মানুষ ক্ষুব্ধ হলেও যে শেষ অবধি সরকারের পতন ঘটার নিশ্চয়তা নেই, এই কথাটা মানুষও জানে, শাসকরাও জানেন। তবে, পতন ঘটবে না এমন নিশ্চয়তাও কিন্তু নেই, পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাই তার প্রমাণ। দেশ জুড়ে আছড়ে পড়া জেন-জ়ি বিক্ষোভের আঁচে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান শেষ অবধি পদত্যাগপত্র পাঠালেন। তবে তার প্রকৃত অর্থ কী, এই বিক্ষোভের আঁচ কেন্দ্রীয় সরকারের গায়ে কতখানি লেগে থাকবে, সে সব প্রশ্নের উত্তর এখনও অস্পষ্ট। এখনও অবধি যে কথা নিশ্চিত করে বলা যায়, এ লেখায় বরং তারই কিছু আলোচনা করব। প্রথম কথা হল, সম্ভবত দীর্ঘ দিন ক্ষমতায় থাকার কারণেই এই সরকারের মানুষের কথা শোনার ক্ষমতা কমেছে। শাসক কথা শুনলে, বা অন্তত শোনার ভানটুকু করলে, নাগরিকের ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে থাকে— এই সত্যটি সরকার মনে রাখেনি।
দ্বিতীয় কথা হল, নাগরিকের ক্ষোভে সরকার এবং প্রশাসন যদি কর্ণপাত না করে, তবে গণতন্ত্রের অন্য দুই স্তম্ভের উপরে মানুষ ভরসা করতে চায়— বিচারবিভাগ ও সংবাদমাধ্যম। বিশেষত আদালতের উপরে ভারতবাসীর আস্থা গত কয়েক দশকে প্রভূত বেড়েছিল। মানুষ বিশ্বাস করেছিল যে, আদালতই পারে সরকারের যে কোনও অনাচার থেকে মানুষকে রক্ষা করতে। এ কথা ঠিক যে, গণতান্ত্রিক পরিসরে আদালতের উপরে এই নাগরিক অতি-নির্ভরতা খুব সুসংবাদ নয়। তবুও, শাসনবিভাগের অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিচারবিভাগই ছিল ভরসা। তবে, আদালতের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা বজায় রেখেও বলা প্রয়োজন, সাম্প্রতিক ঘটনাক্রমে মানুষের আশাহত হওয়ার কিছু কারণ আছে। মে মাসের মাঝামাঝি আরশোলা শব্দের প্রয়োগও বিচারবিভাগের অঙ্গনে ঘটেছিল। জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে দিল্লি পুলিশের লাঠিপেটা বা ছররা গুলি চালানোর ভিডিয়ো বিষয়ক বিতর্কও। ফলে, দেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নাগরিক সমাজের ভরসার অন্তিম কেন্দ্রটিও নড়ে গিয়েছে।
আরও বড় আশাভঙ্গ ঘটেছে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের আচরণে। এক সময় মূলধারার সংবাদমাধ্যমই রাজনৈতিক সমালোচনার প্রধান মঞ্চ ছিল। আজকে দেশের নাগরিকের একটা বড় অংশ বিশ্বাস করছেন যে, সেই সংবাদমাধ্যম শাসকের স্তাবকতা করতেই ব্যস্ত। তার জায়গায় শাসক-বিরোধিতার জায়গা দখল করে নিয়েছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সমাজমাধ্যম এবং নাগরিক-সাংবাদিকতা। ফলে রাষ্ট্র, সংবাদমাধ্যম এবং নাগরিক— এই তিন পক্ষের সম্পর্ক নতুন ভাবে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে। যন্তর মন্তরের বিক্ষোভ বিষয়ে মূলধারার চ্যানেলগুলিতে যে ছবি প্রদর্শিত হচ্ছে, আর সমাজমাধ্যমে বা নাগরিক-সাংবাদিকদের ক্যামেরায় যে ছবি ধরা পড়ছে, এই দুইয়ের মধ্যে ফারাক এত প্রকট যে, মূলধারার মিডিয়ার প্রতি অবিশ্বাস আরও বাড়ছে। অর্থাৎ, সরকার বা প্রশাসন মানুষের ক্ষোভকে গুরুত্ব না দিলে আগে যে দু’টি প্রতিষ্ঠানের উপরে ভরসা করার চল ছিল, দু’টিই এ বার আশাভঙ্গ করেছে। ক্ষোভও তীব্র হয়েছে।
গণতন্ত্রের সব প্রশ্ন সংসদের ভিতরে জন্ম নেয় না। সাধারণ ভাবে সংসদের বাইরেই সমাজ তার অস্বস্তির ভাষা খুঁজে পায়। সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষাব্যবস্থা, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তাকে নিছক বিরোধী রাজনীতির কৌশলগত প্রচার বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। প্রযুক্তির বিভিন্ন উদ্ভাবন যখন কর্মসংস্থানের ভাবনা আমূল বদলে দিচ্ছে, সেই সময় আমাদের দেশে লেখাপড়ার সঙ্গে পেশাগত দক্ষতার দূরত্ব বাড়ছে প্রতি দিন। সঙ্গে সরকারি ক্ষেত্রে স্কুলশিক্ষা বছরের পর বছর দুয়োরানি। বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা পরিচালনার ক্ষেত্রে ধারাবাহিক ব্যর্থতার উদাহরণ সামনে আসছে— সেখানে শুধু প্রশ্ন ফাঁস সংক্রান্ত দুর্নীতি নয়, খাতা দেখার বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে সমালোচনাও যৌক্তিক। শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন এবং একই সঙ্গে তরুণদের ক্রমবর্ধমান হতাশা কিংবা আত্মহননের পরিসংখ্যান— এ সবই সমকালীন সামাজিক বাস্তবের অংশ। বিজেপি যদি কৌশলগত ভাবে বিভিন্ন দল ভাঙিয়ে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখে এবং তার অনুসিদ্ধান্তে দেশে দুই কক্ষের সংসদ যদি এই উদ্বেগকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেয়, তবে সেই প্রশ্ন অন্য কোনও জনপরিসরে উচ্চারিত হবেই।
