্নানের পুকুর নিজেরাই পরিষ্কার করে রাখে। এদের একটা বড় শিক্ষা হয় শৌচালয় পরিষ্কার করায়। শৌচালয় নিয়ে একটা ঘৃণা, তার পরিষ্কার করার মানুষদের ঘৃণা প্রায় সব সমাজেই এক সময় ছিল। এখন আমাদের দেশে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরিবারে, বিশেষত ফ্ল্যাটবাড়িতে শৌচালয় বসবাসের ঘর সংলগ্ন হওয়ায় নিজেদের শৌচালয় নিজেরাই পরিষ্কার করার অভ্যাস অনেকটা চালু হয়েছে। বিদ্যালয়ে শৌচালয় পরিষ্কার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে শৌচালয় সম্পর্কে ঘৃণা একেবারেই দূর করে দেয়। বরং জাপানের বিদ্যালয়ে প্রায় প্রতিযোগিতা চলে কোন শ্রেণি কত বেশি পরিষ্কার রাখতে পারে। এই ভাবে ছাত্রছাত্রীরা শেখে যৌথ কাজ করার অভ্যাস, বর্জ্য সঠিক স্থানে ফেলার অভ্যাস, পরিবেশ রক্ষায় ব্যক্তিগত গুরুত্ব, সব ধরনের কাজ করার শিক্ষা। আর নিজের চার পাশের পরিবেশ রক্ষা করতে পেরে একটু গর্ববোধ।
এ সব আমাদের বিদ্যালয়গুলিতে হওয়া কি খুব কঠিন? কেউ কি এক সময় ভাবতে পেরেছিল, সব বিদ্যালয়ে রোজ হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীকে দুপুরের খাবার দেওয়া যায়? এই মধ্যাহ্নভোজন রান্না করার রসদ— চাল, ডাল, আনাজ, ডিম, তেল, গ্যাস, কাঠ সব বাজার থেকে কেনা, তার পর তা রান্না করার জন্য রন্ধনকর্মী ও সহায়কদের জোগাড় করা। এত সব সামগ্রী কেনার অর্থ সংগ্রহ, তার হিসাব রাখা, অডিট কত কিছু। সবই চলছে। সুতরাং, বিদ্যালয় পরিষ্কার রাখার কাজও এ রকম একটি অলঙ্ঘ্য দায়িত্বের আওতায় আনতে হবে। অর্থাৎ রাজ্য সরকারকে বলতে হবে যে, সব বিদ্যালয়ে— সরকারি, বেসরকারি, আধা-সরকারি সব বিদ্যালয়ে বিদ্যালয় পরিষ্কার কার্যক্রম অবিলম্বে শুরু করতে হবে। আরও পরিষ্কার করে বলা দরকার যে, কেবল সরকারি বিদ্যালয়ে নয়, সব বিদ্যালয়েই তা চালু করতে হবে, নয়তো অনেক অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের বেসরকারি বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারেন। এই কাজ, বিশেষত শৌচালয় পরিষ্কারের কাজে অনেক অভিভাবকেরই খুব আপত্তি থাকবে। অনেকেই বিষয়টিতে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যার কথার আড়ালে মূলত শৌচালয়ের কাজ নিম্নজাতের কাজ বা অন্যের শৌচ-বর্জ্য পরিষ্কার করার কাজটি অবমাননাকর— এমন কথাই বলবেন। এ সব কুসংস্কার অগ্রাহ্য করেই কিন্তু বড় পরিবর্তন আসে, চিন্তার মুক্তি ঘটে।
অবশ্যই সরকারি নির্দেশ হলেই সব কাজ হয়ে যায় না। পশ্চিমবঙ্গ জাপান নয়। ফলে এই কর্মকাণ্ড রূপায়িত করতে এখনই রচনা করতে হবে এই কর্মকাণ্ডের প্রতিটি পদক্ষেপের দেশীয় নিয়ম। মহানগরের বিদ্যালয়, মফস্সলের বিদ্যালয়, গ্রামীণ বিদ্যালয়ের পরিবেশ আলাদা, ছাত্রছাত্রীদের ধরন আলাদা। গ্রামের বিদ্যালয়ের মাঠ পরিষ্কার রাখতে সাপখোপের সমস্যা মেটাতে হতে পারে, বেশির ভাগ বিদ্যালয়ে এত দিনকার অভ্যাসে শৌচালয়ের মান হয়তো খুবই খারাপ, মেয়েদের বিদ্যালয়ে আরও বিভিন্ন ধরনের শৌচালয় ও বর্জ্যের সমস্যা থাকতে পারে। এই কাজের জন্য ছাত্রছাত্রীদের যাতে কোনও রকম স্বাস্থ্যহানি না হয়, সে জন্য ওষুধপত্রের ব্যবস্থা থাকবে। এগিয়ে থাকা বিদ্যালয়গুলিতে এ সবের পাশাপাশি বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন— অনেক কিছুই পর্যায়ক্রমে করা যেতে পারে। তবেই বিদ্যালয়ের অঙ্গন থেকে পরিবেশ সচেতনতা ছড়িয়ে পড়বে সমাজেও। ঠিক ইন্টারনেট ব্যবহারের মতো আমাদের পরিবেশ সচেতনতাও উদাহরণ হয়ে উঠবে। অবশ্য এ সব কথা যদি আদৌ নতুন মন্ত্রীদের কানে পৌঁছয়।