সেই কারণেই যন্তর মন্তরের প্রতিবাদকে কেবল কয়েক দিনের রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসাবে বিশ্লেষণ করলে সুবিচার হবে না। সংসদে পৌঁছে যাওয়ার লক্ষ্যে হাজার হাজার মানুষের জমায়েত আসলে একটি প্রতীক— রাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দেওয়া যে, গণতন্ত্রে নাগরিক কেবল ভোটার নন, তিনি প্রশ্নও করতে পারেন। এই প্রেক্ষাপটেই সোনম ওয়াংচুকের উপস্থিতি এবং দীর্ঘমেয়াদি অনশন তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি কোনও বৃহৎ রাজনৈতিক দলের মুখ নন, কোনও নির্বাচনী জোটেরও অংশ নন। লাদাখের বিভিন্ন দাবি নিয়ে তাঁর আন্দোলনের শুরু, কিন্তু আজ তাঁর আবেদন সেই ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করেছে। কারণ তিনি এমন এক ভাষায় কথা বলছেন, যা ভারতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ— অহিংস নৈতিক প্রতিবাদের ভাষা। সেই আন্দোলনে এখন শামিল বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও।
গত দেড় দশকে অনেকগুলো বড় মাপের নাগরিক আন্দোলন আমরা দেখেছি। তার মধ্যে যে দুটো আন্দোলন অ-বিজেপি সরকারের আমলে ঘটেছে— একটা ২০১১-র অণ্ণা হজারের আন্দোলন, আর একটা ২০২৪-এর আর জি কর আন্দোলন— তাতে লাভবান হয়েছিল বিজেপি। উল্লেখ্য যে, এই দুই আন্দোলনের ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র সে ভাবে কোনও দমনমূলক ব্যবস্থা করেনি— এবং, শেষ অবধি সরকার পড়ে গেছে। ফলে বিজেপি এখান থেকে শিক্ষা নিতেই পারে যে, ছাত্রযুবদের দাবির কাছে নতিস্বীকার না করে দমনমূলক কৌশল তাদের সংসদীয় স্থায়িত্বের পক্ষে সুবিধাজনক হবে। শাসকের দিক থেকে তাই বিক্ষোভকারীদের ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’, ‘আরবান নকশাল’, ‘ডিপ স্টেট’ ইত্যাদি নামে দাগিয়ে দেওয়াটা একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক ভাষ্য হওয়া অসম্ভব নয়। ভারতীয় জনতা পার্টির রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে হিন্দুত্ব-প্রভাবিত জাতীয়তাবাদ এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রের ধারণা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে। সমর্থকদের মতে, এই দর্শন জাতীয় ঐক্য, নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসকে সুদৃঢ় করে। সরকার পক্ষ তাই বার বার বোঝানোর চেষ্টা করবে যে, এই আন্দোলন দুর্বৃত্তদের; বলবে যে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য যন্তর মন্তরে কোনও গভীর বৈদেশিক চক্রান্ত চলছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এই ধরনের অভিধা প্রকৃত নীতিগত বিতর্ককে আড়াল করে দেয় এবং ভিন্নমতকে সন্দেহের চোখে দেখার প্রবণতা বাড়ায়।
তবে, আরও একটা কথা অনস্বীকার্য, যুবসমাজের যে অসহায় ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এই আন্দোলনে ঘটছে, তার শিকড় রয়েছে অর্থব্যবস্থার স্থবিরতায়। মানুষের আয় নেই, বাজারে চাহিদা নেই, তাই নতুন লগ্নি নেই, তাই চাকরিও নেই— এই বাস্তবটিই যুবসমাজকে কোণঠাসা করেছে। সরকারকে এই অর্থনৈতিক ব্যর্থতা স্বীকার করতে হবে। তবে গত বারো বছরে যে হেতু এই সরকারকে ভুল স্বীকার করতে দেখা যায়নি, সব রকম পথে চেষ্টা হল, আন্দোলনটিকে অবৈধ সাব্যস্ত করার। সেটা করতে পারলে আলোচনার প্রয়োজন পড়ে না, ভুল স্বীকারও করতে হয় না।
তবু সরকার— কৌশলগত হলেও— আলোচনার রাস্তা খোলা রাখছিল, এমনকি মন্ত্রীর পদত্যাগের ঘোষণা অবধিও যাওয়া গেল, এটাই পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের কাছে আশার আলো— যতই ফিকে হোক।
ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট, কলকাতা